বুধবার ২৭ মে ২০২০
Online Edition

আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের পর  আসামীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর

মিয়া হোসেন: ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১৬ আসামীর সবাইকে মৃত্যুদ- দিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বেশকিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এখন নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদ-ের রায় (ডেথ রেফারেন্স) হাইকোর্টে আসার কথা রয়েছে। সেই সাথে আসামী পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করবে। আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের পর রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার প্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সবে মাত্র রায় হলো। এখনো অনেক সময় বাকী রয়েছে এ রায় কার্যকর হওয়ার। কেননা আপীল আবেদন করার পর পেপারবুক তৈরী হতে সময় লাগবে। হাইকোর্টে আপিলের রায়ের পর বেশকিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তারপর হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগে আবার আপিল হবে। আপিল বিভাগের রায়ের পর আবার আপিলের রিভিউ হবে। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা প্রক্রিয়া শেষ করে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে।

আপীলের বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ, রায় বা আরোপিত দ- দ্বারা সংক্ষুব্ধ পক্ষ, উক্ত আদেশ, রায় বা দ-াদেশ প্রদানের তারিখ হইতে ষাট দিনের মধ্যে, হাইকোর্ট বিভাগে আপীল করিতে পারিবেন।

কিন্তু নুসরাত হত্যার রায়ের শেষাংশে বলা হয়েছে, রায়ের বিরুদ্ধে আসামীরা চাইলে বা ইচ্ছা করলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করতে পারবেন। আসামী পক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, তারা সাত কার্যদিবসের মধ্যেই হাইকোর্টে আপিল করবেন।

রায়ে আরও বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারায় ‘মৃত্যুদ- অনুমোদনের’ জন্য মহামান্য হাইকোর্টে পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রায়ের অনুলিপি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেল সুপার ফেনী বরাবর পাঠানোর জন্য রায়ে বলা হয়েছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ জজ মামুনুর রশিদ সব আসামীর মৃত্যুদ- দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া রায়ে সব আসামীকে পৃথকভাবে এক লাখ টাকা করে অর্থদ- করা হয়েছে। নুসরাতকে হত্যার পর প্রায় সাত মাসের মধ্যে বিচারকাজ শেষ হলো।

রায়ের পর নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এমনই হওয়া উচিত। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর স্বল্প সময়ে রায় হওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ রায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে হাইকোর্টে। কতজনের ফাঁসি থাকবে বা থাকবে না এটা হাইকোর্টের জন্য বিবেচ্য বিষয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে সন্তোষ প্রকাশ করছি এ জন্য যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে বিচারকাজটা সম্পন্ন হলো।’

দেশব্যাপী আলোচিত এ হত্যা মামলার রায়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করবেন আইনের বিধান অনুযায়ী। বিচারিক আদালতের রায়ের কপি হাইকোর্টে আসতে ফৌজদারি কার্যবিধির কয়েকটি ধারা অনুসরণ করা হবে।

ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এজন্য ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণের) নথিপত্র হাইকোর্টে আসবে রায় ঘোষণার সাতদিনের মধ্যে। তামাদি আইনের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে সাতদিনের মধ্যে। এরপর যথযাথ নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য তৈরি করা হবে পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত)।

সাধারণত ডেথ রেফারেন্স শুনানি করা হয় বিভিন্ন উচ্চ আদালতের নিয়ম অনুযায়ী। তবে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিলে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে। ইতোপূর্বে বিভিন্ন মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি এ রকম নির্দেশ দিয়েছিলেন।

হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স শুনানি করে মৃত্যুদ-ের সাজা বহাল রাখতে বা কমাতে পারেন। আইন অনুযায়ী আসামিরাও সাজা থেকে খালাসের জন্য আপিল করতে পারবেন। তামাদি আইনের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হয়। আপিল করলেই বিচারিক আদালতের সাজা স্থগিত হয়ে যাবে। এটি আইনের বিধান। ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট। এরপর এ মামলার কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করতে পারবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। এখানে আপিল আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এরপরই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধির কতিপয় ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের বিধান করা হয়েছে। আপিল বিভাগে যাওয়ার আগে প্রয়োজন হতে পারে লিভ টু আপিলের (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন)। লিভ টু আপিল গ্রহণ করা হলে আপিল করতে পারবেন সংক্ষুব্ধ আসামী বা বাদীপক্ষ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪২ (ক) ধারা অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। আপিল দায়েরের পর ৯০ দিনের মধ্যে সেটি নিষ্পত্তি করতে হয়। আপিলে মৃত্যুদ- বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন আসামীরা। দ-বিধির ৫৫ (ক) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আসামীকে ক্ষমা করে প্রাণভিক্ষাও দিতে পারেন।

ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার দুপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ রায়ের জন্য গতকালের দিন ধার্য করেছিলেন। গতকাল রায় ঘোষণা করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ