মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

শিশুদের প্রতি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : একশ্রেণির গর্দভ মানুষ মেয়েদের নানাভাবে খাটো করে দেখেন। পুরুষদের চেয়ে হীন বা নিচ মনে করেন। তাঁদের ‘মানুষ’ ভাবেন না। মনে করেন ‘মেয়েমানুষ’। অথচ মেয়ে বা নারী না হলে পুরুষদের জীবন সম্পন্ন হয় না। পূর্ণতা পায় না। এ মহাসত্য বিস্মৃত হয়েই গর্দভ পুরুষ অঘটন ঘটিয়ে বসেন। বিপদে পড়েন।
যেসব গর্দভ পুরুষ নারীর ওপর জুলুম চালান, নির্যাতন করেন, তাঁরা কিন্তু নারী না হলে পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারতেন না। নারীর স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতেন। মা, বোন, দাদি, নানি, খালা, ফুফু, কন্যা এরা সবাই নারী। স্নেহ-মমতার আধার। প্রেম-ভালোবাসা ও সম্প্রীতির কেন্দ্রবিন্দু। যেবাড়িতে কোনও নারী নেই, সেটা বাড়ি নয়। যেখানে নারী নেই সেখানে আল্লাহর রহমত নেই। দয়ামায়া সৃষ্টি হয় না নারীর পবিত্র স্পর্শ ব্যতীত। নারী না হলে মানুষ জন্ম নিতো কোত্থেকে? 
গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মেয়ে বলেই পায়ে পিষে হত্যা!’ শীর্ষক একটি নিউজ ছেপেছে। এটি পাঠিয়েছেন পত্রিকাটির সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার মুকন্দগাতিতে ৯ মাস বয়সী শিশু সুমাইয়া খাতুনকে তার বাবা পা দিয়ে পিষে হত্যা করবার পর ডোবায় ফেলে দিয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ভোরে উপজেলার মুকন্দগাতি পশ্চিমপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে ঘাতক বাবা বদিউজ্জামান পলাতক। জানা যায়, প্রথম মেয়ের পর দ্বিতীয় এ মেয়েটি জন্ম নেয়াতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবা শিশুটিকে হত্যা করেন।
বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, সাত বছর আগে তাঁতশ্রমিক বদিউজ্জামানের সঙ্গে পাবনার চাটমোহরের মির্জাপুর গ্রামের সিকেন্দার আলীর মেয়ে সুন্দরী খাতুনের বিয়ে হয়। কয়েক বছর আগে তাঁদের সংসারে একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। এ নিয়েও সংসারে অসন্তোষ চলছিল।
এরপর একটি ছেলে সন্তানের আশা করে আরেকটি বাচ্চা নেন। কিন্তু তাঁদের সংসারে আরও একটি মেয়ে জন্ম নেয়। নাম রাখা হয় সুমাইয়া খাতুন। সুমাইয়ার বয়স হয়েছিল নয় মাস। পরপর দুটি মেয়ে জন্ম হওয়াতে বদিউজ্জামান প্রায় স্ত্রীকে ও দুই সন্তানকে অত্যাচার নির্যাতনসহ বকাবকি করতেন।
এমনকি প্রায়ই শিশু সুমাইয়াকে হত্যা করবার কথা বলতেন। এ অবস্থায় ঘটনার দিন ভোরে বদিউজ্জামান শিশু সুমাইয়ার বুকের ওপর পা রেখে পিষে তাকে হত্যা করে বাড়ির পাশে ডোবায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘাতক বদিউজ্জামানকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।
একজন বাবা বুকে পাচাপা দিয়ে তাঁর ঔরসজাত শিশুকন্যাকে পিষে মারবেন তা যেন বর্বর যুগকেও হার মানিয়েছে। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয় এ যুগে দুধের কন্যাশিশুকে কোনও বাবা এমন নির্দয়ভাবে হত্যা করতে পারেন!
শিশু সুমাইয়ার গর্দভ বাবা বদিউজ্জামান জানেন না, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন নারী, যিনি দাপিয়ে দেশ শাসন করে যাচ্ছেন। কারুর সমালোচনার পাত্তা দিচ্ছেন না। অনেকটা গৃহপালিত হলেও রওশন এরশাদ বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে পার্লামেন্টে থেকে ক্ষমতার ভাগ বসিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া অযৌক্তিক মামলায় এখন কারান্তরালে থাকলেও প্রায় তিন টার্ম এদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইমেলদা ছিলেন ফিলিপাইনের ক্ষমতাধর নেত্রী। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা একজন নারী। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন নারী। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির নাম কে না জানেন? বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে তো সবাই চেনেন। জার্মানির চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল একজন নারী। ব্রাজিলেও একজন নারী প্রধানমন্ত্রী নাকি প্রেসিডেন্ট। বলতে গেলে বিশ্বের অনেক দেশেই নারীরা দাপটের সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন। এছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশে মহিলারা মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপি, ইউএনও, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, হেডমাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, আর্কিটেক্ট, সফল ব্যবসায়ী হিসেবে দেশ ও জাতির খেদমত করে যাচ্ছেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারীদের সাফল্যও বেশি। এরপরও গর্দভ বদিউজ্জামান তার শিশুকন্যা সুমাইয়াকে শুধু মেয়ে হবার কারণে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেন কেন? ওর বড়মেয়েকেও হত্যার হুমকি দিয়েছেন হতভাগ্য লোকটি।
মেয়েরা আজকাল সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন। বিমান চালাচ্ছেন। পুলিশের উচ্চপদে ভূমিকা রাখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হচ্ছেন। রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়ে বিদেশে বাংলাদেশ মিশন এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কোথায় নেই আমাদের মেয়েরা? এরপরও মেয়েদের যারা ছোট করে দেখেন তাঁরা আসলে নিজেরাই মানুষ নন। সভ্যতার ছোঁয়া তারা পাননি।
তবে হ্যাঁ, একশ্রেণির নরপশু মেয়েদের প্রতি যেমন রুঢ় আচরণ করে, তেমনই অনেক মেয়ে তাদের হাতে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষত গরিব এবং নিরক্ষর ও কম শিক্ষিত পরিবারের নারীশিশুরা বেশিরভাগই দুর্ভাগ্যের শিকার হচ্ছে আজকাল। যেমন ধরুন, দরিদ্র বাবা বিয়ের বয়সী মেয়েকে পাত্রস্থ করাতে পারছেন না। পড়ালেখাও করাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে মেয়েটি আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিচ্ছে। শিশুমেয়েটিকে কারুর বাসায় কাজ করতে দিয়েছেন, সেই গৃহকর্তা কিংবা সে বাসার কোনও যুবক একা পেয়ে শিশুটির শ্লীলতাহানি করে বসছে। কখনও কখনও হতভাগ্য শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়ছে। এমন ঘটনা এ দেশে প্রতিদিন ঘটছে। সবাই আইনের আশ্রয়ও নিতে পারছেন না। আবার দুষ্কর্ম ফাঁস হয়ে যাবে এর ভয়ে অনেক শিশুকে মেরে ফেলছে বা গুম করছেন প্রভাবশালী গৃহকর্তা এবং তাঁদের লোকজন। এমনই দুঃসহ বহু ঘটনা ঘটছে সমাজে।
সিরাজগঞ্জের বদিউজ্জামান ৯ মাসের শিশুকন্যাকে কেন নির্মমভাবে হত্যা করলেন জানি না। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে পরপর দুটো কন্যাশিশু জন্ম নেয়ায় এ কাম করেছেন লোকটি। এছাড়া তাঁর হয়তো চিন্তা ছিল, ছেলে হলে তার কাজে সহায়তা করতে পারতো। কিন্তু মেয়েতো পারবে না। বিয়ে দিতে যৌতুক লাগবে। এ ছাড়া বিয়ে দেয়া কোনওভাবে সম্ভব হলেও বারবার জামাইদের চাহিদার জোগান দিতে হবে। কিন্তু ছেলে হলে হতো উল্টো। যৌতুক পাওয়া যেতো। আবদার করলেই বউরা বাবার বাড়ি থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। তবে সে আশার গুড়ে বালি। তাই শিশুমেয়েকে লোকটি হত্যা করেছেন। অন্যটিকেও মেরে ফেলতে চেয়েছেন। অথচ মেয়েরা বড় হলে ছেলেদের চাইতেও বাবার সহায়তা করতে পারে এমন চিন্তা তাঁর মাথায়ই আসেনি। ফলে শিশুকন্যার বুকে পাচাপা দিয়ে পিষে মারবার মতো ন্যক্কারজনক কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, মেয়ের বিয়ে হলে অন্যের ঘরে চলে যাবে। তাই মেয়ে প্রতিপালন করে বা পড়ালেখা শিখিয়ে লাভ কী! মেয়েতো বাবার উপকারে লাগবে না। কিন্তু আজকাল ছেলের বিয়ে দিলেওতো বউ নিয়ে অন্যত্র চলে যায়। উল্টো করে বললে বলতে হয়, বউই ছেলেকে নিয়ে যায়। কী যায় না? তবে ব্যতিক্রমও থাকে। সব ছেলে বউয়ের কথায় মা-বাবাকে ফেলে যায় না। যেতে পারে না। হ্যাঁ, মা-বাবা যদি ছেলের বউকে মেয়ের মতো করে দেখেন, তাহলে বউরাও কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়িকে মা-বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারে। এটা নির্ভর করে সমোঝতার ওপর।
মেয়েশিশুরা আল্লাহর নিয়ামত। এরা মা-বাবাকে যতটা ভালোবাসে ছেলেদের পক্ষে তা অনেকসময়ই সম্ভব হয় না। অথচ একশ্রেণির গর্দভ মানুষ মেয়েশিশুদের জন্মের পরপরই হত্যা করেন। ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে শেয়াল-কুত্তা দিয়ে খাওয়ান। উঁচু ভবন থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করতেও দেখা যায় সদ্যজাত মেয়েশিশুদের। এর চাইতে অমানবিক আর দুর্ভাগ্য কোনও মানবশিশুর জন্য হতে পারে না। এমন অমানবিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের রুখে দাঁড়ানো উচিত।
শিশুরা মেয়ে হোক আর ছেলে হোক ফুলের মতো নিষ্পাপ এবং নিরপরাধ। সুষ্ঠু ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকবার অধিকার সকল শিশুরই রয়েছে। কিন্তু এক শ্রেণির নরপশু বিশেষত সিরাজগঞ্জ জেলার মুকন্দগাতির বদিউজ্জামান নিজের কন্যাসন্তান ৯ মাসের সুমাইয়াকে যেভাবে পায়ে পাড়া দিয়ে পিষে মেরেছেন তা আদিম যুগের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। বিবেকসম্পন্ন কোনও বাবা এমন কাজ করতে পারেন না। তাই বদিউজ্জামান হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মস্তিষ্কবিকৃত মানুষ অথবা পারিবারিক ও সামাজিক কারণে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত। লোকটিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে নিরাপদ স্থানে রেখে চিকিৎসা করানো দরকার। কারণ সুযোগ পেলে লোকটি তাঁর বড় মেয়েকেও হত্যা করবেন। এমন হুমকিও তিনি ইতোমধ্যে দিয়েছেন।
পরপর দুটো মেয়েশিশু জন্ম নেয়াতেই বদিউজ্জামান সুমাইয়াকে হত্যা করেছেন প্রাথমিকভাবে এমন খবর পাওয়া গেলেও অন্য কারণও থাকতে পারে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, এমনকি মেয়েদের সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণাও দায়ী হতে পারে এমন নিষ্ঠুরতার পেছনে। তাই মেয়েশিশুদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা ও মানসিকতা যাতে সমাজে কারুর না থাকে তা নিরসনে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি। পাঠ্যপুস্তকেও এ বিষয়ে পাঠসংযোগ করা যেতে পারে। কারণ মেয়েশিশুদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা ও অন্যায় আচরণ  দূরীকরণে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু বিষয়টি এখনও অনেকটাই উপেক্ষিত। ফলে আমাদের শিশুরা বিশেষত মেয়েশিশুরা নিষ্ঠুরতাসহ হত্যার শিকার হচ্ছে  হরহামেশাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ