শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান  একজন সু-লেখকের নাম

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রী প্রাপ্ত এক সুলেখকের নাম মুহম্মদ মতিউর রহমান। ১৯৬২ সালে ডিগ্রী লাভের পর আজ অবধি- তাঁর লিখনীর প্রয়াস কখনো ক্ষান্ত হয়নি। দীর্ঘ কাল ধরে সাহিত্যের নানা শাখা বিশেষ করে মননশীল প্রবন্ধ রচনায় তার নিরন্তর কুশলীকর্ম অব্যাহত গতিতে চলে আসছে। 

পেশা বদলে গেলেও সাহিত্যের অদম্য নেশা তাকে দুহাতে লিখতে কোন বিরুদ্ধ পরিস্থিতি কখনো পিছু টানতে অথবা বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়নি।

লেখালেখির জগতে অনেককেই দেখা যায় প্রথম জীবনে প্রচন্ডভাবে লেখালেখির কর্মে লেগে থাকেন।  কিন্তু পেশার পরিবর্তন ঘটলে অথবা কর্মস্থল পরিবর্তিত হলে কিংবা ভাগ্য বিপর্যয় ঘটলে সেই অদম্য স্পৃহা আর পূর্বের মত থাকেনা। বিশেষ ভাবে স্বদেশ হতে দূর দেশে স্থানান্তরিত হলে পূর্বের ন্যায় লেখালেখির ধার তেমন অবশিষ্ট থাকেনা। কিন্তু অধ্যাপক মতিউর রহমান এক্ষেত্রে একদম ব্যতিক্রমী এক মহান জীবন শিল্পীর নাম, একজন লড়াকু সৈনিকের ন্যায় কলমী যুদ্ধে সর্বক্ষণ অবতীর্ণ তিনি। সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশ ও ভাষাভাষি জনগণের মধ্যে অবস্থান করেও, পেট্রো ডলারের মোহনীয় আর্কষণ সত্ত্বেও - আপন মাতৃভাষার প্রতি প্রবল অনুরাগ এবং তীব্র আর্কষণ - তার কলমকে থমকে যেতে দেয়নি। বিশেষভাবে তার মাতৃভাষা বাংলায় - তার জীবনোপলদ্ধির প্রকাশ কে তিনি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন সার্থক ও সফলতার সঙ্গেই। তিনি যে জীবন  ব্যবস্থার অকুণ্ঠ সর্মথক ও অনুপুঙ্খ অনুবর্তনকারী সে জীবন ব্যবস্থার আলোকে জীবন ও জগতকে অবলোকন এবং সেই অবলোকনের সার নির্যাস তার অগণিত পাঠক পাঠিকার নিকট তুলে ধরতে কখনো কার্পণ্য করেননি। 

একসময় ঢাকায় অধ্যাপনা শুরু করেছিলেন এবং একটি বাংলা দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন অতীব যোগ্যতার সঙ্গে। নবীন ও সম্ভাবনাময় লেখকলেখিকা তৈরীর কর্মযজ্ঞে নিরত ছিলেন - কিন্তু পেশা ও কর্মস্থল পরিবর্তেনের পাল্লায় পড়ে দীর্ঘ বিশটি বছর মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইতে অবস্থান করেন। কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশ পরিস্থিতি এবং অন্য ভাষাভাষি জন গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেও মাতৃভাষার প্রেম ও প্রচন্ড আর্কষণকে পানসে এবং দুর্বল হতে দেননি বরং আরো তীব্রতর হয়েছে ব্যাপক ও বিপুলভাবে। চাকুরী ব্যাপদেশে বিদেশ বিভূঁয়ে অবস্থান করলেও তিনি যে আদর্শে আদর্শবান সেই আদর্শের নিরিখে জীবন ও জগতকে নিরীক্ষণ করে তার উপলদ্ধি জাত চেতনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তার স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যের অংশ হিসাবে লেখালেখি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন। লেখালেখি কে তিনি জীবন সংগ্রামেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করেন। তার সকল লেখালেখি এবং কর্ম প্রচেষ্টার মূলই হলো সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন মাত্র। জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যই হচ্ছে পারিত্রিক জীবনে পরিত্রাণ।

তিনি দুহাতে লিখেছেন এবং এখনো লিখে যাচ্ছেন অবিরাম অবিশ্রান্ত। অগণিত সাড়া জাগানো পুস্তকের তিনি রূপকার ও সার্থক লেখক। 

নিভৃতচারী এবং প্রচার বিমুখ এ মহান লেখক চিন্তাবিদের অসংখ্য রচনা পুস্তকাকারে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তার মৌলিক রচনা সমূহের মধ্যে যথাক্রমে ‘ফররুখ প্রতিভা’, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, ঐতিহ্য  সভ্যতা সংস্কৃতি, মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সাঃ), মানবাধিকার ও ইসলাম, সংস্কৃতি, সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি, আমাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি, ইবাদত, ইবাদতের মূল ভিত্তি ও তার তাৎপর্য, ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার, মুসলিম বীর ও মনীষী, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সংস্কৃতি প্রভৃতি। এসব মৌলিক রচনা সমূহের মধ্যে ফররুখ প্রতিভা, সর্বাধিক  প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বহু পূর্বে কবি ফররুখ আহমদের উপর একটি মৌলিক এবং অভিনব গ্রন্থ রচনা করে বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিলেন। যদিও তার সেই বইয়ে ফররুখ সম্পর্কে তার সকল মতামত সকলে গ্রহণ না করলেও তার সেই গ্রন্থটি অনবদ্য গবেষণার চমকপ্রদ ফসল এতে সন্দেহ নেই একটুও, এক্ষেত্রে অধ্যাপক মতিউর রহমান কবি ফররুখ আহমদের একজন ভক্ত ও অনুরক্ত হিসাবে বিগত তিন চার দশকাল ধরে তার উপর গবেষণা ও লেখালেখির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘ফররুখ প্রতিভা’  সত্যিকারার্থে একটি মহৎ প্রচেষ্টা ও গভীর গবেষণা কর্মেরই চমৎকার ফসল। অন্যদিকে কবি ফররুখের রচনা সম্ভার নিয়ে দেশের প্রথিতযশা লেখক ও চিন্তাবিদদের লেখায় সমৃদ্ধ ‘ফররূখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’  (১ম ও ২য় খন্ড) নামক গ্রন্থটি ও তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্যায়ে তার সুচিন্তিত মতামত ও চিন্তাধারা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। একজন মৌলিক ও সঠিক চিন্তা চেতনার অধিকারী লেখক মতিউর রহমান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলা ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসে এবং মৌলিক অবদান সমূহ কতৃজ্ঞতার সঙ্গে যুগে যুগে আলোচিত হবে নিঃসন্দেহে। তার লেখার শৈলী অনবদ্য ও আর্কষণীয়। তার গদ্যভঙ্গি চমৎকার এবং নিঃন্দেহে অধিকতর  শক্তি সম্পন্ন। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে তার ন্যায় লেখক প্রতিভা হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন  দৃষ্টি গোচর হয়। তিনি একজন জেনারেল শিক্ষিত হয়েও ইসলামের মৌল বিষয়ের উপর বেশকটা গ্রন্থ লিখেও সুনাম অর্জন করেছেন। এক্ষেত্রে তার চিন্তাধারা কুরআন কেন্দ্রিক এবং সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। এককথায় তিনি একজন পরিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষাবিদ হওয়ার গৌরবে গৌরবান্বিত হওয়ার যোগ্য।

তার আরো কয়েকটি মৌলিক রচনা সম্পর্কে আলোকপাত করা জররুী মনে করে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো। 

(ক) বাংলাভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন - শিষর্ক একটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করে প্রকাশ করেন ১৯৯২ সালে। দুর্ভাগ্যক্রমে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিকৃত ইতিহাসও লিখিত হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ  অর্জনের জন্য কেউ কেউ এরূপ চেষ্টা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে অধ্যাপক মতিউর রহমান একদম নিরপেক্ষভাবে সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবার চেষ্টা করেছেন। যা দেশ ও জাতির জন্যে বিশাল কল্যাণ লাভের সুযোগ সৃষ্টি করবে এতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। 

(খ) তার আরেকটি মৌলিক রচনা হলো - বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, অধ্যাপক মতিউর রহমান বিপুল কষ্ট স্বীকার করে বাংলা সাহিত্যের মুসলিম ঐতিহ্যের একটি নিপূণ আলেখ্য রচনা করেছেন। বাংলা ভাষাভাষি মুসলিম লেখক চিন্তাবিদ বৃন্দের রচনাসমূহ গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করে বাংলা সাহিত্যে  সাহিত্য শিল্পের অনুসন্ধানে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন এবং বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য সর্ম্পকে যথার্থ মূল্যায়ন পূর্বক তার নিজস্ব দৃষ্টি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। যে দৃষ্টিভঙ্গি তৌহিদি জনতার হৃদয় মনকে পরিতৃপ্ত করেছে। অন্যদিকে সংস্কৃতি এবং ইসলামি সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রদান এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা মুনির নানা মতকে মূল্য দিয়েও  সংস্কৃতির একটি সঠিক সংজ্ঞা প্রদানে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে ইসলামেরও যে একটি সমৃদ্ধ  ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য  মঙ্গলময় সংস্কৃতি রয়েছে - যা গোটা মানবজাতির জন্য মহাকল্যাণকর ও শুভকর তাও  তিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। সর্বোপরি অধ্যাপক মতিউর রহমান এক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজম্মের জন্য নানা ধরনের ফলপ্রসূ পথ ও পন্থা বাতলে দিতে কসুর করেননি। তার এই মহৎ প্রয়াস সর্বমহলেই গ্রহণযোগ্যতা রাখার র্স্পধা সংরক্ষণ করে বলেই আমার দৃঢ় আত্ম প্রত্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ