বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

এখনো বহাল তবিয়তে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক রমিজউদ্দিন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগের পাশাপাশি মানিলন্ডারিং আইনে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক মামলা করার পরও বহাল তবিয়তে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. রমিজউদ্দীন সরকার। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতীম সংগঠন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ ডিপিডিসির কেন্দ্রীয় কমিটির এই সভাপতির  বিরুদ্ধে নামে-বেনামে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় বেশ কয়েকটি বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট, কয়েকটি স্থানে জমি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও ডিপিডিসি একে অপরের উপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ডিপিডিসির শীর্ষ এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) মো. রমিজ উদ্দিন সরকারের দুর্নীতি মামলা তদন্তে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল রোববার দুপুরে দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য।
দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক মো. রমিজউদ্দীনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ কায় কাউছ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, রমিজউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর আমরা জেনেছি। এখানে মন্ত্রণালয়ের কিছুই করার নেই। যেহেতু ডিপিডিসি একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাই তারাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ডিপিডিসি’র বোর্ড চেয়ারম্যান মোঃ শফিক উল্ল্যাহ বলেন, রমিজউদ্দিনের বিরুদ্ধে ডিপিডিসি বোর্ড ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এটি ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই সিন্ধান্ত নিতে হবে। আপনি ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই জিজ্ঞেস করুন।
ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক মো. রমিজউদ্দীনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, আপাতত কোনো মন্তব্য করতে পারছিনা। তিনি একটি জরুরী মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।
সূত্র মতে, গত ৬ অক্টোবর ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক মো. রমিজউদ্দীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামি নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) প্রকৌশলী রমিজ উদ্দিন সরকার তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ১ কোটি ১৮ লাখ ৯২ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করেছেন। এছাড়া দুদকের অনুসন্ধানে নামে-বেনামে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৯ হাজার ৮৬৭ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মানিলল্ডারিং আইনে তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৬৭ টাকা স্থানান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে মানিলল্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ও (৩) ধারায় দায়ী করা হয়েছে।
ডিপিডিসির নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, প্রভাবশালী এই নিবার্হী পরিচালকের সাথে অনেক কর্মকর্তাই রয়েছে যারা তার অবৈধ অর্থ বিত্তের সাথে সর্ম্পক রয়েছে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আসে। এরপর প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। চলতি বছরের ৭ মার্চ স্ত্রীসহ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, রমিজ উদ্দিনের নামে ঢাকায় পাঁচটি বাড়ি, গাজীপুরে ৩০ একর জমি এবং তার জন্মভূমি কুমিল্লাতে কয়েক একর জমি রয়েছে।এছাড়া তার স্ত্রী সালাম পারভীনের নামেও কুমিল্লায় কয়েক একর জমির পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন তারা।
অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, রমিজ উদ্দিনের নামে রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর সড়কে সাত তলা একটি বাড়ি আছে। এছাড়া মিরপুরের পূর্ব মনিপুর ১৩০৭/ডি ছয়তলা, মিরপুরের ২৮ মল্লিকা মিল্কভিটা রোডে চার তলা ফ্ল্যাট বাড়ি, রামপুরা মহানগর হাউজিংয়ে ৮ নম্বর সড়কের ডি ব্লকে ২০২ নম্বর হোল্ডিংয়ে ৪ দশমিক ৫ কাঠা জমির উপর পাঁচটি দোকান ও টিনসেড বাড়ি এবং পূর্ব রামপুরা ১৭৭/৫/১ ঠিকানায় ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ জমি উপর বাড়ি করেছেন তিনি। এগুলোর বাইরে টঙ্গী ও গাজীপুরে নামে- বেনামে রমিজ উদ্দিনের ৩০ একর জমি রয়েছে। কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে একরে একরে জমি। জেলার মুরাদনগরে স্ত্রী সালমা পারভীনের নামে রয়েছে ৫০ বিঘা জমি। পুঁজিবাজারে এই দম্পতির নামে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ছাড়াও নামে-বেনামে তাদের আরও অনেক অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন তিনি।
দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গাজীপুরে জমি বিক্রি করে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার এবং পরে বাংলাদেশে ফেরত আনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আসার পর অনুসন্ধান শুরু হয় বলে জানান দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রনব। দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান এই অনুসন্ধান করছেন।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক ক্ষতাসীন আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতীম একটি পেশাজীবি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। দলীয় মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার মলিক হন তিনি। তার এই দুর্নীতির সাথে ডিপিডিসির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাও জড়িত। তাই রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও ডিপিডিসি একে অপরের দায় চােিপয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। ডিপিডিসির আরেকটি সূত্র জানান, রমিজউদ্দীনকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রভাবশালীমহল এখন মাঠে নেমেছে। দুদক সূত্র জানায়, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালকদের বিষয়েও দুদক গোপনে তদন্ত করছে। 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক মো. রমিজউদ্দীন সংগ্রামকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে দুদকের করা সব অভিযোগই মিথ্যা। আমি আমার ও পরিবারের যাবতীয় হিসেবের তথ্য জমা দিয়েছি। তিনি বলেন, আমি এখন ছুটিতে আছি। আগামী সপ্তাহে জয়েন্ট করবো। তখন আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের জবাব দেবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ