সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

দাদির হাতের পিঠা 

জিনিয়াস মাহমুদ : লতা। পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। থাকে ঢাকায় বাবা-মা’র সাথে। তার দাদা-দাদি থাকেন গ্রামে। বাবার অফিস যখন বন্ধ থাকে বা লতার স্কুল যখন বন্ধ থাকে তখনই সে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়া ঈদ বাদে গ্রামে খুব কমই যাওয়া হয়। লতা আজ স্কুল থেকে বাসায় ফিরে কারো সাথে কোনো কথা না বলে চুপচাপ জানালার গ্রিল ধরে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। বরাবর সে স্কুল থেকে বাসায় এসেই হইচই শুরু করে দিতো। খেলা করতো ছোটভাই মুহিবের সাথে। আজ হঠাৎ লতার এমন নিরবতা দেখে তার মা নিশিতা আক্তার ছেলে মুহিবকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন-লতা মামণি! কী হয়েছে মা তোমার? আজ একেবারে চুপচাপ যে। মন খারাপ? স্যারে কিছু বলেছে মা? লতা কোনো কথা বলে না। মা চলে যান পাশের রুমে।

কিছুক্ষণ পর লতার বাবা সাইফ আকন্দ অফিস থেকে বাসায় ফিরেন। লতা তার বাবাকে দেখে একদৌড়ে বাবার কোলে ওঠে পড়ে। তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে- আচ্ছা বাবা, তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো? লতার এমন প্রশ্নে তার বাবা একটা মুসকি হাসি দিয়ে বলেন- তোমাকে আমি অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি মামণি। তুমি হলে আমার মা। আমার কলিজার টুকরা। আমার নিঃশ্বাস। আমার চোখের মণি। এবার তুমি বুঝে নাও যে, তোমাকে আমি কতটুকু ভালোবাসি। লতা মাথা নাড়া দিয়ে বলে- হু, বাসো। তবে...

-তবে কী মামণি?

-তুমি যদি আমাকে সত্যি অনেক অনেক অনেক ভালোবাসো তাহলে তোমাকে আমার একটা আবদার রাখতে হবে। বলো রাখবে?

-একটা কেন, তোমার সব আবদার আমি রাখব মা। এবার বলো যে, তোমার সেই আবদারটা কী?

-বাবা, আমি গ্রামে যাব। দাদা-দাদির কাছে। বলো না তুমি আমাকে নিয়ে যাবে? বলো না বাবা।

-অবশ্যই নিয়ে যাবো মা। আমারও কদিন ধরে তোমার দাদা-দাদিকে দেখতে মনটা কেমন যেন ছটফট করছে। কিন্তু অফিসের ব্যস্ততার জন্য আর যেতে পারছি না। আজ আমার মামণি যখন বলছে তখন তো আর না গিয়ে থাকতে পারছি না। আমি কালই তোমাকে গ্রামে নিয়ে যাবো তোমার দাদা-দাদির কাছে।

লতা একগাল হাসি দিয়ে বলে- সত্যি বলছো বাবা?

-একশবার সত্যি। তবে তার আগে আমাকে একটা কথা বলো তো মামণি, তুমি হঠাৎ করে গ্রামে যেতে চাচ্ছো কেন?

-এখন তোমাকে বলব না বাবা। গ্রামে দাদা-দাদির কাছে গিয়ে তারপরে বলবো।

-মেনে নিলাম। তবে গ্রামে গিয়ে বলবে তো? 

-অবশ্যই অবশ্যই বলব। এই বলে লতা তার বাবার দু'গালে চুমো দেয়। বাবাও তার কপালে চুমো দেয়। তারপর দুজনেই একসাথে হেসে ওঠে।

পরেরদিন লতা গ্রামে যাওয়ার জন্য তাদের জামা-কাপড় গোছাচ্ছে। সাথে বাবাও। এমন সময় লতার মা এসে বাঁধা দিয়ে বলেন- এখন গ্রামে যাওয়া যাবে না। তোমার স্কুল খোলা। যখন স্কুল বন্ধ দিবে তখন না হয় আমরা সবাই একসাথে গ্রামে গিয়ে বেড়িয়ে আসব। লতা তার মায়ের কথায় কান না দিয়ে সে তার মতো করে জামা-কাপড়সহ যা যা সাথে নিবে তা গোছাতেই ব্যস্ত থাকে। সে জানে যে, বাবা যখন একবার বলেছে তাকে গ্রামে নিয়ে যাবে তখন আর কোনো বাধা নেই। লতার অভিযোগ- তার মা তাকে এখন আর আগের মতো আদর করেন না। আগের মতো ভালোবাসেন না। খাইয়ে দেন না। গোসল করিয়ে দেন না। ঠিক যখন থেকে তার ছোটভাই মুহিবের জন্ম হয়। মা নাকি সারাক্ষণ মুহিবকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এসব কথা সে তার বাবাকে রোজই বলে। সে আরো বলে যে, তার বাবা তাকে সবচে বেশি আদর করেন। ভালোবাসেন। বাবার কাছে সে যা চায় বাবা তাকে তাই এনে দেন। বাবা তাকে নিজহাতে প্রতিদিন খাইয়ে দেন। গোসল করিয়ে দেন। প্রতিদিন স্কুলের ড্রেস পরিয়ে দেন। আরো কত কী। কিন্তু মা সব সময় ব্যস্ত থাকেন মুহিবকে নিয়ে। তার কোনো কথাই রাখেন না। লতার মা যখন লতাকে গ্রামে যেতে না করছেন তখন লতার বাবা বলে ওঠেন- শুনো নিশিতা, লতাকে যখন আমি কথা দিয়েছি গ্রামে নিয়ে যাবো, তখন যাবোই এবং আজই। তোমার কোনো কথাই আর আজ আমরা কানে নিচ্ছি না। আমি বুঝে গেছি, তুমি এখন আর আমার মামণিটাকে একটুও ভালোবাসো না। তুমি ভালোবাসো তোমার ছেলেকে। লতার বাবা লতার দিকে তাকিয়ে বলেন- কি ঠিক বলেছি না লতা মামণি? লতা ডানহাতের আঙুল নাড়িয়ে বলে- একদম ঠিক বলেছো বাবা। মা এখন আর আমাকে একদম আদর করে না। ভালোবাসে না। লতার মা লতার কথা শুনে মিটমিট করে হাসেন। লতার বাবা আবারো বলেন- তুমি যেমন তোমার ছেলেকে আদর করো। ভালোবাসো। ঠিক তেমনি আমিও আমার মেয়েকে আদর করি। ভালোবাসি। তুমি থাকো তোমার ছেলেকে নিয়ে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে গেলাম। অবশ্য তুমি চাইলে আমাদের সাথে যেতে পারো। যাবে? বাবার সাথে লতাও সুর মিলিয়ে বলে ওঠে-যাবে তুমি মা? গেলে অবশ্য আমাদের সাথে যেতে পারো। আমরা না করবো না। লতার মা ছেলেকে কোলে করে পাশের রুমে যেতে যেতে বলেন- তোমরা বাপ-বেটি যাও। আমি এখন যাবো না। মুহিব যখন হাঁটতে শিখবে তখন যাবো। এই বলে তিনি পাশের রুমে চলে যান। লতা তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে- হ্যা, হ্যা তুমি পরেই যেয়ো। এখন আমরা গ্রাম থেকে বেড়িয়ে আসি। এ কথা বলে লতা তার বাবার দিকে তাকায়। পরে বাপ-বেটি একসাথে হেসে ওঠে।

কিছুক্ষণ পরই লতা তার বাবার সাথে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুপুরের পরপরই তারা গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। লতার দাদা-দাদি লতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। লতাকে কাছে পেয়ে দাদা-দাদির যেন আনন্দের সীমা নেই। লতার দাদা বিকালবেলা লতাকে পুরোগ্রাম ঘুরে দেখান। লতা তার দাদার কাছে নানারকম প্রশ্ন করে আর দাদা তার জবাব দেন। কখনো পাখি দেখে বলে-এই পাখিটার নাম কী। কখনো ফুল দেখে বলে- এই ফুলের নাম কী। গাছপালা ফলমূল আরো কত কী। দাদা একএক করে সব বলেন। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়। রাতে সবাই একসাথে খেতে বসেন। লতার দাদি লতাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেন। মাঝে মাঝে তার দাদাও তাকে খাইয়ে দেন। নাতনির প্রতি এমন ভালোবাসা দেখে লতার বাবা সাইফ আকন্দের আনন্দে যেন দু’চোখ ছলছল করে ওঠে। খাওয়া শেষে লতা তার দাদা-দাদির সাথে শুয়ে পড়ে। আর তার বাবা শোন পাশের রুমে। লতার দাদা শুয়ে শুয়ে নানারকম গল্প বলতে থাকেন। লতা তা গভীর ধ্যানে শুনে। গল্প শুনতে শুনতে একসময় লতা ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল হলো। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর পিঠার মিষ্টিঘ্রাণ নাকে আসতেই ঘুম ভেঙে যায় লতার। সে উঠে একদৌড়ে চলে যায় রান্নাঘরে। গিয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরে। মুখে মিষ্টিহাসি। লতার হাসি দেখে দাদিও হাসেন। দাদি একটা পিঁড়ি টেনে লতাকে তাতে বসতে বলে। লতা বসে। বসে বসে দাদি কীভাবে পিঠা বানাচ্ছেন তা দেখে। তার মনে যেন আজ আনন্দের জোয়ার বইছে। সে আজ তার দাদির হাতে বানানো গরম গরম পিঠা খাবে। কিছুক্ষণ পর লতার দাদা আর তার বাবাও বিছানা থেকে ওঠে পড়েন। লতা তার দাদার সাথে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসে। এরই মাঝে দাদির পিঠা বানানোও শেষ হয়। দাদি রান্নাঘরের মেঝেতে একটা পাটি বিছিয়ে দেন। লতার দাদা আর বাবা তাতে বসেন। লতা বসে তার দাদির কোলে। দাদি স্টিলের একটা বড় বাটিতে বাটিভর্তি গরম গরম তালপিঠা আর তালবড়া তাদের সামনে রাখেন। লতা বাটি থেকে একটি তালপিঠা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করে। তারপর একএক করে সবাই। লতা পিঠা খেতে খেতে বলতে থাকে- আহ! কী স্বাদ! আজ আমি অনেক পিঠা খাব। এখানে আমি যতদিন থাকব প্রতিদিন শুধু পিঠা আর পিঠা খাব। দাদির হাতের পিঠা অনেক অনেক মজা! লতার বাবা লতার দিকে তাকিয়ে বলেন- হ্যা। তুমি ঠিক বলেছো লতা। তোমার দাদির হাতের পিঠা অনেক মজা! আজ কতদিন পরে তোমার দাদির হাতের পিঠা খাচ্ছি। তুমি আসতে না চাইলে তো এখন আসাই হতো না। খাওয়াও হতো না আর এমন মজার পিঠা। এরই মাঝে লতার দাদি বলে ওঠেন-তোমরা এখানে যতদিন থাকবে প্রতিদিনই আমি তোমাদের জন্য পিঠা বানাবো। যত খুশি খাবে। মনভরে খাবে। আগামীকাল তোমাদের জন্য অন্যরকম স্বাদের আরেকটা পিঠা বানাবো। আর তা হলো কলাপাতার তালপিঠা। খেলেই বুঝতে পারবে কেমন মজা! লতা এবার কী মজা! কী মজা! বলে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে।

লতার বাবা এবার বলে ওঠেন- মামণি, এবার বলো তো, ওইদিন হঠাৎ করে গ্রামে তোমার দাদা-দাদির কাছে আসার জন্য এতোটা অস্থির হয়েছিলে কেন? তুমি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিলে এখানে এসে সব বলবে। মনে আছে তো?

লতা বলে-হ্যা, বাবা। মনে আছে। তাহলে শোনো- ওইদিন আমাদের স্কুলের শারমিনা মেডাম ক্লাসে এসে বলেছিলেন-‘প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। আর এই শরৎকালে গাছে গাছে তাল পাকে। পাকা তাল দিয়ে পিঠা বানানো যায়। যাকে আমরা তালপিঠা বলি। খেতে খুব মজা! আর এই তালপিঠা গ্রামে গেলে খাওয়া যায়।  শহরে তো তালগাছ নেই। তাই শহরে তালপিঠা খুব একটা দেখা যায় না!’- মেডামের মুখে তালপিঠার কথা শুনে তখনই আমার দাদির কথা মনে পড়ে। আর দাদির হাতের মজার এই তালপিঠা খেতে সাধ জাগে। তাই আমি তোমাকে বলেছিলাম আমাকে এখানে নিয়ে আসতে। যাতে করে মনভরে পিঠা খেতে পারি। আচ্ছা বাবা, এবার তুমিই বলো- যদি আমরা দাদা-দাদির কাছে না আসতাম তাহলে কি এমন মজার মজার পিঠা খেতে পারতাম? পারতাম না।

লতার বাবা মুখে পিঠা দিতে দিতে বলেন- ও... তাহলে এই কথা!

-হ্যা, বাবা। এই কথা। এই বলে লতা বাটি থেকে আরেকটি পিঠা হাতে নেয়। তারপর তা খেতে খেতে সুরে সুরে গাইতে থাকে-

দাদির হাতের পিঠা-খেতে ভারি মিঠা!

খেতে ভারি মিঠা! - দাদির হাতের পিঠা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ