শুক্রবার ২৭ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

৯ বছরে বেসরকারি খাতে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি

এইচ এম আকতার: ধারাবাহিকভাবে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। চলতি বছরের আগস্ট মাস শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যা জুলাইতে ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ জানুয়ারিতে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। এ হার ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন। ওই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। এতে করে বেকারত্ব বাড়ছেই। এর ফলে আইনশৃংখলার অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক খাতের নানা কেলেঙ্কারি ও সঞ্চয়পত্রে সুদ বেশি হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী আমানত পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোতে চলছে তারল্য সংকট। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আবার উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নিতে আগ্রহী নন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। গত কয়েক মাসে আমদানিও কমেছে। এসব কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ কমে গেছে।

জানা গেছে, সরকার সারা বিশে^ প্রচার করে চলছে দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ রয়েছে। বিদেশিদের বিনিয়োগে নানা সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। দেশে একাধিক অর্থনৈতিক জোন করছে সরকার। এ সব অঞ্চলে বিনিযোগে নানা সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। তার পরেও দেশে বিনিয়োগ কম হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি বেসরকারি খাতের ঋণ হু হু করে বাড়ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। ফলে ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালের শুরুতেই ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপর থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। এরপর কয়েক দফা এডিআর সমন্বয়ের সীমা বাড়ানো হলেও নানা কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। নিম্নমুখীর ধারা অব্যাহত আছে। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এডিআর হার বাড়িয়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই আগামীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের (২০১৯) আগস্টে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর আগে জুলাই শেষে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। তার আগের মাস জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মে মাসে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ, এপ্রিলে ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ, মার্চে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট রয়েছে। তারা আমানত পাচ্ছে না। যার কারণে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে না। এ ছাড়া যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারাও ঋণ দেয়া ক্ষেত্রে খুব যাচাই-বাছাই করছে। সবমিলিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ কমে গেছে।

তিনি বলেন, এভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ ধারাবাহিক কমতে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ পর্যায়ে চলে যাবে। কারণ, বিনিয়োগ না বাড়লে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে উন্নয়ন হবে না। তাই যেকোনো মূল্যে সরকারকে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন,বিনিয়োগ না হলে দেশে বেকারতের পরিমাণ বেড়ে যাবে। আর বেকারত্ব বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে। আর বেকারত্ব বাড়লে আইনশৃংখলার অবনতি হবে। যুব সমাজ যদি বেকার হয়ে পড়ে তারা আয়ের জন্য বিকল্প পথ খুঁজবে। যা রাষ্ট্রের জন্য কোনভাবেই কল্যাণকর হবে না।

এদিকে আগস্ট মাস শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় শেষে ঋণ ছিল ৯ লাখ ১০ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে ঋণ বেড়েছে ৯৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এর আগে জুলাই মাসে ঋণস্থিতি ছিল ১০ লাখ ২ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু এর বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এর আগে প্রথমার্ধে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও অর্জিত হয় মাত্র ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এ মুদ্রানীতিকে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি সহায়ক ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি বলছেন গর্বনর ফজলে কবির। নতুন মুদ্রানীতিতে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত লক্ষ্য ঠিক করেছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা গেল অর্থবছরের জুন পর্যন্ত লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রক্ষেপণ ছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। কিন্তু গত জুন শেষে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এটি গত অর্থবছরের ঘোষিত মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কম। এখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে।

 বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমার কারণ হিসেবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা আশঙ্কার পাশাপাশি দেশের ভেতরে নানা অনিশ্চয়তা রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। অবকাঠামোগত সমস্যা এখনও দূর হয়নি। এসব কারণে বিনিয়োগ কমেছে। তাই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১০ লাখ ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। গত এক বছরে (২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন) পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত বেড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৯ মাসে বাড়ে ৬০ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। আর শেষ ৩ মাসে বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। তবে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণের গতি নেই।

তথ্যমতে, ব্যাংকাররা বলছেন, দেশব্যাপী বড় বড় সরকারি প্রকল্পগুলোর কাজ চলায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এতে করে ব্যাংক তারল্য সংকট অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ২০ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর সিংহভাগই নিয়েছে তফসিলি ব্যাংক থেকে। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংক থেকে সরকার ধার করেছিল ২৬ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন অর্থবছরের ৩ মাস না যেতেই আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

সরকারের অর্থমন্ত্রী বলছেন,২০৩০ সালে বাংলাদেশে আর কোন দরিদ্র খুজে পাওয়া যাবে না। প্রতি ঘরে ঘরেই চাকুরি পাবে। ভিক্ষা দেয়ার মত কোন ভিক্ষুকও পাবে না কেউ। দেশে প্রতিটি কাজে মূল্য বাড়বে। একজন চাকুরি করলে পরিবারের সবাইকে নিয়েই চলতে পারবে। এতো সব কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে তার সিংহভাগই হবে বেসরকারি খাত থেকেই। 

 অথচ ২০১৯-২০ অর্থ বছরেই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ পাচ্ছে না। একটি বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হলে দশ বছর শুধু কারখানা নির্মাণে সময় লাগে। তার পরে সেখানে উৎপাদনে যেতে পারে। আর মদ্য মেয়াদী হলেও কারখানা নির্মাণে ব্যয় লাগে ৩/৫ বছর। তার আগে কেউ উৎপাদনে যেতে পারে না। সে হিসেবে এ বছরই বেসরকারি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু না হলে উল্টো গতিতে এগুচ্ছে সরকার।

সরকারের যুক্তি উল্টো। তারা বলছেন,সরকারের যেসব মেগা প্রকল্প রয়েছে তা শেষ হতে আরও পাঁচ বছর সময় লাগবে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বড় ধরনের কর্মসংস্থান হবে। এতে করে আর কেউ বেকার থাকবে না। সরকার বলছে,বেসরকারি খাতেও বড় ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে। বড় বড় গ্রুপ কোম্পানিগুলোকে অর্থনৈতিক জোন দেয়া হয়েছে। তারাও বড় ধরনের বিনিয়োগে উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। এতে করে বেকারের সংখ্যা কমে আসবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ