মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

কাশ্মীর নিয়ে স্বপ্ন

আসাদ পারভেজ : ১৪০৯ বছর পূর্বে ইসলাম মহান আদর্শের আলোকবর্তিকা নিয়ে পৃথিবীকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এনেছে। নবিজির সিলসিলা মেনে খোলাফায়ে রাশেদিন, মহাবীর সালাহউদ্দিন অতঃপর অটোমান সাম্রাজ্যের মহান শাসকদের মতো কাণ্ডারিদের হাতে শাসিত হয়েছে বিশ্বের অধিকাংশ এলাকা। শৈর্য-বীর্যের শীর্ষে ছিল যে জাতি তাদের আজ কোনো কাণ্ডারির দেখা নেই কেনো?
সকল পরাশক্তিকে ভেদ করে তীলে তীলে সততা, ন্যায় ও সাম্যের যে সাম্রাজ্য গড়ে তোলেছিল, আজ কেন তার এমন বেহাল দশা? কে দিবে উত্তর? কে ধরবে এই সাম্রাজ্যের হাল?
আফগান থেকে আরাকান, উইঘুর থেকে ফিলিপাইন, ফিলিস্তিন থেকে কাশ্মীর কোথায়ও নেই শান্তি কিংবা নিরাপদে মুসলিম নামক মজলুম নিরীহ মানুষগুলো।
ইজরাইল, আমেরিকা, বার্মা, চায়না কিংবা ভারত কেউ তাদের সততার লেশ মাত্র দেখাচ্ছে না মানুষগুলোর জন্য। পাখির মতো করে মারছে তাদের। মানবাধিকার কিংবা বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই তাদের বলতে গেলে নেই। বর্তমান সময়ে বেগমান পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা চলমান কাশ্মীরীদের ওপর। ভারতীয়দের এমন অত্যাচারের বিরুদ্ধে শুধুই কাশ্মীরীরাই প্রতিবাদ করলে কী চলবে? মুসলিম বিশ্ব কিংবা মানবতাবাদি রাষ্ট্রগুলোর করার কি কিছু নেই?
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার স্বল্পকালীন স্বাদ পেলেও রাজা হরি সিং-এর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ৭৩ দিনের মাথায় স্বাধীনতা হারায় ভূস্বর্গ কাশ্মীর। সে থেকে আজ অবধি সেখানে চলছে জুলুম-নির্যাতন। জ্বলন্ত চলমান অস্থিরতার মাঝে চরম অসন্তুষ্টি নিয়ে বেঁচে আছে কাশ্মীরী জনগণ। কিন্তু ভারতীয়দের বুঝতে হবে যে, ভারত সরাসরি কাশ্মীরের ওপর মালিকানা দাবি করতে পারে না।
ভারতের অধিভুক্ত ২৮টি রাজ্য (কাশ্মীরসহ ২৯টি) ও ৭টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মতো কাশ্মীর কোনো রাজ্য নয়। একমাত্র ভারতীয় কনস্টিটিউশনের (সংবিধান) ৩৭০নং আর্টিকেলের ক্ষমতা বলে ভারত কাশ্মীরের ওপর সাময়িক অধিকার লাভ করে মাত্র। যা মাওলানা আজাদের শিষ্য ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরু স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০নং আর্টিকেলের কার্যবিধি অনুযায়ী, কাশ্মীর ভারতের সাময়িক অধিকারে থাকলেও তা এমন এক রাজ্য, যা স্বাধীন স্ট্যাটাসের পূর্ণ অধিকারী এক ভূখ-। উক্ত আর্টিকেলের ক্ষমতা বলে, কাশ্মীরের রয়েছে আলাদা পতাকা ও সংবিধান।
১৯৪৭ সালের ২৫-২৭ অক্টোবর হরি সিং ও মাউন্টব্যাটেনের অজ্ঞতাপূর্ণ কর্মযজ্ঞের মধ্যদিয়ে কাশ্মীরিদের ভাগ্য নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও চীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতে করে ভূস্বর্গ নামক ভূখ-টির মাটি ও মানুষগুলো কমবেশি তিনটি দেশের অধীন। তবে পাকিস্তান ও চীনের আওতাধীন অংশ নিয়ে দুনিয়াজুড়ে কোন সমস্যা বলতে গেলে নেই। যতসব সমস্যা ভারত অধিকৃত জুম্ম-কাশ্মীর নিয়ে। এখানকার মনুষ্য সন্তানরা হয় পূর্ণ স্বাধীন কিংবা পাকিস্তানের অংশ হতে চায়। এতে পাকিস্তানের কোন দোষ আছে বলে মনে হয় কি?
একটি দেশে দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরোধী কিংবা দুর্বল দলটি আহবান করলে শক্তিধর দেশগুলো (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স তথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন) দলটির আহবানে সাড়া দিয়ে দেশটিতে আক্রমণ করে। তাহলে কাশ্মীরের মূল জনসংখ্যা (মজলুম মুসলিম) পাকিস্তানের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতে চাইলে, পাকিস্তান তাদের উদ্ধার করতে আসলে দোষ কী হতে পারে?
জনাব, নেহেরু কাশ্মীর প্রসঙ্গটি প্রথমে জাতিসংঘে উপস্থাপন করেন। এরপর জাতিসংঘের অধীনে গণভোটের বিষয়ে সম্মতিও দেন। একটি দেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা রক্ষা যদি না করেন, তাহলে তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বর্তমানের নেতারা হাস্যকরের পাত্রে যে পরিণত হবেন, তা অবলীলায় বলা যায়।
১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবরের খ-কালীন যুদ্ধের পর ১৯৬৭ ও ১৯৯৯ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বৃহৎ আকারের যুদ্ধ হয়। যে দু’টি যুদ্ধের কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো। এছাড়া কাশ্মীর নিয়ে দেশ দু’টির মধ্যে ছোট-খাটো যুদ্ধ বহুবার হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধে পাকিস্তান কিংবা ভারতের হারানোর কিছু নেই। তারা শুধু শক্তির মোহড়া দিয়ে থাকে। দু’টি দেশই পারমাণবিক বোমার অধিকারী। তাই তাদের মধ্যে বর্তমান সময়ে কোনো নির্ধারক ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই।
রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় নির্বাচন এলেই ভারতের ক্ষমতায় থাকা দলটি কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে একটা সীমিত যুদ্ধের পায়তারা করে, যাতে করে দেশে থাকা (৩৬ কোটি সনাতনী ও ৪৪ কোটি তফসিলি সম্প্রদায়) সাধারণ নাগরিকগুলোকে বিব্রত করে ভোট সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে সীমিত যুদ্ধের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে খেলা হচ্ছে।
আন্তর্জাাতিক এক গোয়েন্দা প্রতবেদনে দেখা যায়, নির্বাচন পূর্বমুহূর্তে বিজেপি তথা মোদি সরকারের পাবলিক সমর্থন অনেক কমছিলো। তাই পাবলিক রেটিং বাড়াতে আরএসএস ও বজরং দলের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলের আর্শীবাদে মোদি সরকার পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগানোর প্রচেষ্টা করে। তাছাড়া ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র বানাবেন বলে একটা মেসেজ দেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালের বৃহস্পতিবার পুলওয়ামা ইস্যুটি এক সুইসাইড বোমা হামলা। জম্মু-কাশ্মীরের গোরিপোরার কাছে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের গাড়ি বহরে সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তি ব্যবহার ভেতর থেকে সরকারি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই কাজকরা হয়েছে একথা এখন ভারতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গই বলছেন।
মোদির সামনে সুযোগ এসে গেল। অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক সংগ্রহ করল কোথায় থেকে। যে রাস্তায় কিছু পথ অন্তর অন্তর একটা চেক পোস্ট রয়েছে, সেখানে বিনা বাধায় আদিল এমন কাজ করল কেমন করে? নাকি মোদি সরকারের কোনো গোয়েন্দা ফাঁদে পড়ে আদিল এমন কাজ করল?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শান্তির আহবান করার পরও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির আচরণে আমরা শান্তির লেশমাত্র পায়নি? উপরোন্ত তিনি অশান্তির নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। পরিকল্পনা মোতাবেক, চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি সরকার রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করে কাশ্মীরের (স্বাধীন স্ট্যাটাসের পূর্ণ অধিকারী ভূখ-) সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। কাশ্মীর এতোদিন চলছিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫(ক) ধারা মতে। যা অঞ্চলটিকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দিয়েছিল।
মূলত সংবিধানের ৩৭০ ধারার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরের ওপর পররাষ্ট্র, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ছাড়া আর কোনো কাজে হস্তক্ষেপ এবং ৩৫(ক) এর কারণে এ অঞ্চলে বাইরের কেউ জমি ক্রয় করতে পারত না। কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার কাশ্মীরের বিশেষ ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার সাথে সাথে অঞ্চলটিকে দু’ভাগে (জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ) বিভক্ত করেন। তার নিজস্ব পতাকা ও সংবিধান কেড়ে নিয়ে অঞ্চলটিকে সাধারণ রাজ্যের চেয়ে কম মর্যাদা দিয়ে কেন্দ্র শাসিত করা হয়, যেখানে পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর।
তাদের কাণ্ড-জ্ঞানহীন কাজে দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের এক চরম লজ্জা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশ (৭ লক্ষ) পূর্বেই সেখানে নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে আরও লক্ষাধিক সেনাদল মিলে প্রায় ৮ লক্ষ সেনাদলের গেরিসনে কোটি মুসলমানের বাস। ভারত জুড়ে হাজার নাগরিকের বিপরীতে একজন নিরাপত্তা সদস্য হলেও কাশ্মীরে তা প্রায় ১০ জনের বিপরীতে ১ জন। তারা আজ সান্ধ্য আইনে জর্জরিত। শিক্ষাঙ্গন বন্ধ, জাতীয় নেতৃবৃন্দ গৃহবন্দি কিংবা গ্রেফতার। কাশ্মীরের প্রত্যেকটি মুসলমান আজ সেনাদের নজরে গৃহবন্দী।
হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার অঞ্চলটিতে ভারতীয়দের মাইগ্রেশন করে মুসলিমদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে চায়। কিন্তু স্থানীয় মুসলমানরা তা কোনো দিন মেনে নিবেনা, তা অকপটে বলা যায়। তাছাড়া পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্ব বিষয়টিকে ভালো দৃষ্টিতে নেয়ার কোনো কারণ নেই। সব কিছু মিলে মোদির নেতৃত্বের উগ্র সরকার ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীরের মজলুম মানুষগুলোর শান্তি যে কেড়ে নিয়েছে তা বিশ্ব রাজনীতির জন্য কোনোভাবেই ভালো হবে না।
খোদ বিজেপি সরকারের অংশীদার সংযুক্ত জনতা দল বিজেপির এমন আচরণে ক্ষুদ্ধ এবং কেরল কংগ্রেস, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, এএপি, বামদলগুলো, এসপি, ডিএমকে ও কংগ্রেস বলছে সরকারের এমন আচরণ দেশের খ-তাকে বিনষ্ট করবে। কাশ্মীরের এনসিপি নেতা ওমর আবদুল্লাহ ও হুররিয়াত কনফারেন্সের নেতা শাহ গিলানি বলেন, তাদের জীবন থাকতে-এর বিরোধিতা করবেনই। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা পি চিদাম্বরম বলেন, মোদি সরকার যা করেছে এবং করে যাচ্ছে তা দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি ও লজ্জাজনক।
অশান্তির চাদরে মোড়ানো মোদি সরকারের মাঝে শান্তির মেধা বিকশিত হবে। একই সাথে জাতিসংঘ, ওআইসি’সহ মানবতাবাদী ও ন্যায়ের আদর্শিক দেশগুলো দায়বদ্ধতার দায়িত্ব থেকে একদিন ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীরের নিরীহ জনগণের পক্ষে মডেল হিসেবে কাজ করবে। এতে করে কাশ্মীরের মজলুম বাসিন্দারা স্বাধীনতার অমিয় স্বাদ পেয়ে বিশ্বকে সাধুবাদ জানাবে বলে অনেকের সাথে আমিও বিশ্বাস করি। 
লেখক : গবেষক ও গ্রন্থাকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ