শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কাগজ লুটেরা

শারমনি আকতার : (এক) চীনের একটি শহরের ছোট্ট একটা বস্তিতে থাকে ইয়াং কিং। পাঁচ-ছয়টা টোকাই ছেলের সাথে চটে ঘেরানো মুরগীর খুপরীর মতো একটা ঘরে বাস করে সে। ইয়াং ও অন্যরা রাস্তার ধারের ও শহরের ময়লা আবর্জনা যেমন কাগজ, শুকনো পাতা ও ভাঙ্গা প্লাস্টিক কুড়ায়। প্রায়ই বস্তা ভর্তি করে বস্তিতে নিয়ে আসে তারা। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে সে টাকায় পেটের ভাত জোগায় ওরা। অনেকে আবার চুরিও করে। কেউ কেউ চুরির বাড়তি টাকায় গাঁজা বা সিগারেটও খায়। ইয়াং কিংয়ের এসব ভাল লাগে না। সে চুরিও করে না গাঁজাও খায় না। কাগজ, শুকনো পাতা ও ভাঙ্গা প্লাস্টিক বিক্রি করে যে টাকা পায় সে টাকা দিয়েই  চলে। কখনও পেট ভরে খায়। আবার কখনও আধা পেটে বা না খেয়েই দিন পার করে সে। 

ইয়াং এর মা যখন বেঁচে ছিল তখন গ্রামে তিন ক্লাস পর্যস্ত পড়েছিল ইয়াং কিং। এখন আর পড়া হয় না। স্কুলে খুব পড়তে ইচ্ছে করে ইয়াং কিং এর। কিন্তু পড়তে গেলে যে বই পত্র, সুন্দর জামা কাপড় লাগে; তা সে পাবে কই? বড় বড় স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের পড়া শুনে। তারপর সেটা মনে মনে আওড়ায়। কিন্তু বেশীক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। দারোয়ান তাড়িয়ে দেয়। আর কখনও দারোয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুপিচুপি পড়া শুনলেও ক্লাস শেষে ছাত্র ছাত্রীরা তাকে দেখে নাক ছিটকায়। দূর- ছাই করে অনেকেই তাড়িয়ে দেয় তাকে। কাছে ঘেষতে দেয় না কেউ। দু-একবার দারোয়ানের মারও খেয়েছে সে। তাই এখন আর স্কুলের কাছে যায়না ইয়াং কিং। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে বসে কুড়ানো কাগজ হাতে নিয়ে পড়ে পাঠ্যপুস্তকের মতো। খুব একটা বুঝে না, তারপরও পড়ে। পড়তে খুব ভাল লাগে তার। 

দুই

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে ইয়াং কিং। এলোমেলো পায়ে ঢুলুঢুলু চোখে আস্তেআস্তে মোড় পেরিয়ে বড় রাস্তার ধারে চলে গেল। আবছা অলোতে দ্রুত ছুটে আসা গাড়ীর হেডলাইটের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার খুব ভাল লাগে। গাড়ী যখন তার দিকে আসে তখন সে হাত উঁচিয়ে বলে

-হাই হাই...।

আবার যখন তার পাশ দিয়ে তাকে অতিক্রম করে চলে যায় তখন বলে

 -বাই বাই...।

প্রতিদিন ভোরে হাই আর বাই দিয়েই শুরু হয় ইয়াং কিংয়ের দিন। কোন কোন গাড়ী থেকে সে তার হাই-বাই এর সাড়াও পায়। তখন খুব ভাল লাগে তার। নিজেকে নিজের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়  ইয়াং কিংয়ের। আজকেও বেশ কয়েকটা গাড়িকে স্বাগতম ও বিদায়ী সম্ভাষণ জানালো। এ সময় খুব দ্রুত ভীত ভঙ্গিতে একটা মালবাহী গাড়ী আসলো। এটা ইয়াং কিংয়ের অনেক দিনের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় গাড়ী। ইয়াং কিং গাড়ীটার দিকে তাকিয়ে বেশ খুশীর সাথে চিৎকার করতে করতে বলল 

-হাই...হাই...

গাড়ীর ভেতরের প্যাসেনজারও তার উদ্দেশ্যে হাই বলল। ড্রাইভার গাড়ীর গতি কমিয়ে দিল। ড্রাইভারের পাশে বসে থাকা লোকটা ইয়াং কিংয়ের উদ্দেশ্যে বলল

-কেমন আছো?

-ভাল।

-এই নাও।

আজকেও তার দিকে একটা বিরাট কাগজ ছুঁড়ে দিল গাড়ী থেকে। হঠাৎ হঠাৎ ইয়াং কিংকে তারা এরকম বড় বড় কাগজ দেয়। ইয়াং কিংয়ের খুব ভাল লাগে এসব বড় কাগজ পেলে। কিন্তু সে যে এসব কাগজ খুব মনোযোগের সাথে পড়ে তা নয়। লম্বা লম্বা কাগজগুলো পড়তে তার খুব একটা ভাল লাগে না। রাজনীতি, সরকার, হত্যা ও ধর্ষণ কি সব কথা বার্তায় ভরপুর কাগজগুলো। ওসবের কিছুই সে তেমন বুঝে না। তবে কাগজগুলো  সেভাবে পড়া না হলেও ওগুলো তার অনেক কাজে আসে। রাস্তার ধারে ঐ কাগজ পেতেই মাঝে মধ্যে শুয়ে থাকে ইয়াং কিং। এই লম্বা কাগজের উপর বসেই তার পছন্দের অন্য কাগজ পড়ে। তাই খুশীই হয় কাগজগুলো পেলে। আজকেও সে অনেক খুশী। কৃতজ্ঞ চিত্তে ও প্রশান্ত দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে রইলো। এমন সময় রাস্তার পাশে লুকিয়ে থাকা একদল লোক অস্ত্র হাতে গাড়ীটাকে থামিয়ে দিল। তাদের সব কাগজ লুট করলো তারা। গাড়ীর ভেতরের দুজন অবশ্য প্রণপণে বাধা দিল। বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তিও হল দু’পক্ষের মধ্যে। কিন্তু কাগজওয়ালারা পারলো না। উল্টো মার খেতে হল তাদেরকে। অবশেষে নিজের জীবন বাঁচাতে সেখান থেকে পালিয়ে গেল তারা। এবার দুর্বৃত্তরা গাড়ী বোঝাই সবগুলো কাগজ অন্য একটা মালবাহী গাড়ীতে তুলে নিল। অবশিষ্ট কিছু কাগজে আগুন লাগিয়ে পুড়ে ফেললো এবং সেখান থেকে চলে গেল তারা।

ইয়াং কিং অনেক আগেই সেখান থেকে পালিয়ে গেছে। দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে লুটেরাদের এসব অপকর্ম দেখছিল সে। যখন গাড়ীর লোকগুলো গুন্ডা টাইপের লোকগুলোর কাছ থেকে মার খাচ্ছিলো তখন ইয়াং কিংয়ের খুব কষ্ট হচ্ছিলো। সে জীবনে মায়ের পর কাগজবাহী গাড়ীর লোকগুলোর কাছ থেকেই প্রথম এতো সম্মান পেয়েছে। তাকে দেখলে গাড়ী থামায়। সে কেমন আছে তাও তারা মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করে। আহা কতো ভাল মানুষ ওরা। 

কাগজ লুটেরারা চলে গেলে ইয়াং কিং এক দৌড়ে বড় রাস্তার মোড়ে চলে গেল। ওখানে একজন বয়স্ক লোক চা খাচ্ছেন। ইয়াং কিং তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল

- চাচা চাচা বড় রাস্তায় কাগজ লুট করেছে গুন্ডারা। আমি একটা কাগজ নিয়ে এসেছি। কাগজের গাড়ী থেকে এক আঙ্কেল আমাকে এটা দিয়েছে। এইতো একটা কাগজ নিয়ে এসেছি। 

হাফাতে হাফতে মোড়ে বসে থাকা লোকটির উদ্দেশে বলল ইয়াং কিং।

-ও তুই কাগজ নিয়ে আসছিস? দে দেখি। কতোদিন পড়ি না কাগজ। 

খুশী হয়ে ইয়াং কিংকে পাশে বসার জায়গা করে দিয়ে লোকটা খুব আগ্রহের সাথে তার হাত থেকে কাগজটা নিলেন। চোখের চশমটা সুবিধা মাফিক নাকের উপর ঠেকিয়ে কাগজে চোখ রাখলেন এবং চা স্টলের চা বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বললেন

-শুনছি কাগজ আসা নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। বাজারে খুব একটা কাগজও পাওয়া যাচ্ছে না এখন। শক্তিমানরা বাজারে কাগজ আসতে দিচ্ছে না।

চা বিক্রেতা কিছু বলার আগেই ইয়াং কিং লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল

- ক্যান চাচা?

- এখন সময়টাই তো জোর যার মুল্লুক তার বাবা। দুর্বলদের দিন শেষ। যা খুশী তাই করার অধিকার রাখে উপরতলার লোকেরা। কাগজ শ্রমিকরা অবশ্য এজন্য প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় নাই। 

বিষন্ন মনে ঠোট ফুলিয়ে শেষের কথা কয়টা বললেন লোকটা। তার কথাগুলো অনেক আগ্রহের সাথে শুনলো ইয়াং কিং। সে লোকটার দিকে আর একবার তাকিয়ে বলল 

- চাচা ওরা কাগজ লুট করলো কেন? ডাকাতরা তো দামী জিনিস, গহনাপাতি লুট করে। কাগজগুলো কেন লুট করে নিয়ে গেল?

-ওগুলো শুধু কয়েকটি কাগজ না বাবা। ওগুলো আমাদের দৃষ্টি; যা দিয়ে আমরা বিশ্বের অবহেলিত, অত্যাচারিত মানুষগুলোকে দেখতে পাই। আবার ওগুলোকে আমাদের শ্রবণশক্তিও বলা যেতে পারে; অসহায় মানুষের গমক বাঁধা কান্নার আওয়াজ শুনতে সাহায্য করে। ওই কাগজগুলোই আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। অসহায় মানুষগুলোকে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার করে তোলে। অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনে।

কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো ইয়াং কিং। লোকটার পড়া শেষ হলে কাগজটা নিয়ে  আবার বস্তিতে ফিরে গেল সে। এবার লম্বা কাগজ প্রথম বারের মতো মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলো সে। খুন, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, রাজনীতি, সরকার থেকে শুরু করে সব পড়লো ইয়াং কিং। ওদের কথাও রয়েছে। খুব ভাল লাগলো ওর।

-ওহ ! আমাদের কথা ! কি মজা ! আমাদের কথা !

খুশিতে লাফাতে লাফাতে অন্যদের কছে দৌড়ে গেল ইয়াং কিং। তারপর হাতের ইশারায় কাগজের নির্দিষ্ট জায়গায় দেখিয়ে বলল

-দেখ, আমাদের কথা লিখেছে। আমাদের কথা। আমাদের এখানে পথ শিশু কইছে। 

সবাই একটু কৌতুহলী ভঙ্গিতে ইয়াং কিংয়ের কাছে জড়ো হল।

-আমাদের সহ অন্যান্য অসহায় মানুষের থাকা-খাওয়া, ভাল ভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের জন্য নাকি শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্কুল ও থাকার জায়গাও তৈরি হইবো। কি ভাল হইবো না? অনেকে নাকি এর জন্য আন্দোলন করছে।

একজন বলে উঠলো

-বাদ দে। আমাদের জন্য স্কুল হইবো! কে করবো এসব? 

অন্য আর একজন বলল

-স্কুলের পাশেই দাড়াইতে দেয় না। কাছে গেলে দূর ছাই করে তাড়ায় দেয়। আর আমাদের জন্য স্কুল হইবো না? পাগল হইছে...।

কথা শেষ হতে না হতেই ইয়াং কিংয়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে ছেলেটি হাসে। অন্যরাও তার সাথে হাসিতে ফেটে পড়ে। সবাই তচ্ছিল্যের সাথে তার কথা  উড়িয়ে দিলেও ইয়াং কিং বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বিষয়টাকে। ইয়াং কিং স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো একটা সুন্দর থাকার জায়গার, পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ ও তার জন্য উন্মুক্ত এক স্কুলের; যেখানে গেলে দারোয়ান তাকে লাঠিপেটা করে আর তাড়িয়ে দেবে না। 

এরপর থেকে প্রতিদিন কাগজের গাড়ীর অপেক্ষায় থাকে সে। কিন্তু কাগজের গাড়ী আর আসেনা। কাগজ লুটেরাদেরকে মাঝে মাঝে রাস্তায় টহল দিতে দেখে ইয়াং কিং। ওদেরকে দেখলে রাস্তার পাশে আর দাড়ায় না। দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজের গাড়ীর আসার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে ইয়াং কিং। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে বসে চোখ বন্ধ করে প্রভুকে ডাকতে থাকে। প্রভু!  আজকে যেন কাগজের গাড়ী আসে প্রভু। আজকে যেন কাগজের গাড়ী আসে...।

এভাবে মনে মনে বলতে থাকে কয়েক বার। তারপর ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে প্রার্থনা কবুলের আশায় রাস্তার দিকে তাকায়। না আজকেও  সেই গাড়ী আসেনি। আজও প্রভু তার প্রার্থনা শুনেনি। খুব মন খারাপ হয়ে যায় ইয়াং কিংয়ের। তাহলে কি কাগজের গাড়ীটা  লম্বা লম্বা কাগজ নিয়ে আর কখনও আসবেনা? আমাদের অধিকার আদায়ের কথা বলবেনা আর কখনও?

ইয়াং কিংয়ের বুকের কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে গাল বেয়ে ঝরতে লাগলো। চোখের জল মুছতে মুছতে বিষন্ন মনে বড় রাস্তা ও গলি পেরিয়ে বস্তিতে ফিরে এলো সে। পুরাতন সেই লম্বা, প্রশস্ত কাগজটা আবার মেলে ধরলো চোখের সামনে। “পথ শিশুদের জীবনাচরণ” প্রতিবেদনটি আবার পড়লো  সে। এবার যেন তার শিরা- উপশিরায়, তন্ত্রে-উপতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়লো পরিশুদ্ধ অক্সিজেনবাহী খুনের ধারা। ভেতরে ভেতরে নিজ অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে সে উদ্বেলিত হতে লাগলো বারবার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ