শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

যৌতুকের অভিশাপ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ

সেলিনা শৈরে : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
তিনি ফরিদপুর পুলিশ লাইনসে কর্তব্যরত ছিলেন। গত বছরের ২৩ জুলাই সজিব হাওলাদারের স্ত্রী রোখসানা খানম বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় স্ত্রীকে নিয়ে ঘরসংসার করার শর্তে সজিব হাওলাদারকে জামিনও দেন আদালত। পরে স্ত্রী রোখসানা আদালতে লিখিতভাবে বলেন, জামিনে আসার পর সজিব তাঁর পরিবারের কাছে ফের যৌতুক দাবি করেন। আসামী  আদালতে হাজির হয়ে পুনরায় জামিন চান তিনি। তবে আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন।
ঘটনা-পাঁচ। ২৫ মার্চ ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে খাদিজা আক্তার নামের এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাদিজা ফতুল্লার পাইকপাড়া এলাকার মৃত আবদুর রশিদের মেয়ে। নিহত খাদিজার পরিবারের দাবি, ১২ মার্চ রাতে খাদিজার (২১) স্বামী ফরহাদ তাঁকে মারধর করে খাটের নিচে ফেলে রাখেন। পরদিন সকালে খাদিজার মা মুমূর্ষু অবস্থায় মেয়েকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযুক্ত ফরহাদ ফতুল্লার কাশিপুর এলাকার ইয়ার হোসেনের ছেলে। এই দম্পতির দেড় বছর বয়সী এক সন্তান রয়েছে।
নিহত খাদিজার বড় বোন ফজিলত বেগম বলেন, চার বছর আগে পারিবারিকভাবে খাদিজা ও ফরহাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য খাদিজাকে মারধর করা হতো। ১১ মার্চ এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন খাদিজা। অভিযোগের পরদিনই তাঁকে মারধর করা হয়। তবে পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ফরহাদের মুঠোফোনে কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের বলেন, ইতিমধ্যে এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে। ঘটনার আগে পুলিশের কাছে করা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১১ মার্চ মারধরের অভিযোগ এনে একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল।  ২৩ মার্চ গৃহবধূর পরিবার থেকে আরও একটি অভিযোগ দায়ের হয়। সেটা মামলায় রূপান্তরের আগেই তাঁর মৃত্যু হলো।
ঘটনা-ছয়। ০৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম-যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূর চুল কেটে নির্যাতনের অভিযোগ। রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের অলংকারপুর টেংরাপাড়া গ্রামে যৌতুকের টাকা না পেয়ে এক গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, ধারালো বঁটি দিয়ে ওই গৃহবধূর চুল কেটে ঘরে আটকে রেখেছিলেন তাঁর স্বামী ও শাশুড়ি।
পুলিশ ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে এবং তাঁর স্বামী ও শাশুড়িকে আটক করে। ভুক্তভোগী গৃহবধূর নাম চুমকি বেগম (২৫)। তিনি অলংকারপুর গ্রামের ওয়াজেদ প্রামাণিকের ছেলে রিয়াজ প্রামাণিকের স্ত্রী। ওই দম্পতির দুই বছরের একটি মেয়ে আছে। নির্যাতনের শিকার চুমকি বেগম অভিযোগ করে বলেন, রিয়াজের সঙ্গে ২০১৩ সালে তাঁর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই রিয়াজ বিভিন্ন সময় যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকেন। মেয়ের সুখের কথা ভেবে চুমকির বাবা বিয়ের কিছুদিন পর ৫০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু রিয়াজ মাঝেমধ্যে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। টাকা না দিলে চলত শারীরিক নির্যাতন। মারধর করে চুমকিকে কয়েকবার তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়েও দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে চুমকির পরিবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেছিল। পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে স্বামীর পরিবারের লোকজন মুচলেকা দিয়ে চুমকিকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু গত ০২ এপ্রিল সন্ধ্যায় চুমকির কাছে আবারও টাকা চাওয়া হয়। টাকা দিতে না চাইলে ওই দিন রাতে রিয়াজ তাঁকে মারধর করেন। এ সময় শাশুড়ি মরিয়ম বেগম চুমকির হাত ধরে রাখেন এবং স্বামী রিয়াজ প্রামাণিক বঁটি দিয়ে চুল কেটে দেন। পরে তাঁকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সুযোগ বুঝে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে বাবাকে খবর দেন চুমকি। খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
চুমকি বেগম বলেন, তাঁর স্বামী বিয়ের পর থেকে প্রতিনিয়ত টাকা চাইতেন। তাঁকে মারধর করতেন। সব ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার আশায় তিনি কাউকে কিছু বলেননি। কিন্তু এবার মাথার চুল কেটে দেওয়ায় তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছেন। এ কারণে বাবাকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলেছেন। বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম আজমল হুদা বলেন, নির্যাতনের ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠানো হয়। পুলিশ ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করেছে এবং অভিযুক্ত স্বামী ও শাশুড়িকে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
ঘটনা-সাত। ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম নেশার টাকা না পেয়ে গৃহবধূকে খুন! মাদারীপুরে নেশার টাকা না দেওয়ায় চাঁদনী আক্তার (১৯) নামের এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর থেকে নিহতের স্বামী ও তাঁর পরিবারের লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে সদর উপজেলার জাজিরা গ্রামের রিয়াদের সঙ্গে বিয়ে হয় পাশের পাঁচখোলা গ্রামের চাঁদনীর। বিয়ের পর থেকেই রিয়াদ নেশার টাকার জন্য চাঁদনীকে মারধর করতেন। এ নিয়ে স্থানীয়রা বেশ কয়েকবার সালিস করেন। কিন্তু এতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রিয়াদ। নেশার টাকা না দেওয়ায় একপর্যায়ে আজ ভোররাতে চাঁদনীতে পিটিয়ে হত্যা করেন রিয়াদ। পরে চাঁদনীর শ্বশুরবাড়ির লোকজন লাশটি বাড়ির পাশে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে মর্গে পাঠায়। নিহত চাঁদনীর বাবা আবুল হাওলাদার অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক ও নেশার টাকার জন্য তাঁর মেয়েকে মারধর করা হতো। সকালে স্থানীয়দের কাছে তিনি খবর পান, তাঁর মেয়েকে হত্যা করে বাড়ির লোকজন পালিয়েছেন। চাঁদনীকে তাঁর স্বামী ও পরিবারের লোকজন পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। তিনি ন্যায়বিচার চান। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অখিল সরকার বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। নিহতের গলায় দাগ আছে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষ হলে পুলিশের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত চাঁদনীর স্বামীর মুঠোফোন নম্বরে ফোন করা হলে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়ির লোকজন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে অভিযুক্ত রিয়াদের এক নিকটাত্মীয় বলেন, রিয়াদের সঙ্গে চাঁদনীর প্রায়ই ঝগড়া হতো। রিয়াদ মাঝে মধ্যে চাঁদনীকে মারধর করতেন। তবে সেটা কী নিয়ে, তা তিনি জানেন না। রিয়াদ নেশাগ্রস্ত কিনা, জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, রিয়াদ এক সময় মাদকাসক্ত ছিলেন।
মাদারীপুর সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সিরাজুল হক সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে আমরা লাশটি রিয়াদের বাড়ির উঠান থেকে উদ্ধার করি। আমরা ধারণা করছি, এটি আত্মহত্যা। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরে স্পষ্ট করে বলা যাবে মূল রহস্য কী ছিল। এ ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদনে আঘাতের তেমন কোনো চিহ্ন আমরা পাইনি।’
ঘটনা-আট। ০২ মে ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যুদণ্ড। যৌতুক না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রী রেহানা আক্তারকে গলাটিপে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে আদালত স্বামী মো. মোর্তুজা ওরফে মিন্টুকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। মোর্তুজা এ সময় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। মোর্তুজার বাড়ি ফেনী সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের দমদমা গ্রামে। সরকারি কৌঁসুলি ফরিদ আহম্মদ হাজারী বলেন, ২০০৯ সালে আসামি মো. মোর্তুজা ওরফে মিন্টুর সঙ্গে ছাগলনাইয়া উপজেলার কৈয়ারা গ্রামের মকবুল আহম্মদের মেয়ে রেহানা আক্তারের বিয়ে হয়। তাঁদের দুটি সন্তানও আছে। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় মোর্তুজা তাঁর স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতেন। শ্বশুর পক্ষও বিভিন্ন সময় সাধ্যমতো তাঁর দাবি মেঠাত। ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি আবারও এক লাখ টাকা যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে চাপ দেন তিনি। এতে স্ত্রী রেহানা রাজি না হলে ওই দিন বিকেলে স্বামী মোর্তুজা ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রীকে মারধর করেন।
একপর্যায়ে স্ত্রীকে গলাটিপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করেন। বাড়ির লোকজন টের পেয়ে রেহানাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে রেহানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় রেহানার বাবা মকবুল আহম্মদ বাদী হয়ে ফেনী সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ