বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সময় থাকতে ক্ষমতা ছাড়তে সরকারকে হুঁশিয়ারি ড. কামালের

গতকাল রোববার বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের উদ্যোগে জমায়েত শেষে নাগরিক শোক র‌্যালি বের করলে তাতে পুলিশ বাঁধা দেয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নাগরিক র‌্যালিতে পুলিশের বাঁধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভা শেষ করে র‌্যালি করতে গেলে পুলিশের বাঁধার সম্মুখীন হন। র‌্যালিতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, প্রেসিডিয়াম সদস্য তানিয়া রব, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরাম নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক আবু সাঈদ প্রমুখ অংশ নেন।
র‌্যালিতে পুলিশি বাধার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন আ স ম আবদুর রব। তিনি বলেন, সরকার ভীত হয়ে গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। বাধার প্রতিবাদে আগামী ২২ অক্টোবর প্রতিবাদ সভার ঘোষণা দেন রব।
এর আগে নাগরিক শোক র‌্যালীপূর্ব সমাবেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময় থাকতে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। অন্যথায় পালানোর সুযোগ পাবেন না।
তিনি বলেন, আপনারা কোনো শক্তিশালী সরকার না, জোর-জুলুম, জবরদস্তি করতে পারেন। এদেশের মাটি, এদেশের মানুষ সবাইকে শিক্ষা দিয়েছে। এগুলো করে পার পাওয়া যায় না, এবারও পার পাওয়া যাবে না। সময় থাকতে বুঝেন এগুলো। সময় থাকতে মাথা ঠান্ডা করে এদেশকে কুশাসন থেকে মুক্ত করেন। সভ্যভাবে আপনি দ্রুত সরে যান, নির্বাচন ঘোষণা করেন। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটা গ্রহনযোগ্য নির্বাচন কমিশন দায়িত্বে থাকুক। জনগণ মালিক তারাই ঠিক করবে কে ক্ষমতা হবে। জনগন ক্ষমতার মালিক- এটা সংবিধান জনগনকে দিয়েছে।
একাদশ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের ভোট ডাকাতির সমালোচনা করে সংবিধান প্রণেতা বলেন, আপনি তো নাট্যকার, আপনি তো কোনো নেত্রী নন। এই যে আমি দেখলাম ৩০ তারিখ রাতে সবাইকে ধন্যবাদ-মোবারক বাদ দিয়ে বলছেন, আপনারা সবাই আমাকে আরো ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছেন। স্বঘোষিত আপনি। এই মিথ্যা দিয়ে আপনি কতদিন ভুল পথে চলবেন। এই মিথ্যা শিকার যে হয়েছে তার ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে। তৃতীয়বার আপনাকে কেউ নির্বাচিত করেনি। আমি সাক্ষী দেবো কেউ আপনাকে নির্বাচিত করে নাই।
সভা-সমাবেশ করতে না দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সমাবেশ করার অধিকার সংবিধানে আছে। সর্বোচ্চ আইন ভেঙ্গে তারা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে দেশে সভ্যতা থাকবে না, মৌলিক অধিকার থাকবে না। অর্থাৎ যারা এগুলো করছে জেনে রাখুন, এদেশের মাটি মানুষ এগুলোকে কোনদিন মেনে নেয়নি। সমাবেশ করার অধিকারগুলোকে ভোগ করতে গিয়ে যারা বাঁধা দিচ্ছে- এটা তারা দেশদ্রোহীতার কাজ করছেন, দেশদ্রোহীতার শাস্তি তো হবে কড়া শাস্তি হবে। আমরা এখন থেকে বলব, নাম, পিতার নাম তালিকা করা শুরু করুন। জনগন ক্ষমতায় আসলে অবশ্যই এর বিচার হবে।
শেখ হাসিনাকে ‘নাট্যকার!’ বলেও উল্লেখ করেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আপনি নেত্রী নন নাট্যকার! সভ্যভাবে সরে যান’ সভ্যভাবে সরে যান। যথেষ্ট হয়েছে। আর কত? তৃতীয়বার? তৃতীয়বার কে আপনাকে নির্বাচিত করেছে। আমরা তো দেখেছি ২৯ তারিখ রাতের পর ৩০ তারিখ সকালে এসে আমি হয়ে গেছি, আগামী পাঁচ বছরের জন্য আমি হয়ে গেছি, আপনাদেরকে ধন্যবাদ দেই,’ বলেন এই নেতা। শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, আপনি নিজে মিথ্যার শিকার হচ্ছেন। মিথ্যার শিকার যারা হন, তাদের পরিণতি হয় ভয়াবহ। মিথ্যা দিয়ে আপনি কতদিন ভুল পথে চলবেন? আমি স্বাক্ষ্য দেবে, তৃতীয়বার আপনাকে কেউ নির্বাচিত করে নাই বলেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কাকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন? আমরা কেউ সেই প্রতারণার সঙ্গী না। আমরা সেই প্রতারণার ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখি নাই।
ড. কামাল বলেন, আমি ক্ষমতা চাচ্ছি না। এই মঞ্চের কেউ-ই চাচ্ছে না। ১৬ কোটি মানুষের কাছে মালিকানা ছেড়ে দিন। কুশাসন থেকে মানুষ মুক্ত হোক। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হোক। আপনি সরে দাঁড়ান। আপনাকে সরতেই হবে। দেশের প্রতিদিন যে ক্ষতি হচ্ছে, সেই ক্ষতি থেকে বাঁচতে আপনাকে সরে দাঁড়াতেই হবে।
বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকা-ের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে কামাল হোসেন বলেন, এই বাংলার ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছিলো এরা সৎ, সাহসী ছেলে। এদেরকে বানাচ্ছেন পশু, তাদেরকে আপনারা হত্যাকারী বানাচ্ছেন। এটা ভালো কাজ করছেন না। যারা মানুষকে অমানুষ বানাচ্ছে, পশু বানাচ্ছে আপনাদের কী শাস্তি হবে চিন্তা করুন। জনগনকে বলি, কারা ছেলেদের পশু বানাচ্ছে- আপনারা মহল্লায়-পাড়ায় এদেরকে চিহ্নিত করুন এবং আমরা ঐক্যমতে আনবো যে, এদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
তিনি বলেন, দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, যে সরকার এখন আছে, যে দলের নাম নিয়ে তারা দেশ শাসন করছে সেই দলে আমরা সবাই ছিলাম, সবাই মিলে দেশ স্বাধীন করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তাজউদ্দিন আহমদ, নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে। যেগুলো কাজ হচ্ছে এটা অসন্মান করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে, অসন্মান করা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার শরীর সত্যিকার আরো গুরুতরভাবে খারাপ হয়েছে, উনার বেঁচে থাকার ব্যাপারে সবাই এখন আশঙ্কা করছে সেকথা আমি একশ বার বলব, এটার কোনো যুক্তি নাই যে, বিরোধী দলের নেত্রী, তিনবার উনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উনার অসুখ হওয়ার পরে উনাকে অবশ্যই মুক্ত করা হবে না, উনি চিকিৎসা পাবেন না-এটা কল্পনাই করা যায় না। এটা আমাদের সভ্য ও আমাদের সংবিধানের দাবি। আমি এই দাবির প্রতি সমর্থন করি।
এর আগে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান আবরার হত্যার প্রতিবাদে আগামী ১৮ অক্টোবর ঢাকায় উন্মুক্ত স্থানে বৃহ আকারে শোকসভার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমরা ১৮ তারিখে ঢাকায় মহানগরের প্রকাশ্য কোনো জায়গায় আবরারের মৃত্যুতে জাতীয় শোকসভা করবো। এটা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে হতে পারে, এটা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হতে পারে। আমরা সভার জন্য অনুমতি চাইব। আমরা সভা করতে চাই। আপনারা নিজেদের যা যা মাধ্যম আছে- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছে, ঢাকা মহানগরের কোটি কোটি মানুষ আছে তাদের প্রত্যেকের কাছে খবর দিতে হবে ১৮ তারিখে ঢাকা মহানগরে জাতীয় শোকসভা হবে। এটাই আমাদের প্রধান কর্মসূচি।
প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার পরিচালনায় সমাবেশে গণস্বাস্থ্য সংস্থার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, শ্যামা ওবায়েদ, কাজী আবুল বাশার, নবী উল্লাহ নবী, গণফোরামের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, মোশতাক হোসেন, জেএসডির তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের এসএম আকরাম, বিকল্পধারার অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী প্রমূখ নেতারা বক্তব্য রাখেন। এরপর ড. কামালের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা কালো পতাকা হাতে শোক মিছিল বের করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ