বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এ শপথ হোক সকলের

হত্যা-সন্ত্রাস, গুন্ডামি ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিসহ সকল অন্যায় ও অপকর্ম প্রতিরোধের শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়Ñ বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত বুধবার বুয়েট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক অভূতপূর্ব সমাবেশে নেয়া শপথে সকল ক্লাস ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চারিত শপথে আরো বলেছেন, বুয়েটের আঙিনায় তারা আর কোনো নিরীহ-নিরপরাধ শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে যেতে দেবেন না। আর কখনো যাতে আবরারের মতো নিরপরাধ শিক্ষার্থীকে হত্যাকান্ডের অসহায় শিকারে পরিণত না হতে হয় সেটাও তারা সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে নিশ্চিত করবেন। শপথে হত্যা-সন্ত্রাসের পাশাপাশি সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। 

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থাকলেও ভাইস চ্যান্সেলর এবং বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট ও প্রক্টরসহ বুয়েটের শিক্ষকরা শপথ পাঠ করেননি। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি বলেছেন, তারা আগেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতিতে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে এক প্রকার শপথ নিয়েছেন বলে ছাত্রদের সঙ্গে শপথ নেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। শিক্ষকদেরই অনেকে অবশ্য অন্য একটি বিশেষ কারণের উল্লেখ করে জানিয়েছেন, হত্যাকান্ডের পরপর তারা ভিসি শামসুল ইসলামের পদত্যাগের দাবি উত্থাপন করেছেন। অন্যদিকে ভিসি পদত্যাগ করেননি বরং তিনিও এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শপথ পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। বিষয়টিকে নিষ্ঠুর রসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মূলত সে কারণে অর্থাৎ ভিসির পদত্যাগের দাবিকে আরো শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শপথ পাঠ করা থেকে বিরত থেকেছেন। তবে তারা বুয়েট ক্যাম্পাসে হত্যা-সন্ত্রাসসহ সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও তৎপর থাকবেন। শিক্ষার্থীদের দাবি ও আন্দোলনের প্রতিও সর্বান্তকরণে সমর্থন ও সংহতি জানাবেন। 

আমরা বুয়েট শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই এবং তাদের উচ্চারিত শপথ বাক্যের সকল বিষয়ের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি। হত্যা-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নির্যাতন, বৈষম্য এবং মদ-জুয়াসহ অনৈতিক কর্মকান্ড প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা যে শপথ পাঠ করেছেন তাকে আমরা শুধু অভূতপূর্ব নয়, শিক্ষণীয় বলেও স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি, বুয়েট শিক্ষার্থীদের এই শপথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তারাও সর্বতোভাবে অন্যায় ও অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এভাবেই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্ত্রাস-গুন্ডামি ও গুকলুষমুক্ত করে তোলা এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এটাই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার। 

বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সরকারকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উদ্যোগী হতে হবে। আমরা মনে করি, বুয়েটের নিহত ছাত্র আবরার ফাহাদের পিতা-মাতাসহ স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে আশ্বাস, ঘোষণা ও নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলোর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হলেই শিক্ষাঙ্গনকে হত্যা-সন্ত্রাসমুক্ত করার লক্ষ্যে কার্যক্রমের শুভ সূচনা হতে পারে। বুয়েটের ক্ষেত্রে আমরা একই সঙ্গে ভিসি এবং শেরে বংলা হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবির প্রতি সমর্থন জানাই। কারণ, হত্যাকান্ড সম্পর্কে জানাজানি হওয়ার এবং পুলিশ আসার পরও এই দু’জন নিহত ছাত্র আবরারের লাশ পর্যন্ত দেখতে যাননি। তারা এমনকি আবরারের নামাজে জানাজায়ও অংশ নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। 

ভিসি ও প্রভোস্টের এ ধরনের মনোভাব, প্রতিক্রিয়া ও কার্যক্রমকে আমরা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য মনে করি। বলা দরকার, মূলত এসবের পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের পদত্যাগ ও অপসারণের দাবি তুলেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। আমরা আশা করতে চাই, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দাবি পূরণের মাধ্যমে বুয়েট ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে, যার ভিত্তিতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অন্যায় ও কলুষমুুক্ত করা সহজে সম্ভব হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ