সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ভূমি নিবন্ধনে দুর্নীতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি জানিয়েছে, জমির দলিল নিবন্ধনে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অবৈধ লেনদেন এবং সেবার জন্য আগতদের জিম্মি করে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। দলিল নিবন্ধন খাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে এবং জবাবদিহিতার যে কাঠামো আছে তা মোটেই কাজ করছে না। বরং সর্বনি¤œ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকলের যোগসাজশ এবং অংশিদারিত্বের মাধ্যমে ঘুষ-দুর্নীতি শুধু বিরাজই করছে না, সেখানে তৈরি করা এক ধরনের দুর্নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি অফিসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেছেন, ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলোতে দলিল নিবন্ধন ও ঘুষ-দুর্নীতি সমার্থক হয়ে পড়েছে। খাতটিতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার এবং জনগণকে ঘুষ-দুর্নীতির কবল থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, এটা করা গেলে জনগণের যেমন উপকার হবে তেমনি এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে।
কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে ঘুষ-দুর্নীতি ও নানামুখী অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে খাতটিকে দুর্নীতিমুক্ত করার মতো সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব এবং তা করতেই হবে বলেও মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি আরো বলেছেন, কোনো অপরাধ যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটতে দেয়া হয় তাহলে তার পরিণতি হলো দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং ভূমি নিবন্ধনের খাতে সেটাই ঘটে চলেছে। এই প্রবণতা ও কর্মকান্ডকে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করার একটি পন্থা হিসেবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্যও সুপারিশ করেছে টিআইবি।
বিদ্যমান দুর্নীতির কয়েকটি কারণের অন্যতম একটি কারণ হিসেবে রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে নিযুক্তির জন্য ঘুষ দেয়ার তথ্য উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, ঘুষের পরিমাণও ১০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত। নকল নবিশ পদে তালিকাভুক্তি এবং নকল নবিশ থেকে স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিযুক্তিলাভের ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি সাব-রেজিস্ট্রার পদের জন্যও বিপুল অংকের ঘুষ দিতে হয়। যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি পায় তারা স্বাভাবিকভাবেই ঘুষ আদায়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম ও আইন না মানাকেও দুর্নীতির একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নকল নবিশ পদে নিযুক্তি দেয়ার এখতিয়ার জেলা রেজিস্ট্রারের হলেও মন্ত্রীর সুপারিশ প্রয়োজন হয়। তাছাড়া নিবন্ধন অধিদফতরের সিদ্ধান্তও মনোনয়নের জন্য মানতে হয়। বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিযুক্তি পিএসসির মাধ্যমে হলেও একই পদে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মাধ্যমে নিযুক্তি পেয়েছেন। তাছাড়া মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে এমন ১৯৭ জনের ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে, ১৯৭১ সালে যাদের বয়স ১৮ বছরের কম ছিল। অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। এভাবেই দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বাস্তবেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বলা দরকার, টিআইবির পক্ষ থেকে নিযুক্তির ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টিকেই শুধু প্রাধান্যে আনা হয়নি, দলিল নিবন্ধনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই যে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না সে কথাটাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু উদাহরণও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এতে দেখা গেছে, কোনো জমি কেনার আগে ওই জমি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যের জন্য খোঁজ-খবর করাসহ রেজিস্ট্রেশন করা পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়েই ক্রেতাকে তহশীল অফিস থেকে রেজিস্ট্রারের অফিস পর্যন্ত বারবার যাতায়াত করতে হয়। জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর ঠিক আছে কি না, জমির মালিকানা সত্যিই বিক্রেতার কি না- এ ধরনের অনেক ব্যাপারেই ক্রেতাকে নিশ্চিত হতে হয়। সবশেষে রয়েছে রেজিস্ট্রেশন করার পালা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, অনুসন্ধানের মতো কোনো বিষয়ে আইনত টাকা দেয়ার দরকার না থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অফিসের লোকজনই যথেচ্ছভাবে ঘুষ আদায় করে থাকে। রেজিস্ট্রেশন করার সময়ও নির্ধারিত অর্থের চাইতে কয়েকগুণ পর্যন্ত বেশি আদায় করা হয়। টিআইবি তার অনুসন্ধানে জেনেছে, ঘুষের এই অর্থের অংশ বা ভাগ নি¤œস্তরের কর্মচারী থেকে সর্বোচ্চ স্তরে কর্মরত অফিসাররাও পেয়ে থাকেন। তারা একে অন্যের সঙ্গে যোসাজশ করেন। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব কিন্তু সামান্য পরিমাণেও বাড়ে না।  তাছাড়া একজনের জমি অন্যজনের বলে দেখিয়ে ক্রেতাকে প্রতারণার শিকার বানানোর মতো অভিযোগও রয়েছে। জমির পরিমাণে কম-বেশি করার মতো দুর্নীতিও যথেষ্টই করা হয়।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই টিআইবি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্য সুপারিশ করেছে। আমরাও মনে করি, তেমন ব্যবস্থা করা গেলে এবং যে কোনো এলাকার জমি সংক্রান্ত সকল তথ্য প্রতিটি ভূমি অফিসে সংরক্ষণ করা হলে একই জমির জন্য কোনো ক্রেতাকে কয়েকটি পর্যন্ত অফিসে দৌড়াতে এবং পদে পদে ঘুষ দিতে হবে না। ক্রেতারা একটি অফিসেই এক সঙ্গে সব তথ্য পেয়ে যাবেন। এ প্রসঙ্গে ঘুষ বন্ধের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। শুধু ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়া ব্যবহ্নত করে  করলেই চলবে না, ঘুষ বন্ধ করতে হবে নিযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতেও। এজন্য দরকার ঘুষখোরদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। আমরা চাই, ভ’মি নিবন্ধনে ঘুষ-দুর্নীতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। টিআইবি বলেছে এবং আমরাও মনে করি, এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ