শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অনন্য উচ্চতায় নজরুল সঙ্গীত

শফি চাকলাদার : (গত সংখ্যার পর) এ প্রবন্ধের সুর-ধারা লক্ষ্য রেখে উদাহরণ টেনে বলতে চাই- সুবিখ্যাত গজল শিল্পী মেহদি হাসান তাঁর সুবিখ্যাত গজল ‘রনজিস হি সহি’ পাঁচ মিনিটের এই গানকে প্রায় পঁচিশ মিনিটোর্ধ্ব সময় ধরে অসংখ্য কণ্ঠ-শৈলী কারুকাজে পরিবেশন করেছেন। বর্তমান প্রযুক্তির সুযোগে নয় গজল-ঠুমরী গান এমনিতেই এত সময় নিয়ে পরিবেশিত হয়ে আসছে- যা নজরুল ঐ অঞ্চলে যখন ছিলেন তখন কবি হাফিজ-ওমর খৈয়ামকে আত্মস্থ করতে যেয়ে গজল-ঠুমরী-খ্যায়াল-এর বৈঠকী ঘরোয়া পরিবেশন লক্ষ্য করেছেন। লেটো দলের সঙ্গে থাকার সময়ও নজরুলের গানের ধরণটা বৈচিত্রপূর্ণই ছিল এবং পরবর্তীতে নজরুল তাঁর সঙ্গীতে গায়কী’র প্রবর্তন করেন। তাই নজরুলের গানেই একটি গানকে তিন মিনিট থেকে শুরু করে পঁচিশ মিনিটোর্ধ সময় ধরে পরিবেশন করার সুযোগ রয়েছে। বৈচিত্রীয় অলঙ্কৃত করার বিস্তর সুযোগ এখানে রয়েছে- অবশ্যই যা কখনোই ‘অশিক্ষিত’ টিউনিং ধারাতে নয়- নজরুলের তা পছন্দও নয়। অলঙ্কৃত করার সুযোগ থাকা এই নয় যে গানকে মূল সুরের অলিম্পন থেকে সরে যেতে হবে। শিল্পী যদি মেহেদী হাসান হয় কিম্বা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় হয় কিম্বা পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মত ট্যালেন্টেড হয় তো একটি নজরুল সঙ্গীত পঁচিশ মিনিট ধরে গাইলেও তা কখনো বোরিং বা একঘেয়েমি শ্রুতিকে আঘাত করবে না। বরং গানটি আরো কিছুক্ষণ হল না কেন শ্রুতি তাই জানতে চাইবে। এতসব আয়োজন-অলঙ্কার নজরুল তার সঙ্গীতে রেখেছেন বলেই আজ ভবিষ্যত পথরেখায় বাংলা গান নজরুল-সঙ্গীতের পথ-ধরে নতুন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলবে। যা অন্য কোন নায়কী-নির্ভর সঙ্গীত দ্বারা হবার নয়। কারণ সঙ্গীত হচ্ছে সুরের ভান্ডার। সুর নিয়ে খেলা যা ওতে নেই। নায়কী-নির্ভর কোন গানই তো বেশিক্ষণ ধরে গাইবার নয়। কারণ শ্রুতিকে ধরে রাখার মত ভান্ডার তার নেই। তাকে যেভাবেই উপস্থাপনায় আনা হোক না কেন? নায়কী সঙ্গীতের সুর পরিবর্তনীয় নয়। শুধু ব্যক্তি স্বাতন্ত্রতে যে ব্যবধান, সুর-প্রকাশ একই থাকবে। আর নজরুল যা প্রবর্তন করলেন তা এ অঞ্চলের সুর- রস লোকের মধ্যে ধারণাতেই ছিল না- আর তা হচ্ছে গায়কী যেখানে যুক্ত থাকবে বৈঠকীর আমেজ আর শিল্পী-স্বাধীনতার ঁেছায়া-। তাই নজরুল সঙ্গীত গাইতে যে রকম কণ্ঠ স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে কিম্বা সকল ধরনের গান কণ্ঠে শোনা যায় যা রবীন্দ্র অতুল এমনকি দ্বিজেন্দ্র-রজনীতে হয়ে ওঠে না। ওদের গানের সাথে ‘নাসিকা’ ব্যবহার একটি অন্তরায়। সুর অলঙ্করণ তাই অনায়াসে বাধা-প্রাপ্ত হয়। আবার নজরুলের গানে যে ‘আদি’ শব্দটি নজরুল-ইনস্টিটিউট থেকে ধার্য করে এ গানের বিশালত্বকে বাধাপ্রাপ্ত করছে তাও মেনে নেয়া যায় না। বিশাল-সুর-সৃষ্টির কারখানা বা ইন্ডাস্ট্রিকে সীমিত তান দ্বারা নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্ভব নয়। এটাও মনে রাখা দরকার বিশ-ত্রিশ-চল্লিশের দশকে রেকর্ড পদ্ধতিতে যেভাবে সঙ্গীত রেকর্ডবদ্ধ হত কিম্বা শিল্পীদের কণ্ঠ-থ্রোতে যে আলাদা বৈশিষ্ট ছিল তেমনটা তো সে সময়তে ছিল। যেমন মৃনাল কান্তি ঘোষের “আমি ক’ল ছেড়ে চলিলাম ভেসে’- গানটির কিছু কিছু স্থানে শিল্পী তার নিজস্ব কণ্ঠ শৈলীতে যা ফুটিয়ে তুলেছেন- ‘আদি’ শব্দ সেখানে বর্তমানের জন্য কি বলবে। এমন তো নজরুলের যে সময়ে রেকর্ডকৃত প্রায় গানেই রয়েছে। তাই ‘আদি’ যদি স্বরলিপি হয় সেত স্কেলিটন মত। সেই স্বরলিপি অনুসরণকে কি ‘আদি’ বলা হচ্ছে? তাই যদি হবে তবে স্বরলিপি বলাটাই তো যথেষ্ঠ। ‘আদি’ ব্যবহার করে নতুন অন্তরায় সৃষ্টি করা নজরুল সঙ্গীতের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তেমনি রবীন্দ্র সঙ্গীতের মুসলমান শিল্পীদের ইসলামী অনুষ্ঠান-হামদ-নাত একযোগে বর্জন করার মধ্যে কি মঙ্গল লুকিয়ে আছে তা সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবে। কিছু কিছু শিল্পী নজরুল-সঙ্গীতের রয়েছেন যারা মাঝে মধ্যেই গান শুরু করার পূর্বে ‘শুদ্ধ’ এবং ‘আদি’ শব্দগুলোর ‘কেন’র ব্যাখ্যায় কথা বলেন, এতে করে নজরুল সঙ্গীত শ্রোতা-দর্শকরা বিভ্রান্তিতে পড়েন এবচং পরেছেনও, এতে ক্ষতি হচ্ছে কার? যারা এমন কথা তোলেন তাদের মস্তিষ্কে কি এতটুকু সুবুদ্ধি কাজ করে না যে, এই বিভ্রান্তিমূলক শব্দ দুটির উচ্চারণে সমগ্র নজরুল-সঙ্গীতের কতটা ক্ষতি হচ্ছে? 

এখানে রবীন্দ্রনাথের ‘সঙ্গীত-চিন্তা’ গ্রন্থ থেকে তিনটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি ছিল, ‘আগে যেখানে সঙ্গীত ছিল রাজা, এখন সেখানে গান হইয়াছে সর্দার’- আর এ সময়ের সঙ্গীত রাজ্যটা রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, নিধুবাবু, দ্বিজেন্দ্রলালদের দখলে ছিল। তবে এই ১৯১৭-এর আগেই যদিও রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল পরলোকগমন করেন তথাপি তাদের রেশ তখনও প্রবাহমান ছিল। অথচ রবীন্দ্রনাথের আফসোস ধ্বনিত হলো কেন? কেন রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করলেন ১৯১৭ সালে, ‘একদিক থেকে দেখিলে মনে হয় যেন গানের আদব এ দেশ হইতে চলিয়া গেছে। ছেলেবেলায় কলিকাতায় গাহিয়ে-বাজিয়ের ভিড় দেখিয়াছে; এখন একটি খুঁজিয়া মেলা ভার, ওস্তাদ যদি-বা জোটে শ্রোতা জোটোনো আরো কঠিন।’ এর থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথের সময়টা ছিল ‘মধ্য-গগনে সূর্যের মতথ। মাত্র চার বছর পূর্বে নোবেল বিজয়ী হলেন, তাও গীতি কবিতার ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র মাধ্যমে। এরপরও রবীন্দ্রনাথেরই ঐ আফসোস উক্তির মাধ্যমে সে সময়ের সঙ্গীত রাজ্যের দুর্দশার অবস্থা ফুটে উঠেছে। কিন্তু ১৯৩৫-০এ এসে রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করতে বাধ্য হলেন এবং উক্তি করলেন, ‘বাঙালির প্রকৃতি আজ আবার আপন গানের আসর খুঁজে বেড়াচ্ছে, সুরের উপাদান সংগ্রহ করতে সৃষ্টি করছে।’ তাই রবীন্দ্রনাথের উক্তির মাধ্যমে সত্য কথা চলে এসেছে, ঐ ২০৩০ এর দশকে নজরুলের গান-অবস্থান ছিল মধ্য গগনে। ১৯৪০-এও একই অবস্থা। আর ১৯৫০ থেকে ৬০ দশকটি ছিল ‘নজরুল’কে ভুলে যাওয়ার দশকের, যা অব্যাহত ছিল এবং আছে। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় তার অসাধারণ কণ্ঠশৈলী দিয়ে নতুন করে ‘নজরুল’কে সামনে নিয়ে এলেন। ফিরোজা বেগমের নাম উচ্চারণ না করলে সত্যকে স্বীকার করা হবে না। 

প্রায় লক্ষ্য করে থাকি যে, নজরুলকে অবহেলা করা এক নিত্তনৈমিত্তিক কাজ। নজরুলকে মূল্যায়ন করাও যেন সঠিক হয় না। সেই চিরাচরিত কিছু কথা সাজিয়ে বিষয় সাজিয়ে অনুষ্ঠান করা।  একই মুখ, তাই নতুন কিছুও বলা হয় না। ‘নজরুল’ তাই সীমিত গ-ির মাঝেই বসবাস করে থাকে, ‘মহাসমুদ্র’ হওয়া সত্ত্বেও তার প্রকাশ হয় না। নতুন নতুন বিভ্রান্তিকর তথ্যও বলা হয়। প্রতিবাদের স্থান কম হওয়াতে সেগুলোই প্রচলিত হয়ে পরে। এসবে ‘নজরুল’ ঠকছে না, ঠকছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। আজ অবধি নজরুলের জীবনী গ্রন্থও রচিত হলো না। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের ‘জি-চ্যানেল’ এদেশে দেখা হয়। সেখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, দিনে অন্তত একাধিকবার প্রচার করা হয়ে থাকে বিশ^ভারতীতে একটি বিল্ডিং বাংলাদেশী টাকায় নির্মাণ করা হয় এবং সে বিল্ডিংয়ের উদ্বোধনও করেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। উদ্বোধনকালে যে বক্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাখেন তার অংশ বারংবার প্রচারিত হয়ে চলেছে। এর কিছু মাস পূর্বে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজী নজরুল কলেজেরও গিয়েছিলেন অনারারী ডক্টরেট গ্রহণ করতে। সেখানেও তিনি ‘নজরুল’ নিয়ে বক্তব্য রাখেন কিন্তু সেই বক্তব্যটি জি-চ্যানেল কখনোই প্রচার করেনি, যেটা ‘রবীন্দ্রনাথের বেলায় হচ্ছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈষম্য না হওয়াটা সবাই চায় কিন্তু এরকম হলে বৈষম্য দূর হবে কি? বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতেও নজরুলের কিছু গান বাজানো আর জন্ম-মৃত্যুদিনের কিছু ‘পাইকারী’ অনুষ্ঠান ছাড়া ‘নজরুল-স্মরণ’ অবহেলিত। অর্থাৎ ‘নজরুল’ কিছু হলেও আছে। কিন্তু জি-চ্যানেল যা করছে তাতে মনে হয় ওরা ‘নজরুল’ নামটাই ভুলিয়ে দিতে হারিয়ে ফেলতে একদম বদ্ধপরিকর। সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিতকরণ প্রোগ্রাম-এ এমন কার্যক্রম কখনোই গ্রহণযোগ্য হবার নয়।  (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ