সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

কর্তৃত্ববাদ যখন বুমেরাং হয়

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা প্রবল হয়ে উঠছে। ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা এশিয়া সর্বত্রই অনাকাক্সিক্ষত ওই মানসিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, এই কর্তৃত্ববাদ কি স্বদেশ কিংবা বিশ্বের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনছে? বাস্তব সত্য হলো, কর্তৃত্ববাদ শুধু দেশের ঐক্য ও সংহতিই বিনষ্ট করছে না, আন্তর্জাতিক পরিম-লেও অবিশ্বাস এবং অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে মানব জাতিকে যুদ্ধ ও সংঘাতের ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। কর্তৃত্ববাদ যে কোন ভালো বিষয় নয়, তা ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পলিট-ব্যুরোর মহাক্ষমতাবান সদস্যরা। অবশ্য সময়ে নয়, উপলব্ধিটা তাদের হয়েছিল একটু দেরিতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাওয়ার পর। তখন পলিট ব্যুরোর এক সদস্য আক্ষেপ করে বলেছিলেন, নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের বদলে আমরা কর্তৃত্বের ছড়ি ঘুরিয়েছি, তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের আজ এই দশা। তাই বলতে হয়, কর্তৃত্ববাদ আসলে কোন ভালো জিনিস নয়। কর্তৃত্ববাদ মানব সত্তা, মানব সমাজ ও মানব জাতির জন্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মানুষ যখন ক্ষমতা পায়, ক্ষমতায় আসক্ত হয়ে ওঠে তখন বিষয়টি যেন উপলব্ধি করতে পারে না।
গণতন্ত্রের নামে কিছু ভোট বেশি পেয়ে রাজনীতিবিদরা দেশের ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসে তারা দেশের মালিক হয়ে যান, কিন্তু মুখে বলেন জনগণই দেশের মালিক। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে পেছনে ফেলে তারা রাজনীতির গুটি চালেন- আবার কী করে ক্ষমতায় আসা যাবে। ফলে অপছন্দের লোকদের উপর চলে দমন-অবদমন ও নিপীড়নের স্টিম রোলার।  কোন কোন দেশে তো চলে নাগরিকত্ব বাতিলের কারসাজিও। যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী নাগরিকরা একদিন জানতে পারেন, তারা আর দেশের নাগরিক নন। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা আজকাল নাগরিকদের সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতেও কুণ্ঠিত নন। কখনও বা তারা যুগ যুগ ধরে বিশেষ মর্যাদা ভোগকারী বিশেষ কোন রাজ্যের নাগরিকদের জানিয়ে দেন, তোমাদের মর্যাদা কেড়ে নিলাম। কী করবে তোমরা- আইন আমাদের হাতে, আর বিভিন্ন বাহিনীতো আছেই। পৃথিবীবাসী চেয়ে চেয়ে দেখছে কর্তৃত্ববাদের এই রক্তচক্ষু।
এমন বাতাবরণেও পৃথিবীর দেশে দেশে কর্তত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আমরা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর আসামে এনআরসি’র নামে ১৯ লাখের বেশি মানুষকে নাগরিকত্বহীন করার তৎপরতা দেখেছি। এমন কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। আসামে কার্যকর করা এনআরসি নিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় আলোচনা হয়। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি এনআরসির পক্ষে অবস্থান নিলেও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দল ও জাতীয় কংগ্রেস। এইসব দলের নেতারা বলছেন, তারা পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চান না। এনআরসির নামে এই রাজ্য থেকে তারা কাউকে তাড়াতেও চান না। আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনআরসি নিয়ে আলোচনা শুরু করে বলেন, আসামে এনআরসি নিয়ে ১৯ লাখের বেশি ভারতীয়কে বিতাড়নের চেষ্টাকে তিনি মেনে নিতে পারছেন না। ওই ১৯ লাখ মানুষের অধিকাংশই বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমান। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, ভারতের বিবেকবান ও মানবতাবাদী মানুষরা এনআরসিকে সমর্থন করতে পারছেন না। এভাবেই আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চারিত হচ্ছে কর্তৃৃত্ববাদ বিরোধী আওয়াজ।
মানুষতো সমাজবদ্ধ হয়েছিল, রাষ্ট্র গড়েছিল মানবিক কারণে এবং উন্নত ও অর্থপূর্ণ জীবনের আকাক্সক্ষায়। কিন্তু বর্তমান বিশ^ব্যবস্থায় এখন বড় প্রশ্ন হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের মানবিক আকাক্সক্ষা কতটা পূরণ হচ্ছে? মানুষতো এখন তার অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেও বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসকদের অধীনে মানুষের জীবন ও মানবিক অধিকার মোটেও নিরাপদ নয়। ইন্ডিয়া টুডে পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলায় শেহলা রশিদ নামের এক নারীনেত্রীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে এজাহার দায়ের করেছে দিল্লী পুলিশ। ৬ সেপ্টেম্বর এই এজাহারটি করা হয়।
কাশ্মীরের শ্রীনগরে জন্ম নেওয়া শেহলা দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। জম্মু-কাশ্মীর পিপলস মুভমেন্টের (জেকেপিএম) নেতা তিনি। জম্মু-কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, এমন অভিযোগ এনে একাধিক টুইট করেন শেহলা। ওই সব টুইটে নেত্রী শেহলা জম্মু-কাশ্মীর থেকে নির্বিচারে পুরুষদের তুলে নিয়ে  যাওয়া, রাতে বাড়ি বাড়ি অভিযান ও নিপীড়নের অভিযোগ আনেন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি আরও লিখেছেন, কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপির এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাশ্মীরের জনগণের বিরুদ্ধে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। তাঁর ওই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে তাহলে সেখানে তিনি সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শেহলা রশিদ অভিযোগের জন্য অভিযোগ করেননি। তিনি চান, সেনাবাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তদন্ত করুক এবং তা করা হলে তিনি সেখানে সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে প্রস্তুত রয়েছেন। আমরা মনে করি, শেহলা রশিদের এই সৎসাহসের গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন ভারতের সেনাবাহিনী ও সরকার। যথাযথ তদন্ত হলে তো বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য। তখন উপলব্ধি করা যাবে আসলেই কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা। কিন্তু তদন্তের আগেই যদি শেহলা রশিদের গায়ে রাষ্ট্রদ্রোহের রঙ লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে? এর আগে বিবিসির সরেজমিন প্রতিবেদনেও কাশ্মীরিদের ওপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বীভৎস নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে। বিবিসি শুধু প্রতিবেদনই প্রকাশ করেনি, নির্যাতনের ছবিও প্রকাশ করেছে। আর আমরা তো জানি যে, ছবি কথা বলে। আমরা সবার জন্য ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা চাই। সঙ্গত তদন্ত না হলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে? ঘটনাপ্রবাহ ন্যায়ের দিকে অগ্রসর হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। আর কর্তৃত্ববাদ প্রবল হলে সেটাও উপলব্ধি করবে বিশ্বসমাজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ