শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

আমানতদারিতা

শারমিন আক্তার মিতু : আল্লাহ তায়ালার বাণী : হে ঈমানদারগণ তোমরা  আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত আমানতের খেয়ানত করো না অথচ তোমরা জানো। (আনফাল : ২৭)
কুরআনুল কারীম আমানতের বিষয়টিকে আরবি আমানত শব্দ দিয়ে বহুবচনে উল্লেখ করেছে কারো নিকট অপর কারো কোনো বস্তু বা সম্পদ গচ্ছিত রাখাটাই শুধুমাত্র আমার নয় যদিও আমরা সাধারণত তাই মনে করে থাকি বস্তুগত আমানত ছাড়াও কোন পদের নিয়োগ -বরখাস্তের অধিকার রয়েছে যাদের হাতে এমন ব্যক্তির নিকট সেই পথটিও আমানত স্বরূপ অর্থাৎ আমানতদারিতা শুধু হকদারকে হক বুঝিয়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাটাও আমানতদারিতা।
# আমানতদারিতা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত :
 একবার হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কোন একটি অসুখের কারণে জনৈক ব্যক্তি মধু সেবন করতে বলেছিল কিন্তু তার। মধু ছিল না এবং কোথাও তা পাওয়া যাচ্ছিল না তবে বায়তুল মালে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সামান্য পরিমাণ মধু ছিল লোকেরা বলল আপনি মধু ব্যবহার করুন তিনি উত্তরে বললেন এটা সকল মুসলমানের সম্পত্তি যতক্ষণ পর্যন্ত জনসাধারণ আমাকে অনুমতি না দেবে ততক্ষণ আমি এই মধু ব্যবহার করতে পারি না। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই মধু ব্যবহার করেননি।
# আমানতদারিতা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব :
নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যাবর্তন করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন তা কত উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা (সূরা নিসা : ৪৮)
উল্লেখিত আয়াতে আমানতের বিষয়ে একদিকে হকদারের হক আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সাথে সাথে বিচারকদের বিচার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করতে বলা হয়েছে। আমানতদারিতার সাথে দায়িত্ব পালনের তাগিদ এসেছে। আর এই দায়িত্ব অর্পণ যেমনিভাবে বান্দার পক্ষ থেকে অন্য বান্দার উপর হতে পারে আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার উপর হতে পারে।
# আমানতদারিতা নষ্ট করার পরিণতি :
 রাসূল (স:) বলেন, যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই এবং যে ওয়াদা পালন করে না তার দ্বীন নেই। (আহমদ)
হযরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কেয়ামতের দিন আমানতের খেয়ানতকারীকে হাজির করে বলা হবে তোমার কাছে গচ্ছিত আমার আমানত ফিরিয়ে দাও। সে বলবে হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তা ফিরিয়ে দেবো? দুনিয়া তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার গচ্ছিত আমানতগুলো যেভাবে রাখা হয়েছিল ঠিক অনুরূপভাবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে যা ওইখানে অবতরণ করা হয়েছে ওগুলো উত্তোলন করে নিয়ে আস। অতঃপর সে নেমে গিয়ে সেগুলো কাঁধে করে নিয়ে আসবে তার কাছে জিনিসটার ওজন পৃথিবীর সমস্ত পাহাড় অপেক্ষা ভারী মনে হবে। সে মনে করবে তুলে আনলে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে কিন্তু সে তখন জাহান্নামের শেষ প্রান্তে চলে আসবে অমনি উক্ত জিনিস পুনরায় জাহান্নামের সবচেয়ে নিচে পড়ে যাবে এভাবে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। (বায়হাকী, আহমদ)
# আমানতদারিতার অভাবে সমাজের বিপর্যয়:
দুদকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন এর পরিকল্পিত পরিসংখ্যান : দুদকের মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্মচারীরা একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সুবাদে স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিণত হয়। সাধারণ রোগীরা তাদের স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। সরকারি হাসপাতালের নির্ধারিত ফি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে  ঝামেলা এড়িয়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় এসব দালালদের শরণাপন্ন হয়।
বাংলাদেশি ভোগ্যপণ্য ভেজাল চরম আকার ধারণ করেছে। তবে শুধু ভোগ্যপণ্য নয় শিশু খাদ্য প্রসাধনসামগ্রী এমনকি জীবনরক্ষাকারী ঔষধেও ভেজাল। প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
# প্রতারণা অনৈতিকতা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। একদিকে খাবারে ভেজাল বা বিষ দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। আরেক দিকে ভেজাল বিরোধী অভিযানের নামে মানুষের সাথে রসিকতা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের দায়িত্ব উৎসমুখে ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযান খুচরো বিক্রেতা পর্যায়ে চালানো হচ্ছে!!! সবচেয়ে বড় ইয়াবা সম্রাট বা গডফাদারদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে টিকিয়ে রেখে ছোট ছোট চোরাচালানিদের বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হচ্ছে।
বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর দিয়ে অবৈধভাবে মোবাইল ফোন দেশে ঢুকছে।অবাধে অসত্য অন্যায়-অনৈতিকতা অপরাধপ্রবনতা সমাজের  রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে।এর কারণের প্রতিকার না করলে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনকে  এই পচন থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।ব্যক্তির পক্ষ থেকে অন্য একজন ব্যক্তির প্রতি আমানতদারীর হক আদায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমানতদারিতা পালন করা এবং সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলার (সরকারি /বেসরকারী) পক্ষ থেকে আমানতদারিতার সাথে দায়িত্ব পালন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহ তার বান্দার উপর যা কিছুই ফরজ করেন তাই আমানত। আর আল্লাহর আদেশ বা নিষেধ অমান্য করাই খেয়ানত।
আল্লাহ তাআলা বলেন : একমাত্র সেই সব লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে,যারা মানুষের উপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আশ শুরা : ৪২)
রাসুল (সা) বলেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (বুখারী)
রাসুল (সা) বলেন, ঐ সব শাসকবৃন্দের জন্য ধ্বংস, ঋণগ্রস্তদের জন্য  ধ্বংস যারা খেয়ানত করে। কিয়ামতের দিন এমন কিছু লোককে দেখা যাবে যাদের চুলের ঝুটির সাথে বেঁধে সুয়াইয়া নামক তারকার সাথে লটকানো হবে। তাদের উপর এরুপ আযাব অনবরত চলতে থাকবে, অথচ তারা কিছুই করতে পারবে না। (আহমদ)
অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা) বলেন: মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তখন তা ভংগ করে, আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তা খেয়ানত করে। (বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ মুমিন বান্দার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সে আমানতদার হবে।মুমিনের কাছে জীবনের সর্বাপেক্ষা সম্পদ হলো তার আমানতদারিতা। যথাযথভাবে একজন মানুষ যদি আল্লাহ, তার রাসুল ও আখিরাতের সত্যতার উপর ঈমানদার হয়, তাহলে সে আমানতের খেয়ানত করতে পারে না। আর যদি সে আমানতের খেয়ানত করে তবে সে ঈমানের পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। সবশেষে বলবো দুনিয়ার ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনের পচনশীলতা রোধে, শান্তিময় জীবন গঠনে এবং চিরস্থায়ী জীবনের মর্যাদা অর্জনে আসুন আল্লাহর রাসুল (সা) এর জীবনাদর্শ  অনুযায়ী আমানত গ্রহন, সংরক্ষণ ও যথাযথ আদায়ের জন্য আল্লাহর কাছে যোগ্যতা, মানসিকতা ও তাওফিক কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ