মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আশুরা

ইসলামি শরিয়তে চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এই মাসগুলো ‘হারাম’ অর্থাৎ সম্মানিত মাস হিসেবে পরিচিত। এই মাসগুলোতে সকল প্রকার পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকতে ও অধিক পরিমাণে নেক আমল করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মহররম মাসের নফল রোজার সওয়াব অন্য সকল নফল রোজার সওয়াবের চেয়ে বেশি। রাসূল (স.) বলেন, ‘রমযানের পরে সবচেয়ে বেশি ফজিলতের সিয়াম হলো আল্লাহর মাস মহররমের সিয়াম।’ আমরা জানি যে, মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় ইয়াওমু আশুরা বা আশুরা দিবস। এ দিন সিয়াম পালনের জন্য উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (স.)। হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘রাসূলুল্লাহ (স.) মদীনায় এসে দেখেন যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করে। তিনি তাদেরকে বলেন, এ দিনটির বিষয় কি যে তোমরা এ দিনে সিয়াম পালন কর? তারা বলেন, এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার জাতিকে পরিত্রাণ দান করেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে নিমজ্জিত করেন। এ জন্য মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দিন সিয়াম পালন করেন। তাই আমরা এ দিন সিয়াম পালন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, মুসার (আ.) বিষয়ে আমাদের অধিকার বেশি। এরপর তিনি এ দিন সিয়াম পালন করেন এবং সিয়াম পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।’
সহীহ হাদিস থেকে আমরা আশুরার প্রকৃত ইতিহাস ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি। আশুরার ইতিহাসের সাথে জড়িত রয়েছে হযরত মুসা (আ.) ও ফেরাউনের দ্বন্দ্বের ইতিহাস। তাওহিদ ও শিরকের দ্বদ্বের এই ইতিহাসে অবশেষে বিজয় হয়েছে সত্যের নবী মুসা (আ.) এর। পরাজয় হয়েছে অত্যাচারী, অহংকারী ও শিরকের প্রতিনিধি বাদশাহ ফেরাউনের। এ দ্বন্দ্বে মুসা (রা.) বিজয় লাভের পর কোন অহংকার প্রকাশ করেননি। বরং অনুগত বান্দা হিসেবে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সিয়াম পালন করেছেন। এমন উদাহরণ থেকে প্রতিটি মুসলমানের শিক্ষা নেয়ার বিষয় রয়েছে। আশুরা উপলক্ষে মহানবী (স.) ১০ তারিখের সাথে ৯ মহররমেও সিয়াম পালনের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। তাই ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখা উত্তম। রমযানের সিয়াম ফরজ হওয়ার আগে আশুরার সিয়াম ফরজ ছিল। রমযানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর আশুরার সিয়াম মুস্তাহাব তথা ঐচ্ছিক বলে গণ্য করা হয়। তবে আশুরার সিয়াম পালন করলে অফুরন্ত সওয়াব পাওয়া যায়। আশুরার সিয়াম পালন করলে আল্লাহ বান্দার পূর্ববর্তী বছরের সগীরা গুনাহ মাফ করে দেন বলে জানা যায়। তাই কোন সচেতন মুসলমান আশুরার রোজা পালন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না।
ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণেও ১০ মহররম মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আর সেই ঘটনাটি হলো কারবালার ঘটনা। অনেকে ‘আশুরা’ বলতে কারবালার ঘটনাই বোঝেন, যদিও ইসলামী শরীয়তে আশুরার সিয়াম বা ফজিলতের সাথে কারবালার ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে কারবালার ঘটনা পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ওফাতের মাত্র ৫০ বছর পর ৬১ হিজরী সালের মহররম মাসের ১০ তারিখ শুক্রবার ইরাকের কারবালা নামক স্থানে তারই উম্মতের কিছু মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন প্রিয়তম দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.)। এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি। অনেক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কাহিনী এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়ানো হয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আমরা জানি, ইয়াজিদ ছাড়াও কারবালার ঘটনার সাথে বিশেষভাবে জড়িত রয়েছে কুফাবাসীর বিশ^াস ঘাতকতা এবং গবর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্মম ষড়যন্ত্র। হযরত হোসাইন (রা.)ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলেন। কারবালার ঘটনা থেকে আমরা বর্তমান সময়েও শিক্ষা নিতে পারি। মুসলমানদের ক্ষতির জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা মুসলমানদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। তাই ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সব সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিভ্রান্তিকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। আর পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কখনও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা যাবে না। কারবালায় ইয়াজিদের পক্ষে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনী বাহ্যিক বিজয় লাভ করলেও প্রকৃত অর্থে তাদের পরাজয় হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ