রবিবার ১৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউন সরকার কি অটল থাকতে পারবেন?

ড. মো. নূরুল আমিন : ক্ষমতাসীন দল তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের উচ্ছৃঙ্খল, সন্ত্রাসী ও অপরাধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন বলে মনে হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের কাছ থেকে চাঁদা নেয়ার অপরাধে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি এবং ঢাকা মহানগরীতে মদ জুয়ার আসর এবং দেশী-বিদেশী নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা পরিচালনা, কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, টর্চার সেল পরিচালনা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে যুবলীগ ও কৃষক লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার গ্রেফতার প্রভৃতি ঘটনায় রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন যে, সরকারের শুদ্ধি অভিযানের সংকেতটি আপাততঃ পরিষ্কার, তবে লক্ষ্য অর্জনে তা কতটুকু সফল হয় তা আরো সময় না গেলে বুঝা যাবে না। তাদের মতে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ প্রভৃতিসহ লীগ পরিবারভুক্ত সংস্থাসমূহে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার অভাব অত্যন্ত প্রকট। শুদ্ধি অভিযান চালাতে গেলে কম্বলের লোম বাছার মত অবস্থা হতে পারে। লোম বাছতে বাছতে কম্বলই উজাড় হয়ে যাবে এবং এক্ষেত্রে দলটির দেউলিয়া অবস্থার কথা চিন্তা করে হয়তো তাদের সুহৃদরা মাঝপথে অভিযানটি বন্ধ করার ব্যাপারে পার্টি হাইকম্যান্ডকে রাজি করিয়েও নিতে পারেন। কেউ কেউ বলছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে সাম্প্রতিককালে অনেকগুলো পরিবর্তন লক্ষ্য করার মতো। তিনি এখন সততার কথা বলছেন। কবরের কথা বলছেন এবং আখেরাতের কথাও বলছেন। তার এই পরিবর্তনে অনেকে আশার আলো দেখছেন এবং মনে করছেন যে, নিজের এবং দলের ইমেজ রক্ষার জন্য অবশ্যই তিনি শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখবেন।
বলাবাহুল্য, ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের ব্যাপক চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, সীট-বাণিজ্য ও সন্ত্রাস, ব্যভিচার নিয়ে এর আগেও পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোসহ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা এর উপর বিশেষ ক্রোড়পত্রও ছাপিয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে দেশের সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল? সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব হাবিবুর রহমান এদের বাজিকর হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে কিছু হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। কিন্তু এবারের ঘটনা আলাদা। জানা গেছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবার শুদ্ধি অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
দেশবাসীর প্রশ্ন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ কি করেনি অথবা কি করতে বাকি রেখেছে? মাদকাসক্তি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, ব্যভিচার, বিবাহিতা ও অবিবাহিতা মেয়েদের শ্লীলতাহানি, এমনকি শিশু-বৃদ্ধাদের ধর্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির অবৈধ দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধরে এনে টর্চার সেলে নির্যাতন ও হত্যা, নিজ দলীয় কর্মীদের হত্যা ও হয়রানি এবং এখন জুয়ার আসর ও ক্যাসিনো পরিচালনা। শুধু তাই নয়, একটি মুসলিম দেশে এই আসরগুলো পরিচালনা ও বেশ্যাবৃত্তির জন্য বিদেশ থেকে সুন্দরী মেয়েদের আমদানি! সমাজে এমন কোনও অপরাধ নেই যার সাথে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। সকল সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক অপরাধের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও মারাত্মক দেশীয় অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের অপরাধমূলক কাজ করে যাচ্ছে এবং একমাত্র ক্ষমতাসীন দলের সম্পৃক্তির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ছাড় দিচ্ছে। আবার কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য তাদের বদৌলতে গণবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা গৃহঅভ্যন্তরে সাংগঠনিক কোনও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করলে সরকারি গোয়েন্দারা গোপন ষড়যন্ত্র বলে তা আখ্যায়িত করেন, এমনকি ইসলামী বই পুস্তককেও অপরাধ সামগ্রী হিসেবে জব্দ করেন। অথচ বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত মদ, জুয়া ও অনৈতিক কাজের আসর এবং অবৈধ অস্ত্রের প্রকাশ্য ভান্ডার তারা দেখতে পান না। এটা বিস্মিত হবার বিষয়। র‌্যাব কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের কিছু অপরাধীর অপরাধের আখড়া জনসমক্ষে তুলে এনেছেন। কিন্তু তথাপিও প্রশ্ন উঠে এই অভিযান কি চলবে অথবা সার্থক হবে?
গত শনিবার একটি সহযোগী দৈনিক যুবলীগের চার নেতার ছত্রছায়ায় রমরমা ক্যাসিনো তথা জুয়া ‘ব্যবসার একটি রিপোর্ট’ ছাপিয়েছে। পত্রিকাটি তাদের অনুসন্ধানী রিপোর্টের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে, রাজধানীর জুয়ার আসরকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করার মূল উদ্যোক্তা হচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট। তার সহযোগী হচ্ছেন সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঞা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কায়সার এবং মহানগর দক্ষিণের যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ। এদের সকলেই চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন  যে তাদের এই অপকর্ম সম্পর্কে জানেন না তা নয়। বরং তাদের উস্কানী ও প্রশ্রয়েই তারা এখন সরকারকে জিম্মি করে ফেলেছে। তাদের উপর সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের দখল বাণিজ্যের একটি উদাহরণ দিচ্ছি।
১৯৬৯ সাল থেকে ঢাকায় বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লি: নামক একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী কাজ করে আসছে। পত্র-পত্রিকা প্রকাশনা এবং প্রিন্টিং ব্যবসায়ই এর মূল কাজ। মতিঝিলের আরামবাগ এলকায় ৮৯ এবং ৮৯/১ নং হোল্ডিং-এর এই প্রতিষ্ঠানটির একটি নয়তলা ভবন ও দু’টি চারতলা ভবন রয়েছে এবং ভবনগুলো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। বলাবাহুল্য এই কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারের সংখ্যা ৩,৬০০ জন এবং তারাই মূলত: ভবনগুলোর মালিক। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ ২০১৫ সালের পয়লা জুলাই তার দলবল নিয়ে ভবন তিনটি দখল করে নেয় এবং সেখানে অবস্থিত বিপিএল-এর দফতর থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে তাড়িয়ে দেয় এবং অফিসের সম্পত্তি লুটপাট করে নিয়ে যায়।
২/৭/২০১৫ তারিখে বিপিএল কর্তৃপক্ষ মতিঝিল থানার সাথে যোগাযোগ করে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার কল্পে একটি সাধারণ ডায়রী করেন। দুঃখজনকভাবে থানা তাদের ডায়রী সরকারীভাবে গ্রহণ করেনি। তারা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বিপিএল কর্তৃপক্ষ ১৬ আগস্ট (২০১৫) বিষয়টি মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনারের নজরে আনেন এবং তার সাহায্য কামনা করেন। এর কপি আইজিপি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কেও দেয়া হয়। কিন্তু তাদের কেউই জবরদখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপারে কোনও সহযোগিতা করেননি। এরপর ১/১১/১৫ তারিখে বিপিএল-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য কামনা করেন। সিটি মেয়র বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেন; মোমিনুল হক সাঈদকে তার অফিসে ডেকে পাঠান এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কিন্তু বারবার যোগাযোগ করেও কোনও সহযোগিতা না পাওয়ায় ২২/৩/২০১৬ তারিখে তার সাথে আবার দেখা করেন এবং বিষয়টি ত্বরান্বিত করার অনুরোধ জানান। মেয়র মহোদয় তাদের আবেদন অফিসিয়ালী গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়ায় ১৮/১০/২০১৬ তারিখে বিপিএল তার নিকট তৃতীয় দৃষ্টি আকর্ষণী স্মারক প্রেরণ  করেন যা ১৯/১০/১৬ তারিখে তার অফিসে যথারীতি গ্রহণ করা হয়। এরপর মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি তার অপারগতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ মোমিনুল হক সাঈদ গং এতই শক্তিশালী ছিলেন যে, সরকারের কোন অর্গানই তার বা তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিতে সাহস করতেন না। তাদের অপকর্ম সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার কিছুই জানতেন না তা সঠিক নয়। এভাবেই তারা সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সকল ক্ষেত্রে সরকারকে জিম্মি করে সমাজে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও তা বিস্তৃত করে চলেছেন। আশার কথা সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু মাঝপথে যদি রণে ভঙ্গ দেন তাহলে দেশের অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ