রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

যে স্মৃতি আমাকে কাঁদায়

মনসুর আহমদ : মহান রব্বুল আলামীনের এক দুর্বল সৃষ্টি মানুষ। মানুষের স্মৃতি শক্তি খুবই দুর্বল। সাধারণত আজ যা করে তা কাল ভুলে যায়। এই ধরুণ, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা করা হয় কাল দুপুরে কী কী খেয়েছেন? ঝটপট করে অনেকেই বলতে ব্যর্থ হবেন। আমার কথাই বলি, সে দিন মোহতারাম সেক্রেটারী জেনারেল সাহেবের সাথে অনেক বছর পরে দেখা। কুশলাদি জিজ্ঞেস করার এক ফাঁকে বলেছিলাম আপনার বাসায় আমি কয়েক বছর আগে মেহমান হয়েছিলাম আমার মেয়ের বিবাহের ব্যাপারে আলাপ করার জন্য। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মেয়েটার নাম জানি কী? হঠাৎ করে উত্তর দিতে পারলাম না। একটু ভেবে পরে জওয়াব দিতে হল। হেসে বল্লেন, এটাই স্বাভাবিক, বয়স হয়েছে তো। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করলাম।
মানুষের জীবনটা খুব দ্রুত পাল্টে যায়। শিশু, কিশোর, যৌবন ও পৌঢ় কাল কাটিয়ে কখন যে সে বৃদ্ধকালে এসে পৌঁছে তা টের পায় না। আমি আমার জীবনের পঁচাত্তরটি বছর পেছনে ফেলে ছিয়াত্তরের শেষের দিকে এসে পৌঁছেছি। এত দিনে আনেক ঘটনা ঘঠেছে, হাসি-কান্না, দুখঃ-বেদনার বহুত ঘটনা। সে সবের অনেক ভুলে গেছি। এটাই আল্লাহ্র ইচ্ছা। নয়ত মানুষের পক্ষে স্মৃতির সমস্ত বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকা হয়ত অনেক কষ্টকর হত।
আজ আমি আমার কিশোর জীবনের সামান্য কিছু স্মৃতি কথা বলার চেষ্টা করব। এই স্মৃতি আলোচনা আমার মাকে নিয়ে। লেখাটি কালানুক্রম আনুয়ায়ী হবে না বলে দুঃখিত। কারণ এত দিনে পরে স্মৃতির পাতায় অনেক ধূলি জমেছে।
যতটুকু মনে পড়ে, একবারে ছেলে বেলা থেকে আমি আমার মায়ের আঁচল ধরে থাকতাম। কখনো যদি মাকে না পেতাম তখন মা কোথায় গেছেন তা তাঁর পায়ের ছাপ দেখে খুঁজতে থাকতাম। সেকালে গ্রামগঞ্জের মেয়েরা জুতা পরতনা বা পরার সুযোগ ছিল না। তাই খালি পায়ের চিহ্ন ধরে এদিক সেদিক খুঁজতাম। আমাদের একেবার পাশের বাড়ি ছিল আমার মেঝো খালার বাড়ি। তাই বাড়িতে না পেলে খালা বাড়ি গিয়ে মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরতাম। খালা আমার কা- দেখে হাসতেন।
এক দিনের ছেলেমির কথা বেশ পনে পড়ে। মামু বাড়ি গিয়েছিলাম বেড়াতে। আমার মামু বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে এক গ্রাম পরে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে হবে। কিন্তু আমাদের বাড়ির সামনে এক বিরাট মাঠ। তার আপর পাড়ে মামু বাড়ি, আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। মামু বাড়িতে কা-টি ঘটে ছিল। মাকে খুঁজে পাচ্ছি না। খুঁজতে খুঁজতে মাথায় বেজায় রাগ উঠে গেল। এক সময় দেখি মা ও সেঝো খালা পাশের ভিটা থেকে তরমুজ কুড়িয়ে এক যায়গায় জড়ো করে রাখছে। কিছু বলা কওয়া নেই। হাতের লাঠি দিয়ে দুম দুম আঘাত করে সব তরমুজগুলি ভেঙ্গে ফেললাম। সেঝো খালা আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। তিনি আমার কা- দেখে হেসে ফেললেন। মা রাগ করেছিলেন কি না তা মনে নেই।
আর এক রাতের ঘটনা। সেটি ছিল শীতের রাত। মা ঘরের সামনে উঠানে কড়াইতে ধান সিদ্ধ করছেন। আমি তখন নেংটা পুটুশ থাকি। এক মামু আমার জন্য একটি লুঙ্গি কিনে আনলেন। মা আমাকে দেলেন পরিয়ে। আমি একটু পওে লুঙ্গিটা খুলে দিলাম জ¦লন্ত চুলায়। মাকে বললাম, দেখ মা, কি সুন্দর জ¦লছে। মা আগুনের মধ্যে থাবা দিয়ে লুঙ্গিটা বের করে আনলেন, কিন্তু ততক্ষণে লুঙ্গিটা অনেক পুড়ে গেছে। মা আমাকে ধমক দিয়ে ছিলেন বলে মনে পড়ে না।
এই ছেলে বেলায় আমার মার সাথে আমাকে প্রায়ই মামু বাড়ি আসতো হত। কারণ আমার সম্ভবত দুই কি আড়াই বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। যে জমি ছিল তার অধিকাংশ বন্ধক রেখে গিয়েছিলেন। আর যেটুকু সামান্য জমি ছিল মা তার সাথে কিছু আপরের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করাতেন। সে কারণে আমাদের সংসারে অভাব লেগেই ছিল। আর তাই প্রায়ই মা মামুদের কাছে, নানীর কাছে ছুটে আসতেন এ ব্যাপারে পরামর্শ ও সাহায্যের জন্য। তারা আমাদেরকে আন্তরিকভাবে সহায়তা প্রদান করেছেন। মা আসতেন কোন দিন সন্ধ্যায়, আবার ফিরে যেতেন ফজরের পর পরই। আমি শুয়ে শুয়ে শুনতাম নানী শেষ রাতে পান ছ্যাছতেছেন আর মার সাথে গল্প করছেন। ফজরের আজান হলেই মাকে বিদায় দিতেন। মা আমাকে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়তেন। শীতের সময় আমার হাটতে খুব কষ্ট হত। মা ও আমার কারই জুতা ছিল না। তাই খালি পায়ে সেই রোদ ফাটা মাঠ দিয়ে চলতে ভীষণ কষ্ট হত। পা ঠা-ায় জমে আসলে ইদুরের তোলা মাটির ডিবির মধ্যে পা ঢুকিয়ে একটু গরম করে নিয়ে আবার পথ চলতাম। এভাবে যে কতদিন হেটেছি তা আজ আর মনে নেই।
মা’র জীবনটা ছিল দুঃখ-বেদনায় ভরা। আমি যতটুকু জেনেছি আমার বাবার প্রথমা স্ত্রী আমাদের মা পরী বানু এক সময় গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তার চার ছেলে মেয়ে ছোট ছোট। পরী বিবি এতটা অসুস্থ ছিলেন যে তার প্রায় সময় হুশ থাকত না। চলা ফেরা মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। আমার দাদী ছিলেন বৃদ্ধা। তার পক্ষে এসব নাতি নাতনীদের দেখাশুনা করাটা ছিল অসম্ভব। এ সময় দাদীর পরামর্শক্রমে বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করতে রাজি হন। তখন আমার মা আসেন চার সন্তানের লালনে পালনের ভার নিয়ে বাবার সংসারে। বাবা মা’র বিবাহের কত বছর পরে আমার জন্ম,তা আমার জানা নেই। তবে আমার নাকি আড়াই বছর বয়সে বাবা রোগে পড়ে মারা যান। আমার বাবার কথা কিছুই মনে পড়ে না।
বাবা কিছু স্মৃতি রেখে গিয়েছিলেন। তা দেখে আমার মনে হয় তিনি একজন ধর্মপ্রাণ, শক্তিশালী আদর্শ কৃষক ছিলেন। তার মারার পরে আমাদের ঘরে পাওয়া গেছে অনেক ধর্মীয় বই। পেয়েছি বেশ উন্নতমানের চেয়ার, টেবিল, কাঁসার দীর্ঘ নল ওয়ালা পিতলের হুক্কা, কাঁসার বড় বড় থালা গ্লাস বাটি। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এত বড় থালা গ্লাস কে ব্যবহার করত। মা হেসে বলে ছিলেন, তোর বাবা। তিনি স্বাস্থ্যবান  পুরুষ ও অত্যন্ত পারিশ্রমী মানুষ ছিলেন। বাবা বেশি দিন হুক্কা ব্যবহার করেননি, কয়েক বছর ব্যবহার করে আমার জন্মের পর ছেড়ে দিয়ে ছিলেন। তিনি হয়েছিলেন এক আধ্যাত্মিক পীরের মুরিদ। প্রায় অর্ধ মাস রোগে ভোগার পর তিনি ইন্তেকাল করেন। মারা যাওয়ার আগে বাব অসিয়ত করেছিলেন, মা যেন তাঁর মরার পরে এই সব ইয়াতিম ছেলে মেয়েদেরকে ফেলে কোথাও না যান। বিবাহ বসতে হলে এমন বিবাহ করবে যেন এ সংসার ছেড়ে না যেতে হয়। মা আন্তরিকভাবে বাবার কথা মেনে নিয়ে ছিলেন। বাবার মরণের পরে মা’র মাথার উপর নেমে আসে বিরাট বোঝা। শুরু হয় তাঁর দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম, সমাজ ব্যবস্থার সাথে সংগ্রামী জীবন।
 জমিতে যে ধান হ’ত তা দিয়ে আমাদের সংসার চলত না। তাই মাকে বিকল্প রোজগারের জন্য বিভিন্ন কাজ করতে হত। যেমন-হাঁস মুরগী পালন। মা অনেক হাঁস মুরগী পালতেন। তা থেকে ডিম পাওয়া যেত, এসব মোরগ মুরগী হাঁস দুরের বাজোরে নিয়ে যেতাম ঝুড়ি ভরে। আমার বয়স বা কত। লোকেরা অনেক কম দামে আমার কাছ থেকে এ সব কিনে নিত।
আমাদের বাড়িটি ছিল অনেক বড়। মা বিভিন্ন তরি তরকারী লাগাতেন। শাক শব্জি, কুমড়া, পেপে বিভিন্ন ঋতুর বিভিন্ন সব্জি। তাই তরি তরকারী কিনতে হ’ত না বললেই চলে।
সে কালে খালে-বিলে, মাঠে, ডোবায় প্রচুর মাছ ছিল। মা আমাকে ছোট্ট একটা ঝাকি জাল বুনে দিয়েছিলেন্। আমি তাই নিয়ে মাঠের খালে পুকুরে, রাস্তর পাশের ডোবায় মাছ ধরার চেষ্ট করতাম। বেশ পাওয়া যেত, তাতেই আমােেদর চলে যেত। অনেক সময় আমার অল্প বড় ছোট্ট বুবুকে নিয়ে খালে গামছা দিয়ে গুড়া মাছ ধরতাম। তা ছাড়া প্রত্যেক বাড়ির মা বোনেরা ছাবি বাইত। তাতে প্রচুর চিড়ি মাছ টেংরা মাছ ইত্যাদি পাওয়া যেত। মাও এভাবে মাছ ধরতেন। তাদিয়ে আমাদের চলত। মাছ কিনতে হত না বল্লেই চলে। সে কালে নদীতে প্রচুর ইলিশ মিলত। দামেও ছিল বেজায় সস্তা। আমি চৌদ্দটি ইলিশ এক টাকায় বিক্রি হতে দেখেছি। তা মাঝে মাঝে কিনতাম।
মা’র অর্থ রোজগারের এর একটি উপায় ছিল ধান ভানা। মা আশে পাাশের বাড়ি থেকে ধান কিনে তা সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে ঢেকিতে ধান ভানে চাল করতেন। তখন দেশে ধান ভানার কল বেশি চালু হয়নি। গ্রামের মা চাচীরা খুব ভোরে উঠে ঢেকি ঘরে ধান ভানতেন। অনেক রাত পর্যন্ত এ কাজটি চলত। মাও তাই করতেন। সে চাল তিনি বাড়িতে বসে বিক্রি করতেন। অনেক সময় গভীর রাতে বাড়িতে গ্রামের গরীব মানুষগুলি চাচী বলে ডাক দিত। মা তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে চাল দিয়ে দিতেন। অনেক সময় আমি মাথায় করে বাজারে সে চাল বিক্রির জন্য নিয়ে যেতাম। বাজারের অনেক হিন্দু ভদ্র লোক ঢেকি ছাটা চাল কিনতে আগ্রহী ছিলেন। তারা আমাকে দেখলেই ডাক দিয়ে বাসায় নিয়ে ন্যায্য দাম দিয়ে চাল কিনে রাখতেন। আমি ছোট্ট মানুষ বলে ঠকাতেন না।এভাবে বেশ চাইল ও টাকাপয়সা যোগাড় হত। সে সময় একাজে কোন কষ্ট অনুভব হয়নি। কিন্তু আজ মায়ের সেই সংগ্রামের কথা ভেবে মনে বড্ড কষ্ট পাই।
আমাদের সংসার সামাল দিতে মাকে এভাবে অনেক কষ্টের মোকাবেলা করতে হয়। আমাদের ঘরখানায় ছিল গোল পাতার ছাউনী। সেকালে ধনী গরীব প্রায় সকলের ঘর ছাওয়া হত সুন্দর বনের ছন বা গোল পাতা দিয়ে। আর যারা খুব অসমর্থ ছিল তারা ধান গাছের নাড়া দিয়ে ঘর ছাইত। দুই তিন গ্রামে দুই একটি বাড়িতে ছিল টিনের ব্যবহার। বাবার ইচ্চা ছিল ঘরের চালে টিন লাগান। মা’র কাছে শুনেছি, বাবা যেদিন বাজারে টিন কিনতে যান সেদিন সেখানে আসুস্থ হয়ে পড়েন। টিন আর কেনা হয়নি, আর সুস্থ হয়েও উঠেননি। প্রায় অর্ধ মাস রোগ ভোগের পর ইন্তেকাল করেন। বাবা মারা যাওয়ার অনেক বছর পর যখন আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি তখন বাবা যে কাঠ কড়ি পানিতে ডুবিয়ে রেখে ছিলেন তা বেশ কষ্ট করে পুকুর থেকে তুলে ঘর খানা তা দিয়ে মেরামত করে আবার নতুন করে গোল পাতা লাগান হয়। এত বছর বেশ কষ্ট করতে হয়েছে মাকে। ইঁদুরে গোল পাতা কেটে দেবার ফলে ঘরের চালের নানা জায়গা থেকে পানি পড়ে ঘর ভিজে যেত। আমাদের ঘুমাতে কষ্ট হত। বৃষ্টি শুরু হলেই মা পাতিল, গামলা, থালা বাটি নিয়ে মাচার উপরে পাততেন যেন সব কিছু ভিজে না জায়, আমরা যেন না ভিজি। সে সময় এ কষ্টের কথা কষ্ট বলে বেশি মনে হয়নি। যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন ‘পোষ্ট মাস্টার’ গল্পটি পড়তে গিয়ে যে দিন পড়লাম ‘মিট্মিট করিয়া প্রদীপ জ¦লিতে লাগিল এবং এক স্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপরে টপটপ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল” তখন আমাদের ঘরের সেই আবস্থা, মা’র কষ্টের কথা স্মরণ হতেই চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে উঠেছিল।
আমাদের পাকের ঘর, গোয়াল ঘর নাড়া দিয়ে ছাওয়া হত। মা লোক লাগিয়ে পৌষের শেষে নাড়া কাটিয়ে স্তুপ করে রাখতেন এবং পরে ঘর দু’টি ছাওয়া হত। এক দিন আমি নাড়া কাটতে গিয়ে হাতের আঙ্গুল কেটে ফেল্লাম। মা বল্লেন, তোকে নাড়া কাটতে আর যেতে হবে না, সত্যি আর যেতে হয়নি।
আমি এ সব কাজ মোটেই পারতাম না। সেদিনের কথা মনে পড়লে হাসি-কান্নায় মনটা উথলিয়ে ওঠে। মামু বাড়িতে একদিন মেঝ মামু মাঠে নিয়ে একটা লাঙ্গলের হাল হতে দিয়ে বল্লেন, চালা দেখি। আমি চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু গরু আমার কথা শোনে না। অনেক ক্ষণ চেষ্টা করেও যখন আর পেরে উঠলাম না, তখন মামা বলে ফেললেন, ‘তুই কী করে খাবি, তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না।’ বাড়িতে এসে মাকে হাসতে হাসতে এ গল্প বলতে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘ আল্লাহ ব্যবস্থা করবেন।’ আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ সে ব্যবস্থা করেছেন।
এবার আসা যাক সন্তানদের মানুষ করতে মায়ের কষ্টের গল্পে। আগেই বলেছি আমার বড় মা’র চার সন্তান ছিল, তিন মেয়ে এক ছেলে। একটি মেয়ে নাম আনোয়ারা শিশু কালে মারা যায়। আমাকে নিয়ে আমরা চার ভাই বোন। সবার বড় মোসলেম। মায়ের কাছে শোনা, শিশু মোসলেম ১ম শ্রেণী থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত খাউলিয়া প্রামারী স্কুলে পড়াশুনা করেন। অসাধারণ মেধার অধিকারী মোসলেম চালিতা বুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে অনুষ্ঠিত সরকারী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৫ সালে খুলনা জেলার তৎকালীন একমাত্র সিনিয়র মাদ্রাসা বর্তমান আমতলী কামেল মাদ্রাসায় ভর্তি হন।
১৯৫১ সাল এই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শেষে ১৯৫২ সালের শুরুতে বর্তমান পিরোজপুর জেলার তৎকালীন দেশের বিখ্যাত মাদ্রাসা ছারছিনা দারুচ্ছুন্নাত আলীয়া মাদ্রাসায় মরহুম পীর মাওলানা নেসার উদ্দীন সাহেবের জীবদ্দশায় পাঞ্জম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং জামেয়া পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৫৪ সালের মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সপ্তম স্থান লাভ করেন। ১৯৫৬ সালের ফাজিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বাদশ স্থান লাভ করেন।
 ছারছিনা মাদ্রসায় ভর্তি থেকে তার জন্য মা যে কষ্ট করেছেন তার কিছু কিছুু এখনও মনে ভেসে ওঠে। ছারছিনা থেকে মিয়া ভাই প্রতি মাসে মাকে লিখতেন দশটি টাকা পাঠাতে। সে সময় দশ টাকা যোগাড় করা মার জন্য অনেক কঠিন ছিল। সাথে সাথে তো আর টাকা পঠান সম্ভব নয়, তাই মা পাশের বাড়িতে তাঁর সম্পকের এক চাচীর কাছে ফজরের পরে গিয়ে হাজির হতেন। তিনি বেশ পয়সাওয়ালা ও পরহেজগার মহিলা ছিলেন। অনেক ক্ষণ ধরে কোরআন তেলাওয়াত ও তসবিহ পাঠ শেষে মার সাথে কথা বলতেন। মা চাইতে অেেনক সময় ধার দিতেন। যে মাসে তিনি দিতে পারতেন না সে মাসে মা ছুটে যেতেন মামু বাড়ি। মামুদের কাছে থেকে সংগ্রহ করে কারও মাধ্যমে মনি অর্ডার করে পাঠাতেন। ধারের টাকা গুলো নানা ভাবে কষ্ট করে যোগাড় করে ফেরৎ দিতেন। যত দূর মনে পড়ে আলেম পরীক্ষাায় বৃত্তি লাভের পর মার কাছ থেকে টাকা কম চাইতেন। কারণ এক দিকে বৃত্তি, আবার অন্য দিকে এক সম্ভ্রান্ত পরিবাবের ইতমধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। সেখান থেকে তালই সাহেব জামাইকে টাকা পাঠাতেন।
মিয়া ভাইর লেখা পড়ার জন্য মা যতটা কষ্ট করেছেন মনে হয় তা চেয়ে বেশি কষ্ট করেছেন আমার লেখা পড়ার জন্য। আমি যখন বড় বোন হাজেরার সাথে মক্তবে যেতাম তখন মনে আছে আমি লেংটা পুটুস্। বড় বুবুর সাথের মেয়েগুলি বিশেষ করে আনোয়ারা বড় বুবুকে এ জন্য মন্দ বলতেন। কিন্তু ওস্তাদ মিয়া সাব (মাস্সাব) আমাকে খুব ¯েœহ করে কোলে নিতেন তা যেন কেমন করে আজও মনে আছে।
যত দূর মনে পড়ে ঐ মক্তবেই আমার প্রথম লেখা পড়ায় হতে খড়ি। মা লোক দিয়ে তাল পাতা কেটে সিদ্ধ করে দিতেন। কয়লা দিয়ে কালি তৈরী করে মাটির দোয়াত ভরে হেলি পাতার হোগলা বগলে চাপিয়ে দিয়ে মক্তবে পাঠাতেন। সকালে পান্তা খেয়ে মক্তবে দুপুর পর্যন্ত থেকে কালি ভর্তি বদন নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। দুপুরের পরে আবার মক্তবে যেতে হত। সীতানাথ বসাকের আদর্শ লিপি, ইমদাদ আলী মৌলভীর বাল্য শিক্ষা, তার সাথে একখানা ধারাপাত বই, এই ছিল মক্তবের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সিলেবাস। ইতিমধ্যে আমার মাস্সাব আব্দুল লতিফ কোথায় যেন চলে গেলেন। কাছে আর মক্তব বা কোন স্কুল নেই। মা আমাকে পাঠালেন নানীর কাছে। সেখানে ফকীর বাড়ির স্কুলে ছিলেন মোবারক মাস্টার। দুই তিন নানীর কাছে থেকে আর মন টিকছিল না। আমি নানীকে বলে আবার মা’র কাছে চলে এলাম।
এখন কী হবে কোথায় লেখাপড়া করব তাই নিয়ে মা খুব চিন্তিত।্ আমি মাকে বল্লাম, আমাকে চালিতা বুনিয়া প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দেন। মা বল্লেন, তুই এত দূরে কেমনে যাবি? আমি বল্লাম, অসুবিধা হবে না। মা বল্লেন আচ্ছা। চালিতা বুনিয়া প্রাইমারী স্কুল আমাদের বাড়ি থেকে দুই আড়াই মইল দূরে। আমি সেখানে ভর্তি হয়ে স্কুলে যেতে লাগলাম।
খুব ভোরে উঠে আমাদের যে কয়টি গরু ছিল সেগুলিকে খড় কুটা দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে শুকনা মরিচ পোড়া ও সাথে নারিকেল দিয়ে পেট ভরে পান্তা খেয়ে ছুটতাম স্কুলে। নারিকেল ও গুড় ছিল আমার খুব প্রিয়। কখন নারিকেল গুড় দিয়ে খেয়ে ছুটতাম স্কুলে। তখন আমার কোন জামা ছিল না। একটি গেঞ্জী গায়ে স্কুলে য়েতাম। আর হাফ প্যান্ট বা প্যান্ট তো আমি আমার ছাত্র জীবনের কোন স্তরেই পরিনি। আমার ছাতা ছিল না। বর্ষাকালে বৃষ্টি এলে মা মান কচুর একটা পাতা কেটে দিতেন। তাই মুড়ি দিয়ে বই খাতা বগল দাবা করে স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে ফিরে গরু গুলিকে পানি খাওয়ায়ে ছায়ায় বিশ্রমের জন্য বাধতাম। সাহায্য করার দ্বিতীয় কেউ ছিল না। এ ভাবে চালিতা বুনিয়া স্কুলে মনে হয় তৃতীয় শ্রেণী এবং চতুর্থ শ্রেণীতে কয়েক মাস পড়ে আবার ফিরে এলাম খাউলিয়া প্রাইমারী স্কুলে। বাড়ির অনেক কাছে হওয়ায় আমার পক্ষে বেশ সুবিধা হল। পথে যেতে যেতে দেখা হত ছব্দার শেখ, কাজেম মোল্লা, আব্দুল গফুর খান .মফেজ ও সোনামদ্দিন হাওলাদারের সাথে। তারা আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। এভাবে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলাম। শামসুল হক স্যার আমাকে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য বাছাই করলেন। সে কি আনন্দ। এ কয়টি বছরে জীবনের আকে ঘটনা ঘটেছে। সব বর্ণনা করে লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করে একটি কাহিনী বলে প্রাইমারী স্কুলের স্মৃতি শেষ করতে চাই।
বৃত্তি পরীক্ষা দিতে হবে তাই বাড়িতে পড়া শুনা বেশি করতে হবে। মা বললেন, তোমাদের হেড স্যারকে আমাদের বাড়িতে রাখতে হবে। আমি স্যারকে বলতে তিনি মা’র প্রস্তাবে রাজি হলেন। আমাদের বাড়ির কাছারি ঘরটি ছিল খোলা। সেখানে থাকার মত কোন চৌকি বা খাট ছিল না। তাই মা ঘর থেকে এক খানা চৌকি কাছারি ঘরে আনার কথা বললেন। কিন্তু কে আনবে। মা’র একার পক্ষে তা আনা সম্ভব নয়। দুই একদিন পরে আমার ছোট মামু আমাদের বাড়িতে এলেন। মা ও মামু দুই জনে চৌকিটি মাথায় করে কাছরি তে নিয়ে এলেন। সে দিনের ম’ার কষ্টের কথা স্মরণে এলে আজও লজ্জা ও দুঃখে মনটা কেঁদে ওঠে।
প্রাইমারী স্কুল শেষ হয়েছে এখন আমাকে নিয়ে মা পড়লেন এক দুশ্চিন্তায়। কোথায় পড়াবে আমাকে নিয়ে মা’র ভাবনা। আমি কোথায় পড়ব, কী পড়ব এ নিয়ে আমি কখন কোন মতামত পেশ করিনি। হাই স্কুলে পড়াবার মত, সামর্থ নেই মার। তাই অবশেষে বল্লেন তুই গিয়ে ওলামাগঞ্জ মাদ্রাসায় ভর্তি হই। আমি একদিন ওলামা গঞ্জ মাদ্রসায় গিয়ে এবতেদায়ী প্রথম ক্লাশ দহমে ভর্তি হলাম।
কোরআন পড়া শিখে নিয়ে ছিলাম মা’র কাছে। নামাজের বিভিন্ন দোয়া হতে শুরু করে সূরা ‘দোহা’ পর্যন্ত মার কাছে শুয়ে শুয়ে মুখস্ত করেছিলাম প্রাইমারী স্কুলে পড়ার প্রথম দিকে। তাই আমাকে মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে কষ্ট করতে হয়নি। মাদ্রাসায় বেতন দিয়েছি বলে মনে পড়ে না। তখনও আর্থিক দৈন্যর যন্ত্রণা মাকে পোহাতে হয়েছে। এ মাদ্রাসায় চার বছর পড়া শেষ করে বোর্ড পরীক্ষায ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলাম।
এত দিনে বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পরীক্ষা শেষে বরহাম গঞ্জ কলেজে প্রভাষক হিসেব যোগ দিয়েছেন। আমার ছোট বোন আনোয়ারা অনেক আগেই মারা গেছে। বড় বোনের বিবাহ হয়ে গেল বছর তিনেক হল। মাদ্রাসায় আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় ছোট বোন মনোয়ারা খুব কষ্ট পেয়ে মারা যায়। তখন মনে মনে ভাবছিলাম ভবিষ্যতে ডাক্তার হব। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি।
এখন সংসারে আমি ও মা। বড় ভাই এক দিন বাড়ি এলেন। মা ভাইকে বল্লেন, মনসুরকে এখন কী করবা ? ভাই জবাব দিলেন, আমি মাদ্রাসায় পড়েছি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়লাম। ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেন ভবিষ্যতে দেখা যাক কী করা যায়।
এক দিন ঠিক ঠিক স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। এ সি লাহা বাই লেটারাল হাই স্কুল, আমার বাড়ি থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে। মেঠো পথ পায়ে হেটে সকালে পান্তা খেয়ে স্কুলে পৌঁছে যেতাম সবার আগে। আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরতাম ক্লান্ত হয়ে। আমার কষ্ট দেখে মা বল্লেন, কাল সকালে ভাত রাইন্দা দিমু। তাই খাইয়া স্কুলে যাবি। আমি মাকে বল্লাম, তা করতে হবে না, আমি এ ভাবেই পারমু। কয়েক মাস পরে মা বল্লেন, স্কুলের বোর্ডিং-এ যাইয়া থাক।মার কথা অনুযায়ী হোষ্টেলে এলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমার পক্ষে হোষ্টেলে থাকা সম্ভব হল না। এক মাস থেকে বিছানা পত্র গুটিয়ে চলে এলাম মা’র কাছে। এর কিছু দিন পরে আমার এক বন্ধু আমাকে এক বাড়িতে লজিং ঠিক করে দিল। মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লজিং এ চলে এলাম। এর পরে মা’র কাছে আর স্থায়ীভাবে থাকা হয়নি। তার পরেও অনেক বেদনাময় স্মৃতি আছে। তা লিখে পাঠকদেরকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছা হয় না।
আমার এ কাহিনী পড়ে কেউ বা হাসবে কেউ বা কষ্ট পাবে। তবুও যদি কখন কোন হতভাগা আমার মতন এমন বিপদে পড়ে তবে যেন হতোদ্যম না হয় জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যায় এ আশা নিয়ে এ লেখা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ