মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে না ফেরার ঘোষণা

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বুয়েট ক্যাম্পাসে মিডিয়া ব্রিফিং করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা -সংগ্রাম

#    ঢাকা কলেজ ছেড়েছেন আবরারের ছোট ভাই
#    বিচার দাবিতে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ 
স্টাফ রিপোর্টার : বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হওয়া আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে এখনই তারা ক্লাসে ফিরছেন না। আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছেন, আজ বুধবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে নতুনভাবে চলার পথ শুরু করতে গণশপথ নেয়া হবে। তবে খুনিদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার আগ পর্যন্ত ক্লাসে ফিরে যাবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এ দিকে ঢাকা কলেজ ছেড়েছেন আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ। এ ছাড়া বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শহীদ মিনার চত্বরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের ১০ দাবির মধ্যে তিনটি দাবি ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। আমরা দেখেছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুততার সাথে আসামিদের গ্রেফতার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। আমরা তাদের ওপর সন্তুষ্ট ও ধন্যবাদ প্রকাশ করছি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ প্রকাশ করছি, তিনি এ বিষয়ে সজাগ না থাকলে এত দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা নেয়া হতো না।
তারা বলেন, বুয়েট প্রশাসনের কাছে আমাদের পাঁচটি দাবি ছিল। সেসব দাবির অধিকাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ কারণে আমরা বুয়েট প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমাদের মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে বুধবার থেকে আমাদের সব আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে। সেদিন সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মিলে বুয়েট ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে শপথ পাঠ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা বলেন, আবরার হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা বলেন, আন্দোলন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়া হলেও আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আবরার হত্যার চার্জশিট দেয়ার পর বুয়েট প্রশাসন অপরাধীদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার পর তারা ক্লাসে ফিরবেন বলেও ঘোষণা দেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীরা বলেন, নতুনভাবে শিক্ষকদের সঙ্গে পথচলার পথ তৈরি করতে বুয়েট শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গণশপথ পাঠ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে যদি অসন্তোষ তৈরি হয় তবে সেটির লাঘব হবে বলে আমরা মনে করি। তবে কখন গণশপথ পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োাজন করা হবে সে বিষয়ে শিক্ষকদের সাথে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। এরপর তারা বুয়েট শহীদ মিনার চত্বর ছেড়ে ক্যাম্পাসের দিকে চলে যান।
এর আগে আবরার হত্যার বিচার দাবিতে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গনে বৈঠক করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। বৈঠক শেষে বিকাল ৫টার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন তারা।
এর আগে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে গত রোববার ও সোমবার আন্দোলন শিথিল করে মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসে আবার জড়ো হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গত সোমবার আবরার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষরও সংগ্রহ করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা: বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা ‘বিচার বিচার বিচার চাই, আবরার হত্যার বিচার চাই’ স্লোগানে মুখর করে তুলছেন রাজধানীর ব্যাংকপাড়া মতিঝিল।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত মতিঝিল শাপলা চত্বরের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। নটরডেম কলেজের সঙ্গে ভিকারুননেসা কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন।
বিক্ষোভকালে শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার খুনিদের গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। ‘বিচার বিচার বিচার চাই আবরার হত্যার বিচার চাই’, ‘পরের গোলামি করি না, করব না’, ‘দেশকে ভালোবাসা যদি অপরাধ হয় তাহলে আমরা হাজারবার অপরাধ করতে রাজি’, ‘চল যাই যুদ্ধে র‌্যাগিং এর বিরুদ্ধে’, ‘আমার ভাইয়ের নিরাপত্তা কে দেবে?’, ‘জীবিত ভাইয়ের ঘরে ফেরা দেখতে চাই, মৃত্যু নয়’ ইত্যাতি স্লোগানে মুখর করে তোলেন তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে। এখন পর্যন্ত সব খুনি গ্রেফতার হয়নি কেন? আমরা খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। র্যাগিংয়ের নামে অন্যায় আচরণ বন্ধ চাই। আমরা আবরার হত্যাসহ শিক্ষাঙ্গনে সব হত্যার বিচার চাই। শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার সুস্থ পরিবেশ চাই। এ দাবিতেই আমাদের এ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন।
ঢাকা কলেজ ছাড়লেন আবরারের ছোট ভাই: ছাত্রলীগের হাতে খুন হওয়া বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ ঢাকা কলেজ ছাড়লেন। ছাড়পত্র নিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল দুপুর ১টায় ঢাকা কলেজে যান আবরার ফাইয়াজ। এ সময় তার স্বজনরা সাথে ছিলেন।আবরার ফাইয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, বড় ভাইয়ের এমন মৃত্যুতে পুরো পরিবার মুষড়ে পড়েছে। আর বাবা-মা চান না আমি তাদের ছেড়ে থাকি। তাই ঢাকা কলেজ ছাড়লাম। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আবরার ফাইয়াজ ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। এখান থেকে ছাড়পত্র নিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের তাকে (ফায়াজ) ভর্তি হবেন তিনি।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নেহাল আহমেদ বলেন, আবরার ফাইয়াজের ঢাকা কলেজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত একান্তই তাদের পারিবারিক। আমি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলাম। তারপরও তাদের এবং প্রশাসনের ইচ্ছায় তার কলেজ বদলির ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।
আবরার ফাইয়াজের ছাড়পত্রের ব্যাপারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, আবরারের ছোট ভাই কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পড়তে চান। বিশেষ ব্যবস্থায় আজ ছাড়পত্রের আবেদন করেন তিনি। তার ছাড়পত্র মঞ্জুর করা হয়েছে।
এর আগে গতকাল সোমবার বিকেলে আবরারের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে গত ৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জেরে পরদিন ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ