সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

পাঁচ কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা

এইচ এম আকতার : রফতানি আয় আর আমদানি ব্যয় দুটোই কমছে। আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার হারও কমেছে। পাশাপাশি কমেছে এলসি নিষ্পত্তির হারও। আর বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। এই পাঁচ নেতিবাচক ধারা ঠেকাতে এবার কমানো হচ্ছে টাকার মূল্য। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে রফতানি খাতে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে নিম্নমুখী এই প্রবণতার চিত্র উঠে এসেছে।
নানা উদ্যোগের পরে রফতানি আয় কমছেই। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছেই। বিশ্লেষকরা বলছেন সরকারের বড় বড় মেগা প্রকল্পের কারণেই আমদানি ব্যয় ঠেকানো হচ্ছে না। এ জন্য ডলারের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করেন ব্যবসায়ীরা। আর ডলারের দাপট কমাতে এবার টাকার মূল্য কমানো হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শিগগির এই সমস্যা হয়তো কেটে যাবে। কেননা, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমানো হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে রফতানি খাতে। আর রফতানি খাত ইতিবাচক ধারায় ফিরলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়বে। এ ছাড়া, বৈদেশিক বাণিজ্য নিম্নমুখী হলেও প্রবাসী আয় কিছুটা শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সরকার বিনিয়োগের জন্য সারা দেশে প্রায় ১০০ টি অর্থনৈতিক জোন তৈরির ঘোষণা দিলেও এ সব জেনে বিনিয়োগ উপযোগী হতে আরও বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। ব্যাংকগুলো তারল্য সংকট থাকাতে বিনিয়োগ হচ্ছে খুবই কম। বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার জাপান, কোরিয়া,সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশের প্রতি সরকার আহবান জানিয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় হয়েছে ২৯১ কোটি ৫৮ লাখ ডালার। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল ৩১৪ কোটি ৫৫ লাখ ডালার। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় রফতানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রফতানি আয় হয়েছে ৯৬৪ কোটি ৭৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত বছর একই সময়ে এই আয় ছিল ৯৯৪ কোটি ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রফতানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে আমদানি বাবদ ব্যয় কমেছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি বাবদ ব্যয় কমেছে ২ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই সময়ে (জুলাই-আগস্ট) আমদানি হয়েছে (কাস্টম বেইজ ইমপোর্ট) হয়েছে ৯৩১ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, অনেক দিন ধরেই খাদ্যশস্য আমদানি কমেছে, এর ফলে আমদানি ব্যয় কমে গেছে। এছাড়া সরকারের বড় বড় প্রকল্পের জন্য আমদানি আগের মতো করতে হচ্ছে না। আর রফতানিতে নেগিটিভ প্রভাব পড়ার কারণ ডলারের মূল্য। তবে সামনেই এই সমস্যা হয়তো কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এর কারণ হিসেবে জায়েদ বখত বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমানো হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে রফতানি খাতে।  আর রফতানি খাত ইতিবাচক ধারায় ফিরলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়বে।
এদিকে, আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানির জন্য এলসি খোলার হারও কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট এই দুই মাসের তুলনায় আগের বছরের একই সময়ে এলসি খোলার হার কমেছে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। শুধু আগস্টে এলসি খোলার হার কমেছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় আগের বছরের একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তির হার কমেছে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ।
যদিও জুলাই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যশস্য (চাল ও গম) আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছিল ১৫২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বিদেশ থেকে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের খাদ্যশস্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়। আর গত জুলাইয়ে এলসি খোলা হয়েছে ১৭ কোটি ৮ লাখ ডলারের। তবে পরের মাস আগস্টেই এলসি খোলার হার কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে তথ্যমতে, এ বছরের জুলাইয়ের তুলনায় আগের বছরের জুলাইয়ে খাদ্যশস্য এলসি নিষ্পত্তির হার কমেছে ৪০ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত সার্বিক আমদানির বাণিজ্য নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। জুনে আমদানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগের মে মাসেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত এপ্রিলে আমদানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে আমদানির পরিমাণ কমে গেছে। ২০১৮ সালের জুনে আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪২৫ কোটি ৭২ লাখ ডলার। ২০১৯ সালের জুনে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৩৮৮ কোটি ১২ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। ৩০ সেপ্টেম্বরের তুলনায় আগের বছরের একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এছাড়া এই অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্য নিম্নমুখী হলেও প্রবাসী আয় কিছুটা শক্ত অবস্থানে রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃপক্ষের (বিডা) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলামের বক্তব্য উল্টো। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল। অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে। সহজে ব্যবসা করার সূচকেও মোটামুটি ভাল অবস্থানে রয়েছে। আগের তুলনায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক। বন্দরগুলোতে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে দেশকে বিনিয়োগ উপযোগী করার জন্য যা প্রয়োজন তার সবই হচ্ছে। এসব কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে।
বিশ্ববিনিয়োগ মন্দায়ও বাংলাদেশ ভাল করছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, গত বছর সারা বিশ্বে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ এই বিনিয়োগ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। গত বছরও জাপানের একটি কোম্পানি এককভাবে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
বিদেশি বিনিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠাধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কতৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো। এসব অঞ্চলে ইতোমধ্যে চীন, জাপান, ইইউ, সৌদি আরবসহ অনেক দেশ বিনিয়োগ করেছে।
পবন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এখন ব্যবসাবান্ধব দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে। সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবে না। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সেজন্য দরকার অবকাঠামোসহ ব্যবসা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে আরো উন্নত করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ