শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

ফিরে এসো

নাজমুন্নাহার সানি : খুব কষ্ট  হচ্ছে। বুকের ভেতর হাজার টনের পাথরটা কোনভাবে যদি সরাতে পারতাম! প্রতিটি ঘটনার পেছনে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া এ এক বদভ্যাস আমার। কেন এমন হয়,কিসের জন্য, কোন মানে এর....? কোন উত্তর নেই। অগুণিত অশ্রু ধারা  আজ অসহায়...।   বর্ণাকে খুব মনে পড়ছে। পৃথিবীতে এ একটা মানুষ যাকে আজ আমার বড্ড প্রয়োজন। আমার মনে আছে-কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গিয়েছিল, টকটকে লাল চোখ দেখে ভেবেছিলাম আন্টির বকা খেয়ে রাতভর চোখের ওপর অনশন চালিয়েছে। কিন্তু ঘটনা সম্পুর্ণ ভিন্ন। একবুক হাহাকার ভরা কান্নায় ভেসে যাচ্ছে বর্ণা। পাগলের মতো প্রলাপ বকে যাচ্ছে-কেমিস্ট্রির ওপর অনার্স /মাস্টার্স  করেছি। সরকারি ইন্সটিটিউশন থেকে IELTS করেছিলাম। এখন Direct International Org. এর আন্ডারে IELTS করছি। গাজীপুর থেকে Tailor & Craft work এর ওপর কোর্স করা মেয়ে। পর্দাকে না বুঝলে আজকে নৌবাহিনীর মেজরে পদোন্নতি হতো। রেডক্রিসেন্টের আজীবন সদস্য হয়েছি সেই কবে! ইসলামী ব্যাংক আজও ম্যানেজার পদের জন্য আহবান করছে। গানের কত কত ক্রেস্ট আর সার্টিফিকেট বাসায় অযত্নে পড়ে আছে! চট্টগ্রামসহ বেশকিছু লেখক আমাকে partnership এর offer করছে। আমার চারপাশের বহু প্রতিষ্ঠান নানাভাবে জব অফার করছে। Research এর জন্য all ready বিষয়বস্তু  select করে ফেলেছি, preparation নেয়া হয়ে গেছে। একটা সুন্দর career plan সাজিয়েছি। একটু একটু শ্রম দিয়ে নিজেকে ready করে যাচ্ছি। এসব কি তুই কম মনে করিস নিসা....?  বয়স, মান এবং দেশের structure বিবেচনা করলে সব একটা মেয়ের জন্য মোটেই কম না। কিন্তু এ মুহুর্তে আমার কি বলা উচিত সেটাও বুঝতে পারছি  না। সেদিন কোন দুঃখ বর্ণাকে এভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল আমার জানা নেই। British accent-এ fluently কথা বলতে পারা বর্ণা বর্তমানে Cambridge  university-তে PhD করছে তার পছন্দের বিষয়ের ওপর। জীবনে চারবার suicide করতে চেয়েছিল। আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে  পড়েছিল মাথার ওপর। তবুও কিভাবে জানি সামলে ওঠতে পারত। অবশ্য হোঁচট খেয়ে বসে পড়ত কিন্তু আবার উঠে দাড়াঁত বিজয়ী হাসি নিয়ে। ব্যালকনিতে লাগানো বর্ণার অ্যালোভেরা, মেহেদি, পেয়ারা, গোলাপ, শিম গাছগুলো খুব সতেজ হয়ে বেড়ে উঠছে। গাছগুলো  ওর নয়। আমার ব্যালকনিতে লাগিয়েছে। বর্ণা বলেছিল-যদি কখনো ওর কথা মনে পড়ে তাহলে এ গাছগুলো ছুঁয়ে দেখার জন্য। তখন সব কষ্ট উবে যাবে। ওই পাগলিটার মতো হাসতে পারব। কিন্তু কই! আমার তো হাসি আসে না। একবার, কয়েকবার, বারবার ওর গাছগুলো ছুঁয়ে দেখছি, কিছুই তো উপলব্ধি করতে পারছি না....। 
 গতরাতে বর্ণা ই’মেইল  পাঠিয়েছে। লন্ডনের সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান  থেকে সিনিয়র গবেষক ওনার ল্যাবে গবেষণা কাজ চালানোর জন্য অনুরোধ করেছেন।তবে বর্ণার স্বামি বিষয়টা বর্ণাকে ভেবে দেখতে বলছে। হয়তো কোন মহৎ উদ্দেশ্য স্বামির মনে লুকিয়ে  আছে অথচ মুখে কিছু বলতে পারছেন না। একদিকে পৃথিবীর সব থেকে বড় গবেষণাগার অন্যদিকে সে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র গবেষকের অনুরোধপত্র আবার স্বামির পরামর্শ -এ তিন মিলে বর্ণা কি বাতিকগ্রস্ত  হয়ে গেছে? মোটেই না। আমাকে জানিয়েছে-এক সপ্তাহ সময় নিয়েছে Sir Rechard-(সংক্ষিপ্ত নাম)-এর কাছ থেকে। এ সাতদিনের প্রতিদিন বর্ণা  ফরযের পাশাপাশি নফল ইবাদাতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিবে আর প্রতিরাতে ইস্তেখারায় জেনে নিবে কোন দিকে তার যাওয়া উচিত।বড্ড অবাক লাগে এ guideline সে পায় কোথা থেকে!! ধর্মের প্রতি আমার তেমন  কোন আগ্রহ নেই। ধর্মনিরপেক্ষতাই বিশ্বাসী। অবশ্য কোন ধর্ম যুক্তি, তর্ক, বিজ্ঞান ও বাস্তবতায় সমৃদ্ধ  তা জানার জন্য রীতিমত সময় দিয়েছিলাম বিভিন্ন ধর্মের বই-পত্রের দিকে। শেষটা এখনো বাকি রয়ে গেছে।মনে মনে ভাবতাম ধর্মকে আকঁড়ে ধরা মানে সামনের পথে কিছু বড় বড় পাথর বসিয়ে দেয়া।আর এ পাথর ততদিন থাকবে যতদিন হৃৎপিন্ড সচ আছে। কিন্তু দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে বর্ণা কিভাবে shining life lead করছে... তাহলে আমি কি কোন ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছি...? আমি এখন বাংলাদেশে। আর বর্ণা লন্ডনের সুউচ্চ প্যালেসে বসবাস করছে অত্যন্ত  সম্মানীয় আসনে।ক ত কত বাংলাদেশি ওর প্রতিবেশি। সেখানে নাকি ওর অন্যরকম পরিচিতি। বিদেশের মাটিতে নিজেকে মুসলিম পরিচয়  দিতে ওর খুব গর্ব হয়। বেশকিছু ছবি পাঠিয়েছিল মেইল বক্সে। কালো জুব্বা আর হিজাবের আড়ালে নতুন করে কি দেখব? বিখ্যাত দর্শণীয় স্থানে বেড়াতে গিয়েছে সেগুলোর ছবি পাঠিয়েছে। মা সবসময় ওর আড়ালে ওকে জঙি ছাড়া সম্ভোধন করেনা। প্রচন্ড ঘেন্না আর অবজ্ঞা  মিশিয়ে ওকে এড়িয়ে  চলে। আমাকে ওর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে বলে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদ, মানবতাবিরোধী, গোপনে অপহরণকারী, গুম-হত্যাকারী প্রকাশ্য রাষ্ট্রদ্রোহী-এর কোনটা কেন আমার বর্ণার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না? ওকে দেখলে কেন প্রতিশোধ স্পৃহার মানে ভুলে যাই, জঙিবাদের ভয়াবহতার সাথে মিলাতে পারি না? ওর দিকে তাকালে এমন শান্তি লাগে কেন, এমনভাবে চক্ষু জুড়াঁয় কেন? মাথায় প্রচন্ড  ব্যথা হচ্ছে, কোন information মাথা থেকে delivered করতে পারছিনা। মা অনেকক্ষণ  ধরে ডাকছিল কিন্তু খেয়াল করিনি। ব্যালকনি থেকে টলতে টলতে রান্নাঘরে যেতেই মা বলল “কম্পিউটারে কিছুক্ষণ পরপর আওয়াজ হচ্ছে, কি হয়েছে একটু দেখ” কম্পিউটার open করতেই দেখি বর্ণার দেয়া scenary-সুবিশাল সবুজ পাহাড়ের বুক ছিড়ে দুরন্ত বেগে ঝরে পড়ছে ঝর্ণাধারা। কিছু পাখি আর নাম না জানা নানা জাতের বক চড়ে বেড়াচ্ছে। হালকা গেরুয়া রঙের পাহাড়, সবুজ বনলতা আর স্বচ্চ ঝর্ণাধারার ঠিক মাঝখানে করে লিখা “তোমরা দুঃখ  করো না, হতাশ হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো”-সুরা ইমরান : ১৩৯। অতএব ফিরে এসো নিসা, ফিরে এসো... 
পড়িমরি করে কম্পিউটার বন্ধ করে দিলাম। এমন কিছু দেখতে চাই না, শুনতেও চাই না। তবুও কেন জানি বুকের ভেতর অনুরণিত হওয়া বাক্যটির প্রতিধ্বনি  শুনতে পাচ্ছি-জানালা, ভেন্টিলেটর, বইয়ের তাক, আলমিরা, সোফা, দরজা সবখান থেকে। সমস্বরে বলে যাচ্ছে -ফিরে এসো নিসা, ফিরে এসো....

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ