বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

অধরাই থেকে যাচ্ছে মাদক ও দুর্নীতিবাজদের গডফাদাররা

গতকাল সোমবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: দুর্নীতির রাঘব-বোয়ালরা ধরা না পড়ায় শুদ্ধি অভিযান ‘আইওয়াশ’ কিনা জনমনে প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন রুহুল কবির রিজভী। গতকাল সোমবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, চারদিকে ডুবে গেছে লুটপাট, খুন, ধর্ষণ, মদ, জুয়া, ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি, অনাচারে। ক্ষমতাসীন সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, হরিলুটে গোটা দেশটা ফাঁপা ফোকলা হয়ে গেছে। এই অবস্থায় একটি ইতিবাচক আলোচনায় থাকতে দুর্নীতি-অনাচারের বিরুদ্ধে আকস্মিক এই অভিযান আইওয়াশ কিনা এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ, আসাদুল করিম শাহিন, মুনির হোসেন প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
রিজভী বলেন, এই অভিযানে যাদের নাম মুখে মুখে তারা কিন্তু এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। কারণ লোক দেখানো এই অভিযানে অধরাই থেকে যাচ্ছেন মাদক ও দুর্নীতিবাজদের গডফাদাররা। প্রশ্ন হলো-অঙ্গসংগঠনের চুনোপুঁটি শামীম (জিকে শামীম) যদি ৯ হাজার কোটি টাকার সরকারি কাজ করে, অফিসে পাওয়া যায় শত শত কোটি টাকা, তাহলে মূল সংগঠনের নেতাদের অবস্থা কি? বড় বড় রাঘব-বোয়াল, রুই-কাতলা-মৃগেলদের কী দশা? মন্ত্রী ও তার উপরের কী অবস্থা, রাষ্ট্র কী আসলে আছে- এটা জনগণের প্রশ্ন।
রিজভী অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন দেউলিয়া করে আওয়ামী লীগ, যুব লীগ নেতাদের ঘরে ঘরে এখন ব্যাংক, টাকশাল বানানো হয়েছে। বিদেশে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার করছে, পাচারের পর উদ্ধৃত্ত টাকা থেকে যাচ্ছে ঘরে। দেশটাকে দেউলিয়া করে দিচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতার আক্ষেপের সেই ‘চাটার দল’। সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের চুনোপুঁটি নেতারা আঙ্গুল ফুঁলে একেকটা বটগাছ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন যুবলীগের নেতারা ঢাকায় চালাচ্ছে ৬০টি ক্যাসিনো, ঢাকার বাইরেও রয়েছে আরো অসংখ্য ক্যাসিনো। যেখানে প্রতি রাতে শত শত কোটি টাকা উড়ছে জুয়ার টেবিলে। মাদক ব্যবসা চলছে দেদারছে। এর পাশাপপাশি অবৈধ নাইট ক্লাব, পানশালা, বাগানবাড়ি এমনকি তাদের ঘরে জুয়া ও মাদকের আসর বসছে। আমরা ছোটবেলায় শুনেছি ঢাকা হচ্ছে মসজিদের শহর, আর এই শহরকে আওয়ামী লীগ সরকার পরিণত করেছে ক্যাসিনো শহরে।
রিজভী বলেন, উন্নয়নের নামে সরকারি প্রজেক্ট নেয়া হয় ৫-১০ গুন খরচে প্রাক্কলন করে। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের মন্ত্রণালয়ে চলছে মহাদুর্নীতি। যেখানে ফোর লেইন রাস্তা নির্মাণে বিশ্বের কোথাও প্রতি কিলোমিটারের ২৮ কোটি টাকার বেশি খরচ হয় না। সেখানে ওবায়দুল কাদের সাহেব এক কিলোামিটারে খরচ করছেন ২০০ কোটি টাকা। এই্ একটি মাত্র নম্বরই বলে দিচ্ছে রাঘব বোয়ালদের লুটপাট হচ্ছে কি মাত্রায়। চুটোপুঁটিরা লুটপাটের ছিটেফোঁটা পেয়ে যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়, তবে বড় নেতারা যে লুটের কুমির তা বুঝতে আর দেশবাসীর বাকি নেই।
ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ-যুব লীগের দুর্নীতি, লুটপাট, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস, টর্চার সেল, নির্যাতন, দখল, চাঁদাবাজী, ক্যাসিনোসহ গুরুতর সব অপরাধের থলের বেড়াল বেরিয়ে আসার কারণে হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়েছেন ওবায়দুল কাদের, মাহবুবুল আলম হানিফ ও হাছান মাহমুদ সাহেবরা। তারা বলছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নাকী দেশে প্রথম জুয়া চালু করেছেন, ঢাকাকে ক্যাসিনো শহর বানিয়েছে নাকী বিএনপি।এই কথা শুনে একটি প্রবাদের কথা মনে পড়ছে-দুর্জনের ছলের প্রয়োজন হয়, দুবৃর্ত্তের প্রয়োজন হয় মিথ্যার। দেশে ক্ষমতাসীনরা কেলেঙ্কারি করলে যখন আর সামাল দিতে পারে না তখন তারা জনগনের দৃষ্টি ভিন্নখাতে নিতে দোষ উদর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপায়। রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে ক্যাসিনো, মাদক, ইয়াবার নাম মানুষ শুনেছে কিনা। তখনও তো আমরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমরা কখনো শুনিনি, শহীদ জিয়ার আমলে ক্যাসিনোর মানেই মানুষ জানতো না। অথচ ক্ষমতাসীনরা অবলীলায় মিথ্যা কথা বলে নিজেদের পাপ, নিজের অপকর্ম অন্যের ঘাড়ে চাপাতে লজ্জা করেনি তাদের, লজ্জার জায়গাটা আওয়ামী নেতারা খুলে ফেলে দিয়েছে। তারা ফেঁসে গেলে সব দোষ হবে বিএনপির।
রিজভী বলেন, জিয়াউর রহমান এদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক আর আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশালের প্রবর্তক। সুতরাং জিয়াউর রহমান ও বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের মৌলিক পার্থক্য আছে। বিএনপি মানে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বিএনপি মানেই জবাবদিহিতা। আওয়ামী লীগ মানে ক্যাসিনো, আওয়ামী লীগ মানে শত শত, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দেশ থেকে পাঁচার। দুর্নীতির ডাক নাম হচ্ছে আওয়ামী লীগ।
রিজভী বলেন, গত একদশকে বাংলাদেশ থেকে ছয় লক্ষ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে , ২০১৮ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা টাকার পরিমান ৫ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। সারাদেশে ঋণখেলাপির পরিমান ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার সংকট, টাকার খোঁজে সরকার। মূলধন সংকটে দেশের ১১টি ব্যাংক। এগুলো হলো রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক; বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফান্ড থেকে আটশো ১০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।নানান ভাবে একেক জন লুটেরা হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে ব্যাংকগুলো ফাঁকা করেছে। ৯টি ব্যাংক ইতোমধ্যে অচল হয়ে গেছে, ৫টি ব্যাংকের এলসি নিচ্ছে না বিদেশীরা। উন্নয়নের নামে সরকারী প্রজেক্ট নেয়া হয় ৫-১০ গুণ খরচে প্রাক্কলন করে। সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদকের মন্ত্রণালয়ে চলছে মহাদুর্নীতি। যেখানে ফোর লেইন রাস্তান নির্মানে বিশ্বের কোথাও প্রতি কিলোমিটারে ২৮কোটি টাকার বেশী খরচ হয় না, সেখানে ওবায়দুল কাদের সাহেব এক কিলোমিটারে খরচ করছেন ২০০ কোটি টাকা। এই একটি মাত্র নম্বরই বলে দিচ্ছে রাঘব বোয়ালদের লুটপাট হচ্ছে কি মাত্রায়। এইসব লুটপাটের টাকা পাচার হয়ে যায় বিদেশে।আর ঘরের টাকশালে থাকে উপচে পড়া সিকি আধুলি। চুনোপুটিরা লুটপাটের ছিটেফোঁটা পেয়ে যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হয় তবে বড় নেতারা যে লুটের টাকার কুমির তা বুঝতে আর দেশবাসীর বাকি নেই।
খালেদা জিয়ার সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে রিজভী বলেন, সম্পূর্ণ নিরপরাধ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের ৫৯২তম কালোদিবস পালিত হলো। ২০ দিন পর গত শুক্রবার দেশনেত্রীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলেন তার স্বজনরা। তাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছে যে, তাকে এখন আর চেনা যাচ্ছে না। কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি যেমন ছিলেন এখন তেমন আর নেই। তার ওজন অনেক কমে যাওয়ায় শুকিয়ে গেছেন তিনি। অসুস্থতায় তিনি হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না। বিছানা অথবা চেয়ারে বসে থাকতে হয়। এ কারণে ওষুধ খাওয়ার পরও তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসছে না। পায়ের ব্যথা কমেনি। কারাগারে গেলেন হেঁটে। অথচ এখন হাঁটতে পারছেন না। হুইলচেয়ারে করে তাকে এদিক-ওদিক নিতে হয়।
রিজভী বলেন, বেগম জিয়া উঠে দাঁড়াতে পারেন না, তার সারা শরীরে ব্যথা। এমনকি হাত দিয়ে মুখে তুলে খেতেও পারেন না। রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারেন না, তার দুই কাঁধ প্রায় ফ্রোজেন, হাতগুলো ফ্রোজেন হয়ে যাচ্ছে। অসুখটা এমন যেটা - ‘ইরিভারসেভেল ডিজিস’ যে ক্ষতিটা হবে তা আর কোনো চিকিৎসাতেই ফিরে আসবে না। তার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আপনি দেশনেত্রীর উপর অনেক অত্যাচার করেছেন এবার ক্ষান্ত দিন, মিথ্যা সাজানো প্রতিহিংসার মামলায় অনেক বেশী শাস্তি দেয়া হয়েছে। এবার দ্রুত তাকে মুক্তি দিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ