বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সবার দ্বারা সবকিছু হয় না

 আবু মহি মুসা : এখনও কী এমন বন্ধু পাওয়া যায়, শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত জোড়া লাগা কলার মতো এক হয়ে চলা? এমনই দুজন বন্ধু রাজিব এবং সজিব। রাজিবের বাড়ি বরিশাল। সজিবের বাড়ি  মানিকগঞ্জে। সজিবদের বাড়ির পাশেই রাজিবের মামাবাড়ি। রাজিব মামাবাড়ি এসে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সজিবও একই ক্লাসের ছাত্র। ওরা দুজন ঠিক জোড়া লাগা কলার মতো এক প্রাণ, এক দেহ হয়ে চলে ফেরা করে। ওদের বলা হয় মানিক জোড়। একই স্কুল থেকে ওরা দুজনই প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করলো। মানিকগঞ্জ কলেজ থেকে ইন্টিামিডিয়েট এবং বি.এ. পাস করার পর ঢাকাতে এম.এতে ভর্তি হবে। ঠিক এমন সময় পুলিশের এস.আই.পদে লোক নেয়া হবে, বিজ্ঞপ্তি দেয় হলো। সজিব রাজিবকে  বললো, ‘পুলিশে লোক নেবে, চল আমরা দরখাস্ত দেই।’

রাজিব বললো, ‘ দোস্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়বো। পুলিশের চাকরি করবো না।’

‘দরখাস্ত দিলেই কি চাকরি হয়ে যাবে? দরখাস্ত  দেই-।’

শেষ পর্যন্ত  দুজনই দরখাস্ত করলো এবং ঢাকা এসে এস.আই পদে পরীক্ষা দিলো। পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল ভার্তির দিনক্ষণ জানার জন্য। এম.এতে ভর্তির সময় হয়নি এখনও। ওরা মানিকগঞ্জ ফিরে গেল। বেশ কিছু দিন পর, চিঠি এলো ডি.আই.জি. ঢাকা রেঞ্জ অফিস থেকে ইন্টাভিউয়ে উপস্থিত থাকার জন্য। চিঠি পেয়ে সজিব রাজিবকে  বললো , ‘দোস্ত ইন্টাভিউ দেবো।’

‘দোস্ত  চাকরি করবো না তো ইন্টাভিউ দিয়ে কি হবে!’

‘ আর কিছু না হোক, ইন্টারভিউ দেয়ার একটা অভিজ্ঞতা হবে। ইন্টারভিউ দেবো। তুই না করিস না।’

সজিবের অনুরোধ রাজিব ফেলতে পারেনি। ওরা দুজনই ইন্টারভিউ দিলো। ইন্টাভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা রেঞ্জের ডি.আই.জি. মি. ডেমিরাল। দুজন এস.পি. বোর্ডের মেম্বর। এস.পি. দুজনই ছিলেন বাঙ্গালী। ওরা ইন্টারভিউ দিয়ে মানিকগঞ্জ চলে গেল। এর কিছু পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষার তারিখ পড়লো। দুজনই ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলো। ভর্তি হতে যাবে ঠিক এমন সময় পুলিশ হেডকোয়াটার্স থেকে চিঠি এলো দুজনেরই এস.আই. পদে চাকরি হয়েছে। জানুয়ারির ৩ তারিখ রাজশাহী, সারদা পুলিশ একাডেমীতে জয়েন করতে হবে। এবার দুজনই দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, নাকি এস.আই. পদে চাকরিতে যোগদান করবে। নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। রাজিব বাবাকে চিঠি লিখলো। চিঠির উত্তরে বাবা লিখলেন, ব্রিটিশের অধিনে আই.সি.এস. অর্থাৎ ক্লাস ওয়ান পদে বাঙ্গালীদের চাকরি  হবে না। কাজেই এস.আই. পদে চাকরি যখন হয়েছে, তখন তোমরা জয়েন করো। এখান থেকে এস.পি. হতে না পারলেও অন্তত ডিএসপি হতে পারবে।  তোমরা কী জানো কনস্টবল পদ থেকে  একজন বাঙ্গালী ডি.আই.জি হয়েছে? 

রাজিব এবং সজিব, দুজনই সজিবের বাবার কাছে গেল। সজিবের পরিবার অনেকটা গরীব ছিল। বাবা এক বাক্যে বললেন, ‘আমি মনে করি, পুলিশে যোগদান করা উচিৎ। এটা এমন একটি চাকরি মানুষকে যদি সেবা দিতে চাও, এমন সুযোগ কিন্তু অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টে নেই।’

সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেল। দুজনই ট্রাং বেডিং নিয়ে সারদা পুলিশ একাডেমিতে ও.সি. অর্থাৎ  আউটার ক্যাডেট হিসেবে  রিপোর্ট করলো ৩ তারিখ সকাল ১০টায় । ওদের ট্রেনিং ইন্সট্রাক্টর হলেন হাবিলদার রবার্ট ব্রুস। ইতোমধ্যে প্রায় সব ট্রেনিং এসে গেছে। বিকালে তাদের ব্যারাকে সামনে ফল ইন করিয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ,  উপদেশ দিলেন। 

পরদিন ভোর চারটায় বাঁশির হুইশেল বেঁজে উঠলো। সবাই তড়িঘড়ি করে হাত মুখ ধুয়ে সাদা হ্যাফ প্যান্ট, সাদা কেট্স্  এবং পুলওভার পরে পিটির  জন্য মাঠে গেল। প্রচন্ড শীত। টেন ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাঠে ফল ইন।  প্রয়োজনীয় ফরমালিটিশ শেষ করার পর চিফ ড্রিল ইন্সট্রাক্টর প্যারেড মার্চ আপ করার অনুমতি দিলেন।  সারদার প্যারেড গ্রাউন্ড অনেক বড়। প্রায় পনেরো মিনিট লাগে পুরো প্যারেড গ্রাউন্ট চক্কর দিতে।  পি.টি. শেষ করার পর সময় মাত্র অর্ধ ঘন্টা। এর মধ্যে পোশাক চেঞ্জ, নাস্তা করা, রাইফেল নিয়ে মাঠে যাওয়া। একটি সেকেন্ড নষ্ট করা যাবে না এমন তড়িৎ গতিতে রেডি হতে হয়। ৯০ মিনিট প্যারেড। পি.টি প্যারেড শেষ করে দশটায় আইন বিষয়ে ক্লাস। একটায় ছুটি। বিকাল চারটায় আবার প্যারেড।। রাত  আটটা থেকে  দশটা পর্যন্ত ক্লাস। এরপর ঘুম। 

সজিব বললো, দোস্ত আমার  এ কষ্ট সহ্য হচ্ছে না। পালিয়ে বাড়ি যাবো।’

‘সজিব প্রথম প্রথম কষ্ট হবে। তারপর ঠিক হয়ে যাবে। চাররিতে যখন জয়েন করেছি, চাকরি শেষ করে বাড়ি যাবো।

এক বছরের কোর্স। ট্রেনিং শেষ। পোস্টিংয়ের লিস্ট দেখলো। রাজিবের পোস্টিং চিটাগাং এবং সজিবের পোস্টিং রংপুর। ওরা দুজন ব্যারাকে এসে এমনভাবে কান্না শুরু করলো ইন্সট্রাক্টরসহ সবাই হতবাক হয়ে গেল। বিদায় নেয়ার সময় ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে সজিব  বললো, সপ্তাহে একটা করে চিঠি দিস। আবার ভুলে যাসনে।’ এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এটা ওরা কখনো কল্পনা করেনি।  দুজন দু জায়গায় জয়েন করলো। প্রথমে সপ্তাহে  একটা করে চিঠি লিখতো। কাজের চাপে আস্তে চিঠি লেখা কমে আসতে থাকে। এভাবে চললো দুবছর। এরপর কে কোন জেলায় বদলী হয়ে চলে গেছে, এর হাদিস বের করতে পারেনি দুজনই। কাজের চাপে পিডি. সিডি লিখবে না চিঠি লিখবে, এসব ভুলে গেছে। এভাবে পার হয়ে গেল প্রায় বিশটি বছর। এই বিশ বছরে রাজিবের কোনো প্রোমশন হয়নি। দারোগা হিসেবে ময়মনসিংহ  জেলার নেত্রকোনো  থানার ও.সি. রাজিব। ডিএসপি’র বাৎসরিক থানা ইন্সপেকশন। নির্দিষ্ট দিনে সজিব থানা ইন্সপেকশনে নেত্রকোনা থান্য়া হাজির। রাজিব ভাবতে পারেনি তার বন্ধু  ডিএসপি সজিব। দুজন দুজনকে দেখে তো অবাক। সেই কান্নার আবেগ নেই। দুজনেরই খুশীর জোয়ার বইছে দুজনের মধ্যে। সজিবের বাসায় রান্না হলো। কোরমা পোলাউ, মুরগী, খাসির মাংস। মিষ্টি দ্রব্য।  ইন্সপেকশন শেষ করে সজিবকে বাসায় নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিল রাজিবের মিসেসের সাথে।  খেতে বসে এক সময় সজিব হঠাৎ করে  চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘আমি এবার তোর চাকরি  খাবো।’

‘তুই আমার চাকরি খাবি। চাকরি খাবি, ঠিক আছে। আগে খাওয়া দাওয়া শেষ কর। মাসে একবার করে আমার চাকরি যায়।’

‘তোর চাকরি এখনো আছে এটা আমি ভাবতে পারি না।  তোর বাসায় আমি কিছুই খাবো না।

রাজিবের মিসেস কাছেই দাঁড়ানো। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। বললো, ভাইজান, কি হয়েছে। এত রাগ করছেন কেন?

‘ভাবী ও ছাত্র হিসেবে আমার চেয়ে ভালো ছিল। আমি তো ধরেই নিয়েছি আমার আগে ও ডিএসপি হয়েছে। কিন্তু ডিএসপি তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত ইন্সপেক্টর হতে পারেনি। ওকে আমি চিনি। বরিশালের মানুষদের ঘাড়ের রগ একটা ত্যাড়া থাকে। অফিসারদের তোয়াক্কা করতে চায় না। আমার একজন বন্ধু বলেছিল, বস কমিটু নো অফেন্স। ইফ বস্ স্পিটসু অন ইউ, প্রিটেন্ড হট ইস রেইনিং।  সজিব রাজিবকে বললো, বুঝতে পারছো বন্ধু, আমি চাই তুই এবার ইন্সপেক্টরশিপ পরীক্ষা দিবি। নইলে তোর খবর আছে।’ 

‘ভাইজান আমি অনেক বার বলেছি পরীক্ষা দাও। কে কার কথা শোনে।’ বললো রাজিবের মিসেস।

‘ও তো পারে না। অফিসাররা কি চায়? তোষামোদ। এই ধরেন, এসপি ইন্সপেকশনে আসছেন, ওসির চেয়ারে বসে ডিকটেশন দিচ্ছেন। সিগারেটে আগুন ধরাবে। ম্যাচ বের করে সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিল। তাতে এসপি খুশী থাকে। মনে করে অফিসারটা খুবই ওবিডিয়েন্ট।’

রাজিব বললো, ঠিক আছে দোস্ত আমি এবার পরীক্ষা দেবো। আমি কথা দিলাম।’  

সজিব ইন্সপেকশন করে ময়মনসিংহ  চলে গেল। এর ছ’মাস পর এসপির ইন্সপেকশন। এসপি ডেমিরাল। থানায় এসে প্রথমই তিনি অস্ত্রাগার পরীক্ষা করলেন। থানা কম্পাউন্ড ঘুরে দেখলেন। ফিরে এসে ও.সির চেয়ারে বসলেন ইন্সপেকশন রিপোর্ট তৈরী করার জন্য। ও.সি. তার সামনে বসে  ডিকটেশন নিচ্ছেন। ঠিক আধা ঘন্টা ডিকট্শেন দেয়ার পর একটু রিলাক্স। এসপি সিগারেটের কেস থেকে একটা সিগারেট বের করে মুখে দিলেন। ওসি. নিজের পকেট থেকে তড়িঘড়ি করে ম্যাচ বের করে এসপির মুখে সিগারেটে আগুন ধরাতে গিয়ে এক কান্ড কারে বসলো। বিচ্ছিরি কান্ড।  এসপির ছিল লম্বা পাকা মোচ। সিগারেট ধরাতে গিয়ে মোচের অনেক খানি পুড়ে গেল। এসপি সাথে সাথে চিৎকার করে উঠলো ব্লাডি ভালগার! আনফিট গাই’ বলে।’ এসপি  খুশী তো দূরের কথা।  ইন্সপেকশন রেজিসট্রারে লিখলেন, ‘ক্লোজ টু হেডকোয়াটার্স’। এরপর  সাথে করে রাজিবকে ময়মনসিংহ নিয়ে গেলেন। অর্থাৎ রাজিব এখন  ওএসডি। সজিব সাক্ষ্য দেয়ার জন্য খুলনা গেছে। এসে দেখে রাজিব এসপি অফিসে সাদা পোশাকে  ঘুরে বেড়াচ্ছে। সজিব বললো, কিরে অফিস টাইমে সাদা পোশাক পরে অফিসে আসছিস, কী ব্যাপার?

রাজিব চুপ। উত্তর দিল না। মুখটা বিষন্ন। মলিন। কী হয়েছে দোস্ত। এ্যানিথিং রং?

‘তুমি আর কথা বলো না। যা হওয়ার তাই হয়েছে।

‘কি হয়েছে, বলবি তো? 

‘যাও নিজের বুদ্ধিতে ওসিগিরি করতাম , তোমার বুদ্ধি নিয়ে আমার ওসিগিরি চলে গেছে। এসপির মুখে সিগারেটে আগুন ধরাতে গিয়ে এসপি’র মোচ পুড়ে গেছে।  বুঝতে পারছো,  সবার দ্বারা সব কিছু হয় না।

‘কোথায় থাকছো? 

‘পুলিশ ক্লাবে।

‘ভাগ্যে যা আছে, তাই হবে। বাসায় চল। যে কদিন হেডকোয়াটারে আছিস আমার বাসায় থাকবি, খাবি, আরাম করবি।     

 সজিব ওকে নিয়ে বাসায় চলে গেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ