সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য

ড. মো. নূরুল আমিন : গতকাল আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখতে বসেছি তখন একজন অভিভাবক আমার সামনে বসা ছিলেন। তিনি একজন মহিলা, স্বামী মৃত। তার মেয়েকে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ানোর জন্য সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবেন। সেখানে তার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। পরীক্ষার আগের দিন যাবেন, পরীক্ষা শেষ হবার পর ঐ দিনই ফিরে আসবেন। তিনি আমার সহযোগিতা চেয়েছেন। মেয়েকে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর আগ্রহ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। শিক্ষা বছরের চার মাস গত হতে চলেছে। ইউনিভার্সিটিগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। আশা করা যাচ্ছে যে, আগামী জানুয়ারীর মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে ফেব্রুয়ারী থেকে ক্লাস শুরু হবে এবং এর মধ্যে বছরের সাত মাস শেষ হয়ে যাবে। অবশ্য এর মধ্যে যদি তাই হয়, তাহলে সৌভাগ্যের বিষয়ই বলতে হবে। এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি।
১৯৭১ সাল থেকে ২০১৯ সাল। দেখতে দেখতে ৪৮টি বছর আমরা পার করে দিয়েছি। এই ৪৮ বছরের মধ্যে সম্ভবত: একটি বছরও এমন যায়নি যখন নিয়মিত পরীক্ষা অনুষ্ঠান, ফল প্রকাশ ও শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত ভর্তির কাজ সম্পাদন ও সিলেবাস সম্পন্ন করার দাবি কোন না কোন মহল থেকে উঠেনি। কিন্তু তার ফল আমাদের সকলেরই জানা। অবস্থার উন্নতি হয়নি বরং অবনতি হচ্ছে। আমার বয়স যখন একুশ বছর তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিতে পেরেছি। স্বাধীনতার পর থেকে ছেলেমেয়েরা এই সুযোগ পায় না। এ জন্য সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি করার দাবিও সোচ্চার হচ্ছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডসমূহে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন নিয়ে সেশনজটের নামে যে অরাজকতা চলছে কোন স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে তা কল্পনা করা যায় না। কোন ছেলেমেয়ে বর্তমানে ২৫/২৬ বছরের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে না। আগে স্বাধীনতা-পূর্বকালে এর গড় বয়সসীমা ছিল ২১/২২ বছর। অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কর্মচঞ্চল শক্তিধর যৌবনাংশের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ছেলেমেয়েদের এখন অনুৎপাদনশীল  উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গন্ডির মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। জাতি তার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এ অবস্থায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও যৌবনের দিকনির্দেশনাহীন প্রবাহ বহু প্রতিভাবান ছেলেমেয়েকে উচ্ছন্নে যাবার পথে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা অন্যদিকে কর্মপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় তাদের বিলম্বিত আগমন সামাজিক অপরাধের মাত্রা ও পরিসরকে বৃদ্ধি করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথ রুদ্ধ করছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে নয় মাস। সেশনজট হবার যদি যৌক্তিক কোন কারণ থেকে থাকে তাহলে একটি শিক্ষাবছরের জন্য তা হওয়াটা হয়তো অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ৪৮ বছর ধরে তা চলতে পারে না। পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষা বছরের অর্ধেকেরও বেশি গিলে খাওয়া কোন যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাজনীতিবিদদের কাছে সাধারণ মানুষের আরো অনেক প্রশ্ন আছে, যার আশু জবাব প্রাপ্তি অপরিহার্য্য। যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়ে পাঠান আমাদের দেশে তার ৯০ ভাগই নিম্নবিত্তের মানুষ। বহু পরিশ্রমলব্ধ কষ্টার্জিত অর্থ নিজেদের পরিবারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভোগের কাজে ব্যবহার না করে তারা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করেন, স্কুল কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন, সর্বত্রই নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য শ্রেণীভিত্তিক কোর্স ডিজাইন ও কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়ে থাকে এবং তাতে দৈনিক এবং ঘণ্টাভিত্তিক যে পাঠদান সম্পাদন করা হয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারিত থাকে। যদি কোন কারণে কোনও ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষাবর্ষের একটি ক্লাসেও অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে শিক্ষক-শিক্ষিকার উক্ত পাঠদান থেকেও বঞ্চিত হন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাদানের বিনিময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু বেতনই দেয় না বরং ভবন তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যাস বিদ্যুৎ প্রভৃতিসহ অপরাপর জড় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির জন্যও অর্থ পরিশোধ করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে যেসব ছাত্রছাত্রী বারো মাসের শিক্ষাবর্ষের মধ্যে ১২ দিনও ক্লাস করতে পারলো না, তাদের কাছ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোন্ যুক্তিতে সারাবছরের বেতন ও সেশন ফি আদায় করে? শিক্ষার্থীদের জন্য এটা কি জরিমানা নয়?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই এখন শিক্ষক ও পার্টি রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এই মঞ্চ দখল নিয়ে পেশাজীবী ছাত্রদের মধ্যে মারামারি হয়। ক্ষমতাসীন দলের আশির্বাদপুষ্ট যারা তারা টর্চার সেল তৈরি করে বিরোধীদের শায়েস্তা করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা পাঠ দান থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে শিক্ষকরা কিন্তু বেতন থেকে বঞ্চিত হয় না। ছাত্ররা বর্তমানে কতিপয় দল ও রাজনীতিকের ক্ষমতায় আরোহণের বাহনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন মানে এখন সন্ত্রাসের লীলাক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু নয় এখন কলেজ এমনকি স্কুলের শিক্ষকরাও রাজনীতি এবং বাণিজ্যনীতির পংকীলাবর্তে পড়ে ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন।
আমি দেশের দু’টি প্রতিষ্ঠানকে এখন একই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করে থাকি। এর একটি হচ্ছে হাসপাতাল, আরেকটি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া মুস্কিল; চিকিৎসা পেতে হলে প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তেমনি শিক্ষা খুঁজে পাওয়া দুরূহ। এজন্য প্রাইভেট কোচিং এর আশ্রয় নিতে হবে। যারা কোচিং করবে না শিক্ষকরা তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রে কোয়ালিটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। আমরা বলে থাকি, বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বৃদ্ধরা গতায়ু, শিশুরা অনাগত এবং যুবকরাই হচ্ছে বর্তমান ও ভবিষ্যত। আজকে যে শিশু কালকে সে পিতা, মাতা, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রনায়ক, তাদের শিক্ষা প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে বর্তমান ও ভবিষ্যত এমনকি অস্তিত্বও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বর্তমানে যে ফসল বেরিয়ে আসছে তার মধ্যে চিটার পরিমাণে এতবেশি যে দেশ পরিচালনার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে ভয়ে আঁৎকে উঠতে হয়। দেশে একটি জেনারেশন গ্যাপ সৃষ্টি হচ্ছে যা পূরণ হবার আশু কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। রাজনীতি এখন দেশে নেই। বিরোধী রাজনীতিকরা অনেকটা অবরুদ্ধ, ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা নিয়ে ব্যস্ত; শিক্ষকরা ব্যবসায়িক টিউশনী এবং কনসাল্টেনন্সির পিছনে দৌঁড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বুদ্ধিজীবীরা কেউ নির্লিপ্ত কেউ একে অপরের চরিত্র হননে মত্ত, জাতির ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য চিন্তা করবে কে? চিন্তা অবশ্যই কাউকে করতে হবে এবং তা অতিসত্ত্বর। যারা এর জন্য এগিয়ে থাকবেন তারা অবশ্যই বরেণ্য হয়ে থাকবেন। নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমি চিলির নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি জেব্রিটেলা মিস্ট্রালের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনার সমাপ্তি টানতে চাই। তিনি বলেছেন We are guilty of many errors and faults but our worst crime is abondoning the children, reglecting the foundation of life. Many of the things we need can wait. The child can not.
Right now is the time his borns are being formed, his bllod is being made and his senses are being developed. To his we cannot answer “Tomorrow” His name is ‘today’.
অর্থাৎ অনেক ভুলভ্রান্তির অপরাধে আমরা অপরাধী। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ হচ্ছে জীবনের প্রস্রবনকে উপেক্ষা করে বংশধরদের পরিত্যাগ করা। আমাদের অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আহরণ বিলম্বিত করা যায় কিন্তু ছেলে-মেয়েদের জীবন গঠনের চাহিদা পূরণকে বিলম্বিত করা যায় না। ছেলে-মেয়ের অস্থি গঠন শরীরের শোণিত সৃষ্টি, মেজাজ গঠন বিচার শক্তি বুদ্ধি ও জেনেন্দ্রিয় বিকাশের এটাই হচ্ছে উপযুক্ত সময়, এটা হচ্ছে তার চাহিদা। তার এই চাহিদার জবাবে আমরা তাকে আগামী দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলতে পারি না। তবে এই চাহিদা পূরণ করতে হবে আজ এবং এক্ষুণি। এই উদ্ধৃতির আলোকে আমরা কি আমাদের অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ