বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কলিজার টুকরা

সুমাইয়া আফরোজ : নতুন বৌ এর রিনিঝিনি হাসির শব্দ শুনে ঘরের দিকে এগিয়ে এলো রাহেলা।
নতুন বৌ মানে একেবারে নতুন নয়, বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে বিয়ের পর।
তবে রাহেলার ঘরে সে আজও নতুন।
টানা দু তিন মাস প্রতীক্ষার পর ছেলে-বৌ এর পদধূলি পড়ে রাহেলার মাটির ঘরে।
বৌ মা, ও বৌ মা...
হাঁকডাক করতে করতে ঘরে ঢুকে পড়ল রাহেলা,
নতুন বৌ এর হাসি ততক্ষণে মিলিয়ে এসেছে।
... কিছু বলবেন মা?
... কি আর বলব বাছা, তোমাদের কাছে দু দন্ড কতা না কয়ে বসে থাকলেও মনের মধ্যে শান্তি পাই।
... তা বসেন না, আমাদেরও ভালো লাগবে।
তবে নতুন বৌ এর চোখেমুখে ভালো লাগার কোন লক্ষণ দেখা গেলো না,
বরং বরের সাথে বিকেলের আড্ডায় বাধা পড়ায় যেন মনোক্ষুন্নই হয়েছে কিঞ্চিৎ।
যাই হোক শিক্ষিত বৌ এর চোখমুখের সে ভাষা পড়া অশিক্ষিত রাহেলার সাধ্য নয়।
তাই সে মহা উৎসাহে ছেলে বৌ এর পাশে বসে গল্প শুনাতে লেগে গেলো।
মায়ের বাকপটুতায় ছেলে বিব্রত বোধ করতে লাগল বৌ এর সামনে।
আর সেই সাথে মায়ের গল্পগাথার পুরনো দিনের অভাব অনটনের অধ্যায় তার আত্মসম্মানে ঘা দিতে লাগল বারবার।
মায়ের মূর্খতায় ছেলের মুখে প্রচন্ড বিরক্তির ছাপ,
তবে রাহেলার উৎসাহে তাদের বিরক্তি ভাটা ফেলতে পারে না।
সে আজ কতদিন পর ছেলেটাকে কাছে পেয়েছে,
মনের আবেগ বাধা মানে না।
দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর রাহেলা বোঝে শ্রোতাদের যথেষ্ট মনযোগের অভাব।
অশিক্ষিত হলে এতে সে অপমানিত বোধ করে ভীষণরকম।
অনেক কাজ আছে বলে উঠতে চায় আর আশা করে ওরা বলুক,
... মা আরেকটু বস, তোমার গল্প শুনতে বেশ লাগছে।
কিন্তু না ওরা তা বলে না।
বরং তার চলে যাওয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলে,
... হ্যাঁ মা, ঝটপট কাজ সারো, বেলা তো নেই বেশি।
কথা শুরু করলে তো আর কিছু মনে থাকে না, তা যাও এবার ওদিকে দেখো গে...
আবারো আশা ভঙ্গ ঘটে রাহেলার।
মন ভরা দুঃখ নিয়ে যায় হেঁসেলে।
কাঠ আর তুষের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উনুন।
তার চেয়েও তীব্র দহনে দগ্ধ হয় মাতৃহৃদয়।
সন্ধ্যা নামে,
সে ফিরে যায় অতীতে,
ঐ তো সেবার যখন ছেলেটা অসুখে পড়ল ...
রাহেলাকে সে কিছুতেই ছাড়ে না,
ঘরের কাজেও যেতে দেয় না,
কেবলি আঁচল ধরে মরার মত পড়ে থাকে বিছানায়,
রাহেলা কত যে চোখের পানি ফেলে আর কত জায়গায় মানত করে ...
সেসব কথা ভাবতে যেয়েও চোখ জলে ভরে আসে তার।
ছেলে বেরিয়েছে বৌ কে গ্রাম ঘুরে দেখাতে,
আর রাহেলা অপেক্ষা করছে তার স্বামী আব্বাসের জন্য।
জমির কাজ শেষে আব্বাস ঘরে ফেরে ভেজা কাপড়ে।
রাহেলা প্রতিদিনের মত গামছা কাপড় রেডী রাখতে পারে না,
স্বামীর দিকে চোখ পড়েই তার ভেতরের বেদনার মেঘ ঝড়ো হওয়ায় পরিণত হয়,
ডুকরে কেঁদে ওঠে রাহলা।
... নবাবের বেটি এসে আজ মহারাণী হয়ে গেছে, আর আমি যে তিল তিল করে পোলা মানুষ করছি তার কোন দাম নাই?
বৌ পেয়ে আজ মা পর হয়ে গেলো?
এই দিন দেখার আগে আল্লাহ আমার মরণ দিল না ক্যান??
হতবম্ভ হয়ে গেলো নিরীহ মানুষ আব্বাস মিঞা।
বৌ এর কাছে এগিয়ে গিয়ে শান্তুভাবে বলে ফেললো,
কাইন্দা আর কি লাভ রাহেলা,
পোলারা বড় হইলে অমনি হয়, মায়ের কথা আর মনে থাকে না।
দেখো না,
আমি কেমন ‘মা’ ছাড়া এতবছর আছি,
বছরে দু একবার খোঁজ খবর নিতেও মনে থাকে না।
আসলে এত কাজকাম যে...
এই খোঁচা সহ্য করতে পারে না রাহেলা,
অগ্নিমূর্তি হয়ে বলে ওঠে,
কি কইতে চাও তুমি?
তোমার মা রে কি আমি তাড়াইছি?
সে তো নিজের ইচ্ছায় তার মাইয়ার বাড়ি থাকতে গেছে, আমি তো জোর করে তাড়াই নাই।
... তুমি জোর করে তাড়াও নাই রাহেলা, তবে জোর করলে তারে এখানেই রাইখা দিতে পারতে।
... নিজের মা রে রাখার নিজের ক্ষ্যামতা নাই আর আমার ঘাড়ে দোষ দ্যাও?
নিয়ে আসো গিয়া,
আমি কি বাধা দিছি কখনো?
... না বাধা তুমি দ্যাও নাই,
তোমাকে দোষও আমি দেই নি,
তাই বলি কি ছেলের বৌ রেও তুমি কিছু বলো না,
এইটা জগতের ই নিয়ম...
আরেকবার ধাক্কা খায় রাহেলা।
পরদিন দুপুরবেলা ননদের বাড়ি হাজির হয় কাওকে কিছু না বলে,
বাড়ির বারান্দায় ছোট্ট পাটিতে শুয়ে থাকা শাশুড়ির ক্ষীণ শরীর মায়া জাগিয়ে তোলে তার মনে।
কাছে গিয়ে শাশুড়ির হাত চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে,
... আম্মা আমারে মাফ কইরা দ্যান,
আল্লাহ আমার মা বাপ রে নিয়া নিছে,
আপনিই আমার মা,
যে কয়দিন আল্লাহ বাঁচায় রাখে আমি আপনারে নিজের কাছে রাখতে চাই, আম্মা আমারে মাফ কইরা দেন।
আমি আপনারে নিয়া যাইতে চাই।
এমন ছেলে বৌ এর এমন অপ্রত্যাশিত আচরণে বিস্মিত হয় বৃদ্ধা।
আবেগে কাঁদতে থাকে সেও,
আমি যাইতে চাই বৌ মা,
মাইয়ার শাশুরবাড়ি কখনো নিজের হয় না,
খাইয়া থাকি, না খাইয়া থাকি আমি আমার আব্বাসের ঘরেই থাকতে চাই।
তুমি আমারে নিয়া চলো বৌ মা।
ঐ পোলাই আমার কলিজার টুকরা।
আমি আজও সারারাত চোখ বন্ধ করতে পারি না,
আমার কলিজার টুকরারে ছাড়া আমি থাকপার পরি না...
অতপর বিকেল বেলা এক অসহায় মায়ের হাতে হাত রেখে আরেক অসহায় মা আনন্দিত মনে কলিজার টুকরার ঘরে ফেরে।
যখন ভোরের সূর্য হাসিমাখা মুখ নিয়ে রাহেলার উঠানে উঁকি দিতে লাগল তখন তার ছেলে, বৌ ব্যাগপত্র নিয়ে ইতস্তত মুখে রাহেলার ঘরে ঢুকে পড়ল,
... কিছু মনে করো না মা,
কয়েকদিন থেকে গেলে আমাদেরও ভালো লাগত, কিন্তু এখানে যা লোডশেডিং!
আর এর মাঝে আবার দাদীর নতুন উৎপাত,
ও তো এসবে অভ্যস্ত না তাই...
... আমাকে নিয়ে আর ভাবিস না বাপ, দুই উৎপাতে মিলে আমাদের সময় দিব্যি কেটে যাবে, তোরা ভালো থাকিস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ