বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

যৌতুকের অভিশাপ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ

সেলিনা শৈরে : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ঘটনা-নয়। ০৭ মে ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম-যৌতুকের জন্য গৃহবধূর চুল কেটে নির্যাতন, স্বামী গ্রেপ্তার। রাজশাহীর মোহনপুরে স্বামীর চাহিদামতো যৌতুক দিতে না পারায় এক গৃহবধূর চুল কেটে নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্যাতনের শিকার গৃহবধূকে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনায় গৃহবধূর স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নির্যাতনের অভিযোগে গৃহবধূর বাবা বাদী হয়ে সোমবার রাতে মোহনপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে মোহনপুর উপজেলার সিন্দুরী গ্রামের এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয় নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর। বিয়ের দেড় বছর পর থেকে যৌতুকের জন্য প্রায়ই ওই গৃহবধূকে নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী। মেয়ের কথা ভেবে তিন দফায় যৌতুক হিসেবে জামাতাকে ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দিয়েছেন গৃহবধূর বাবা। কিন্তু এরপরেও যৌতুকের জন্য গৃহবধূর ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। গত ৩০ এপ্রিল ১ লাখ টাকা যৌতুক আনার জন্য ওই গৃহবধূকে চাপ দেন তাঁর স্বামী। কিন্তু টাকা না আনায় প্রথমে তাঁকে মারধর করা হয়। এরপর তাঁর চুল কেটে দেওয়া হয়। নির্যাতনের খবর পেয়ে গৃহবধূর বাবা তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
ঘটনা-দশ। ২৪ মে ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম-যৌতুক না দেওয়ায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন মাহমুদা। যৌতুকের জন্য নিয়মিত চাপ দেওয়া হতো মাহমুদা খাতুনের ওপর। সম্প্রতি ব্যবসার জন্য মাহমুদার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন তাঁর স্বামী। কিন্তু টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় নির্যাতনের শিকার হতে হলো তাঁকে। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পর গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল তাঁকে। গুরুতর আহত অবস্থায় মাহমুদা এখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটেছে পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের দড়িসরদিয়া গ্রামে। নির্যাতনের ঘটনায় মাহমুদার ভাই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে স্বামীসহ ৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। ঘটনার পর থেকে মাহমুদার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পলাতক আছেন। মাহমুদার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে একই গ্রামের পিন্টু মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় মাহমুদার। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে মাহমুদার কাছে টাকা দাবি করতে থাকে পিন্টুর পরিবার। চাহিদা অনুযায়ী বেশ কয়েকবার টাকা দিলেও আবারও টাকা চাওয়া শুরু করেন পিন্টু। সম্প্রতি ব্যবসার জন্য মাহমুদার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন পিন্টু। কিন্তু মাহমুদা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুজনের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে টাকার জন্য পিন্টু ও তাঁর পরিবারের লোকজন মাহমুদার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান। একপর্যায়ে তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে রাত দুইটার দিকে মাহমুদার পরিবারের লোকজন এসে তাঁকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মাহমুদার ভাই মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধুমাত্র যৌতুকের জন্যই আমার বোনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার বোন এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। আমরা এর বিচার চাই।’
ঘটনা-এগার। ২৭ জুন ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম- গাছে বেঁধে স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামীসহ চারজন গ্রেপ্তার। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে এক গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত বুধবার রাত ১২টার দিকে একটি মামলা হয়েছে। মামলার পর স্বামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর নাম স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার। তাঁর স্বামীর নাম মাজেদ ফকির। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান আছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গৃহবধূর স্বামী মাজেদ ফকির, শ্বশুর টগর ফকির, ভাশুর শাহজাহান ও তাঁর স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ও গৃহবধূর পরিবার সূত্রে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে মাদারগঞ্জ পৌর শহরের চরবওলা গ্রামের দুদু প্রামাণিকের মেয়ে ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে একই উপজেলার বালিজুড়ি গ্রামের মাজেদ ফকিরের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় বরকে আসবাবসহ বিভিন্ন জিনিস যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার ঈদের আগ থেকে ইয়াসমিনের কাছে আরও তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন মাজেদ। টাকা দিতে না পারায় মাজেদ ইয়াসমিনকে বিভিন্ন সময় নির্যাতন করতেন। গত মঙ্গলবার সকালে যৌতুকের টাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে মাজেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াসমিনকে প্রথমে মারধর করেন। এরপর বাড়ির আঙিনায় থাকা একটি সুপারি গাছে বেঁধে রাখেন। এ সময় লোহার রড দিয়ে ইয়াসমিনকে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ইয়াসমিন গুরুতর আহত হন। খবর পেয়ে বাবার বাড়ির লোকজন ইয়াসমিনকে উদ্ধার করেন। ওই দিনই তাঁকে মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। গৃহবধূর বাবা দুদু প্রামাণিক বলেন, ‘আমি কৃষক মানুষ। বিয়ের সময় নগদ এক লাখ টাকা, তিনটি গরু, একটি মোটরসাইকেল ও ঘরের সব আসবাবপত্র দিয়েছিলাম। তাঁদের সংসার ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে ছোট ঈদের আগে দোকান দেওয়ার জন্য আমার কাছে তিন লাখ টাকা চান। আমি দিতে পারেনি। এর পর থেকে আমার মেয়ের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল। এর আগে একবার আমার মেয়েকে ব্যাপক মারধর করে হাতের দুই আঙুল ভেঙে দিয়েছিল। এবার গাছে বেঁধে লোহার রড দিয়ে ব্যাপক মারধর করেছে।’ মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মাদারগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যৌতুকের জন্য অমানবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ইয়াসমিনের অভিযোগ পেয়েই আমরা মামলা নিয়েছি। তাঁর স্বামী, শ্বশুরসহ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।’
ঘটনা-বার। ০৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম-স্ত্রীর যৌতুকের মামলায় পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে। নারায়ণগঞ্জে আইনজীবী স্ত্রীর যৌতুক ও নির্যাতনের মামলায় পুলিশ পরিদর্শক স্বামী আবু নকিবকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। নারায়ণগঞ্জ জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে আবু নকিব আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন জানালে শুনানি শেষে বিচারক শাহীন খন্দকার তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাসমিন আহমেদের সঙ্গে ২০০৭ সালের ১৪ মে আবু নকিবের ১০ লাখ এক হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে ৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে দুই দফায় জাসমিনকে মারধর করে গুরুতর আহত করেন স্বামী নাকিবসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ ঘটনায় আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন জাসমিন। জাসমিন আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘যৌতুক না পেয়ে প্রায় সময় আবু নকিব ঘুমের মধ্যে আমার গলা টিপে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করতেন। এর প্রতিবাদ করলে কোমরের বেল্ট ও পায়ের বুটজুতা দিয়ে আমাকে মারধর করতেন তিনি। এ ছাড়া আবু নকিব গোপনে আরও দুটি বিয়ে করেছেন। সম্প্রতি আমাকে মারধর করে আবু নকিব পাঁচ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়েছেন।’ এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, আবু নকিব নৌপুলিশে পরিদর্শক হিসেবে মিরপুরে কর্মরত। নারী নির্যাতন মামলায় তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
ঘটনা-তের। ০৫ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক কারাগারে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে এক মাদ্রাসার শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা বিচারিক হাকিম আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম কালিম উল্যাহ (৩৭)। তিনি সুরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আল-আমিন নুরানি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক। তাঁর গ্রামের বাড়ি পার্শ্ববর্তী সিরাজপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর বিরুদ্ধে স্ত্রী নুর জাহান বৃহস্পতিবার রাতে থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, কালিম উল্যাহ প্রায় ১২ বছর আগে নুর জাহানকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে প্রায়ই নানা অজুহাতে তিনি স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন। এর মধ্যে কিছুদিন আগ থেকে যৌতুক দাবি করে তিনি নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন। কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
ঘটনা-চৌদ্দ। ০৯জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম-‘খাটের নিচ থেকে লাশ নিয়া দাফন কইরো’। যৌতুকের জন্যই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শারমিন আক্তারকে হত্যা করেছিলেন তাঁর স্বামী আমির হোসেন। হত্যার পর শাশুড়িকে ফোন দিয়ে মেয়ের লাশ নিয়ে যেতে বলেন তিনি। চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমির হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানায় পুলিশ। রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন এসব তথ্য জানান পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি)  বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, ১ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেটের পাশে সাদেক খান রোডে একটি বাসায় খুন হন শারমিন আক্তার। তাঁর মুখে স্কচটেপ লাগানো ছিল। পায়ের রগ কাটা ছিল এবং শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। স্বামী আমির হোসেনের সঙ্গে ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। ঘটনার পর আমির পালিয়ে যান। শারমিনকে প্রথমে উদ্ধার করে শ্যামলীতে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান ওই বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিনই আমির হোসেনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন শারমিনের বাবা। পরে মামলার তদন্ত ভার পায় পিবিআই। ঘটনার পরে আমির চট্টগ্রাম ইপিজেডে একটি বাসায় লুকিয়ে ছিলেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে গতকাল বিকেলে ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে আমিরকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। পিবিআইয়ের ডিআইজি বলেন, যৌতুকের জন্যই এই হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। গত ৩০ জুন শারমিনের কাছে ১০ হাজার টাকা যৌতুক চান আমির। শারমিন তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমির ১ জুলাই সকালে তাঁর শাশুড়ি ফজিলাত বেগমকে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। তা না হলে মেয়েকে হত্যা করে খাটের নিচে ফেলে রাখবেন বলে জানান তিনি। শারমিনের মায়ের বাসা মোহাম্মদপুরের নবীনগরে। পরে ওই দিন ভোররাতে আমির শারমিনকে হত্যা করে শাশুড়িকে ফোন করে বলেন, ‘টাকা তো দিলা না, খাটের নিচ থেকে লাশ নিয়া দাফন কইরো।’ এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ ফজিলাত বেগমকে ফোন করে পঙ্গু হাসপাতালে আসতে বলে। সেখানে গিয়ে মেয়ের লাশ পান তিনি। বনজ কুমার মজুমদার বলেন, আমির এর আগেও দুটি বিয়ে করেছিলেন। যৌতুকের জন্য বিয়ে করতেন। বিয়ে করে কাবিননামা গোপন করে আবার বিয়ে করতেন তিনি। শারমিনের মা ফজিলাত বেগম প্রথম আলোকে জানান, তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে শারমিন ছোট। ফোনে আমিরের সঙ্গে পরিচয় হয় শারমিনের। তাঁরা বিয়ে করেন। অনেক দিন ধরে মেয়ের খোঁজ পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে এক মাস আগে মেয়ের খোঁজ পান। আমির প্রায়ই যৌতুকের জন্য শারমিনকে মারধর করতেন। একবার অনেক কষ্ট করে ছয় হাজার টাকা দিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনা-পনের। ১৪ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম যৌতুক মামলায় স্বামীর দুই বছরের কারাদ-। ফেনীতে স্ত্রীর করা যৌতুকের মামলায় এক ব্যক্তির দুই বছরের সশ্রম কারাদ- দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন এ রায় দেন। সাজা পাওয়া ব্যক্তির নাম মো. রবিউল হোসাইন (৩০)। তিনি চট্টগ্রামের ডাবলমুরিং থানার আসকারাবাদ এলাকার বাসিন্দা। ফেনীতে আদালত পুলিশের জিআরও (সাধারণ নিবন্ধন) উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ উল্যা রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আসামির অনুপস্থিতিতে এই রায় দেওয়া হয়েছে। মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের রাশেদা আক্তারের সঙ্গে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর মো. রবিউল হোসাইনের বিয়ে হয়। ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর রবিউল বিদেশ যাওয়ার জন্য স্ত্রী রাশেদার ভাইয়ের কাছে ৪ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় রাশেদাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন রবিউল। সম্প্রতি রবিউল চট্টগ্রামে আরও একটি বিয়ে করেন। এরপর রবিউলের বিরুদ্ধে রাশেদা একটি মামলা করেন।
একটি জাতীয় দৈনিকের ২০ মে ২০১৯ তারিখের রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকায় যৌতুকের কারণে বছরে হত্যা ২২ নারী। ঢাকার আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ বছরে ঢাকায় ৩৭৪ জন নারীকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবছর ঢাকায় যৌতুকের জন্য গড়ে ২২ নারীকে হত্যা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর এলাকায় গত এক বছরে যৌতুকের জন্য ১৪ জন নারী হত্যার শিকার হন। ঢাকায় যৌতুকের কারণে হত্যার কয়েকটি ঘটনার অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা নানাভাবে নির্যাতন করে খুন করলেও খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা বা অসুস্থতা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। কাফরুলের ফারজানা হত্যার ঘটনাটি তেমনই। মামলার নথিতে দেখা যায়, ১০ বছর আগে ১৫ বছর বয়সী ফারজানা আক্তারের সঙ্গে কামরুল হাসান ভূঁইয়ার বিয়ে হয়। ব্যবসা করার জন্য যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকেন স্বামী। মামলার বাদী ফারজানার মামা হাবিব উল্লাহ বললেন, ‘জমি বিক্রি করে দোকান করার জন্য টাকা দেওয়া হয়েছিল কামরুলকে। এরপর আরও চাইত। ঘটনার দিন দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে ফারজানার মাথা ফাটিয়ে হত্যা করা হয়। অথচ আমাদের ফোন করে বলা হয়, ফারজানা স্ট্রোক করে মারা গেছে।’
গত ২২ এপ্রিলে মুনা আক্তার হত্যায় আদালতকে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজারীবাগের পারভেজের সঙ্গে সাত-আট মাস আগে মুনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের চার লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য মুনাকে চাপ দিতেন স্বামী। ঘটনার দিন মুনাকে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে প্রথমে জখম করা হয়। পরে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কল্যাণপুরে ফারজানা আক্তার নামের আরেক নারীর খুনের ঘটনায় আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এতে বলা হয়েছে, ফারজানাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পিবিআই এ ঘটনায় স্বামী শফিকুল ইসলামকে গত ১০ এপ্রিল ঢাকার আদালতে পাঠায়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দুই লাখ টাকা যৌতুকের কারণে প্রায়ই ফারজানাকে নির্যাতন করতেন স্বামী। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত বছরের ১৫ জুন খিলগাঁওয়ে খুন হন নাসিমা। স্বামী অহিদুল ইসলাম যৌতুকের কারণে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন বলে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ