বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন গোপালগঞ্জের ভিসি

স্টাফ রিপোর্টার : শিক্ষার্থীদের প্রবল আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন। গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগপত্র হাতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বশেমুরবিপ্রবি ভিসির অপসারণের সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় ইউজিসি। এরপর গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয় ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে। সেখানে তিনি পদত্যাগ পত্র জমা দেন।
 রোববার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশই পুলিশের পাহারায় ক্যাম্পাস ছেড়ে গোপালগঞ্জ শহরের বাসায় উঠেন ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। গতকাল দুপুর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করছিলেন বলে জানান তিনি।
তথ্যমতে, বশেমুরবিপ্রবি ভিসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে রোববার ইউজিসি তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ১১ পৃষ্টার প্রতিবেদনে ভিসিকে প্রত্যাহার করা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে উঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এছাড়া কমিটি ভিসির অনিয়ম, অদক্ষতা, দায়িত্বহীনতা ও অদূরদর্শিতা দেখতে পেয়েছে।
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে স্বেরাচারী আচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে ভিসির পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করছে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২৪ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত দল তদন্তে দোষ পেয়ে ভিসির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করার পর রোববারই ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন অধ্যাপক নাসির। তবে তারপরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছিলেন, ভিসি পদত্যাগ না করলে পিছু হটবেন না তারা।
অধ্যাপক নাসিরের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সাতাশিয়া গ্রামে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পর সেখানেই বায়ো টেকনোলজির শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে তিনি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান।
নিজের জেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছিল নাসিরের বিরুদ্ধে। এনিয়ে লেখালেখিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে।

একটি ফেইসবুক পোস্টের জন্য গত ১১ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ও আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে সময়িক বহিষ্কার করার পর ভিসি নাসিরের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যেই ওই শিক্ষার্থী ও ভিসির কথোপকথনের একটি অডিও ভাইরাল হয়, যেখানে ওই ছাত্রীকে বকাঝকা ও হুমকি-ধমকি দিতে শোনা যায় ভিসিকে। মেয়েটির বাবাকে নিয়েও তীর্যক মন্তব্য করেন তিনি।
ওই অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ভিসির সমালোচনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও জোরদার হয়। বিক্ষোভের মুখে ১৮ সেপ্টেম্বর ওই শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ১৪টি বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়, যার মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছাড়া বহিষ্কার না করা, অভিভাবকদের ডেকে এনে অপমান না করা এবং ফেইসবুক পোস্ট ও কমেন্টকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
তবে এতে সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে অনশনসহ আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এ আন্দোলন ঠেকাতে ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেন ভিসি। শিক্ষার্থীরা তার প্রতিবাদ করলে একদল বহিরাগত হামলা চালিয়ে অন্তত ২০ জনকে আহত করে।
ওই হামলার জন্য ভিসিকে দায়ী করে পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন সহকারী প্রক্টর। এদিকে ভিসির পদত্যাগে এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও চলতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কমিটি করে ইউজিসি। তাদের সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও তার আগেই কাজ শেষ হয়।
তাদের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোববার রাত ৯টার কিছুক্ষণ পর কড়া পুলিশ পাহারায় নিজের কোয়ার্টার থেকে গাড়িতে উঠে ক্যাম্পাস ছাড়েন অধ্যাপক নাসির। ভিসির ক্যাম্পাস ত্যাগের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উল্লাস প্রকাশ করেন।
এদিকে ইউজিসির তদন্ত কমিটি রোববার সকালে কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কাজী শহীদুল্লাহর হাতে প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিকালেই তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়ে দেন তিনি। ওই প্রতিবেদনে ভিসিকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে ইউজিসির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ