শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

অপরাধ-দুর্নীতির মহামারী

দেশে এখন অপরাধ দুর্নীতি দুষ্কর্মের মহামারী চলছে। সমাজ জীবনের কোনো অংশই এ থেকে মুক্ত নয়। অপরাধের যে বিচার করবে সেই বিচারবিভাগ, যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবে সেই পুলিশবিভাগ, যারা দেশে সুশাসন সুকৃতি প্রতিষ্ঠা করবে সেই আমলাতন্ত্র, যারা উন্নতি অগ্রগতির অবকাঠামো তৈরি করবে সেই নির্মাণবিভাগ, যে প্রতিষ্ঠান দেশে সুশিক্ষার বিস্তার ঘটাবে সুনাগরিক তৈরি করবে সেই শিক্ষাবিভাগ-সবই আজ দুর্নীতির করাল গ্রাসে। কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন করছে। ইতিমধ্যে একজন ভিসি পদত্যাগ করেছেন। পরীক্ষা পরিচালনা থেকে শুরু করে শিক্ষাবিভাগের সকল পর্যায় দুর্নীতির রাহুগ্রাসে। দেশের নির্মাণ কার্যক্রম অবৈধ কমিশন ও চাঁদাবাজির কবলে নিমজ্জিত। উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ টাকার অধিকাংশই উন্নয়নের কাজে আসে না। দেশের একজন প্রধান বিচারপতি একসময় বলেছিলেন উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৬০ ভাগ অর্থ লোপাট হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সরকারি বিভিন্ন অফিসে ঘুষ দুর্নীতির যে চিত্র তুলে ধরে তা ভয়াবহ। সাম্প্রতিককালে  শিশু ধর্ষণ ও ভয়ংকর ধরনের অপরাধ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আত্মসাতের বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যখন অপরাধীরা কোনো ভয়ভীতির তোয়াক্কা করছে না। একশ টাকার জিনিসকে লাখ টাকার অংকে নিয়ে যেতে তাদের বাধছে না। বালিশ কাহিনী, পর্দা কাহিনীর বিষয়টা আজ সকলেরই জানা। চোখের সামনে রংপুর মেডিকেল কলেজের একটা নিউজ দেখা যাচ্ছে তাতে আত্মসাতের এক ভয়ানক ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে। ২০ লাখ টাকার মেশিন ১ কোটি টাকা, সোয়া লাখ টাকার মেশিন পোনে চার লাখ টাকা, ৩৫ লাখ টাকার মেশিন ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ইত্যাদি অবিশ্বাস্য সব আত্মসাতের ফিরিস্তি সেখানে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের আত্মসাতের বিষয় সংবাদপত্রে আজ সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ আত্মসাৎ ইত্যাদি ভয়ংকর সব অপরাধের বিস্তার বলা যায় প্রকাশ একটা কালচারে পরিণত হয়েছে।
একটা দেশ একটা জাতি একটা সমাজের জন্য এই অবস্থা ভয়ংকর ও নৈরাজ্যকর। এই অবস্থা প্রতিরোধ করা, বাধাবন্ধনহীন অপরাধ আত্মসাতের মুখে লাগাম লাগানোর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব সরকারের। সরকারকেই অপরাধ আত্মসাতের সয়লাব রোধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে হবে এবং জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে তাদেরও সহায়তা নিতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অপরাধ ও অপরাধীদের দমনের বিষয়টিকে অধিকাংশক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি ঘটা ক্যাসিনো কান্ড একটা বড় বিষয়। স্পোর্টস ক্লাবের ব্যানারে চলা জুয়া খেলার আড্ডায় ক্যাসিনো ধরা পড়েছে। এর সাথে জড়িত দেখা যাচ্ছে সরকারি ঘরানার নিম্ন পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী যারা ক্যাসিনো কান্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। একজনের বাড়িতেই ২০০ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। উচিত ছিল সরকার এদের অপরাধকে অপরাধ হিসাবে ধরে অপরাধের মূলোচ্ছেদে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সরকার ক্যাসিনো ব্যবসায় বিএনপির আমলে শুরু হয়েছে বলে এ সরকারের দায় হালকা করতে চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির তারেক রহমান লন্ডনে ক্যাসিনো থেকে কত আয় করেন এসব কথা বলে সরকার এখানকার অপরাধীদের থেকে দৃষ্টি সরাতে চেয়েছেন। আসলে আমাদের এ মানসিকতাই অপরাধ বিস্তারের নিমিত্ত হিসাবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অপরাধকে আড়াল করা হয়েছে, তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হলেও মামলা ঠিকমত চলেনি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাজা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা ক্ষমার আওতায় পড়েছে। আপরাধ দুর্নীতি আজ মহামারী হয়ে দাঁড়ানোর মূলে আমাদের এ রাজনৈতিক মানসিকতাই প্রধান কারণ হিসাবে কাজ করেছে। দুঃখের বিষয় হলো দুর্বল বা নতুন গণতন্ত্রের উন্নয়নশীল দেশগুলোর এটাই সাধারণ দৃশ্য।  কোনো দেশে বেশি কোনো দেশে কম। কিন্তু এ ধরনের দেশগুলোতে দলীয় দৃষ্টিকোণই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করছে। আমাদের স্বাধীনতার বয়স বেশি নয় কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য  এবং গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের ভালোবাসা অনেক পুরানো। গণতন্ত্র চর্চার অভিজ্ঞতাও আমাদের রাজনীতিকদের রয়েছে। অতএব আমাদের রাজনীতিকগণ চাইলে জনগণের সহযোগিতা নিয়ে দুর্নীতি ও অপরাধের মহামারী থেকে বেরিয়ে আসতে  পারেন। আমরা সেই আশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ