সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

‘ঝটিকা অভিযানে’ সক্রিয় খুলনার দুদক!

খুলনা অফিস : দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, দুর্নীতিবাজদের কাছে কিছুটা আতঙ্কের। ব্যাংকের অর্থ লুটসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। আবার খুলনা ওয়াসার দুর্নীতিসহ অনেক রাঘোব বোয়াল দুদকর ধরা ছোঁয়ার বাইরেও রয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে ‘ঝটিকা অভিযানে’ অনেকটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে দুদক। তবে, এ ধরনের ‘ঝটিকা অভিযান’ দুর্নীতি রোধে কতটুকু কার্যকর বা সফল হচ্ছে- তা নিয়ে রয়েছে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ইতোমধ্যেই খুলনার সিভিল সার্জন অফিস, জেলা কারাগার, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ, বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, খুলনা সিটি কর্পোরেশন-কেসিসি, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-কেডিএ, খানজাহান আলী (রহ.) সেতু, ড্রাগ সুপারের কার্যালয়, খুলনা রেলওয়ে এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ‘ঝটিকা অভিযান’ চালিয়েছে দুদক।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্র মতে, দুদক’র ‘ঝটিকা অভিযানে’ তাৎক্ষণিকভাবে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে, এ ধরনের অভিযান স্থায়ীভাবে দুর্নীতি রোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে না। বরং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে অধিক কার্যকর হবে।
অপরদিকে দুদক’র সূত্র বলছেন, মূলত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশেই ‘ঝটিকা অভিযান’ পরিচালনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং তদন্তপূর্বক মামলা দায়ের করা হয়।
সূত্র মতে, স্বাস্থ্য সনদ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগে গত বছরের ১৯ নবেম্বর খুলনার সিভিল সার্জন অফিসে ‘ঝটিকা অভিযান’ চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের প্রমাণ না মিললেও সনদ প্রদান রেজিস্টার এবং সনদ প্রার্থীদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে দুদক টিম। অভিযানকালে অফিসের উচ্চমান সহকারী এসএম মহসিন আলীকে সনদ প্রদান রেজিস্টার দেখাতে বললে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন।
অভিযানের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্বাস্থ্য সনদ প্রদান বাবদ ১০০ টাকা করে নিতে ১৯৮৭ সালের এক আদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন রয়েছে। সেই বাবদ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু টাকার বিপরীতে রশিদ, হিসাব বা এ সংক্রান্ত রেজিস্টার তার দপ্তরে সংরক্ষণ করা হয় না।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১৬ এপ্রিল খুলনা জেলা কারাগারে অভিযান চালায়। দুদকের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক নীলকমল পাল বলেন, ‘দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা আদায়, কয়েদী বা হাজতিদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ ও অসুস্থদের তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে মেডিকেল ওয়ার্ডে রাখার অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা কারাগারে অভিযান চালানো হয়। কারাবিধি অনুযায়ী কয়েদী বা হাজতিদের খাবার সরবরাহ করা হয়। এ কারণে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে বাকি দুটি অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে।’ কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ বলেন, দুদক অভিযানকালে কোনো অনিয়ম পায়নি।
খুলনা নগরের টুটপাড়া এলাকায় একটি ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে ১৯ আগস্ট খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আওতাধীন খুলনায় ড্রাগ সুপারের কার্যালয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময় ফার্মেসির লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নে অনিয়মের প্রমাণ পান দুদক কর্মকর্তারা। এ সময় দুদক টিমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, এই কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে ফার্মেসির কোনো নতুন লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন করা হয় না। আর এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছেন অভিযানে থাকা সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ’র খুলনা সার্কেল অফিসে গত ২৭ জানুয়ারি অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। তবে দুদকের অভিযানের খবর পেয়ে কথিত দালাল চক্রের সদস্যরা দেওয়াল টপকিয়ে পালিয়ে যায় বলেও একটি সূত্র জানায়। যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণসহ দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান হয়। বিশেষ করে নতুন যানবাহনের রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে শো-রুমের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া বিআরটিএ’র প্রতিটি ধাপে ধাপে দালালদের অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রদান, অন্যান্য কাগজপত্র প্রদান, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয় এমন অভিযোগ ছিল দুদক টিমের কাছে।
খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে ২০১৭ সালের ১৯ মে ঝটিকা অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানকালে সঠিকভাবে ফরম পূরণ করে জমা দিতে গেলে আর্থিক লাভের আশায় হয়রানির অভিযোগটির সত্যতা পান।
ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র অর্ধকোটি টাকার কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে ৩ সেপ্টেম্বর অভিযান চালায় দুদক। তাদের প্রাথমিক তদন্তে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুকুলে বরাদ্দকৃত অর্ধকোটি টাকার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে। এ সময় দুদক টিম ওষুধ স্টোরে অভিযান ও রোগীদের সাথে কথা বলা ছাড়াও এইচইডি কাজ পরিদর্শন করেন।
দুদক খুলনার উপ-সহকারী পরিচালক নীলকমল পাল বলেন, প্রাথমিক তদন্তে বেশ কিছু অনিয়ম ও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সরকারি অর্থের সঠিক ক্ষতি ও আত্মসাতের পরিমাণ জানা যাবে।
ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে খুলনা রেলস্টেশনে ৮ আগস্ট অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঈদ সামনে রেখে টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম হচ্ছে-এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ অভিযান চালায় দুদক টিম। এসময় তারা কালোবাজারে বিক্রির জন্য ঈদের ফিরতি ট্রেনের টিকিট ব্লক করে রাখার প্রমাণ পান। এছাড়া স্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধে পেনশন গ্রহণকারী প্রত্যেকের কাছ থেকে ১শ’ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার প্রমাণও মেলে।
দুদক খুলনার উপ-পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, দুদকের অভিযানের কথা জানতে পেরে বুকিং সহকারী মেহেদী স্টেশন থেকে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তাকে ধরে আনে দুদক। ক্ষমা প্রার্থনা করেও মুক্তি মেলেনি বুকিং সহকারী মেহেদীর। তাকে রেল কর্তৃপক্ষ শোকজ করে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে সঙ্গে স্টেশন মাস্টার মানিক লাল সরকারের বিরুদ্ধেও রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত স্টাফদের কাছ থেকে একশ’ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকায় সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে তার সম্পদের হিসাবের তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) লাইসেন্স শাখায় গত ১১ এপ্রিল ঝটিকা অভিযান চালায় দুদক। এ সময় লাইসেন্স শাখায় দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পায় সংস্থাটি। এ ঘটনার পর সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের সাথে সাক্ষাৎ করেন দুদকের টিম। এ সময় মেয়র বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দুর্নীতিতে জড়িত থাকে, তবে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হাসান বলেন, লাইসেন্স শাখায় কিছু দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। যার ফলে ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তে আরও নাম আসতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (অনুসন্ধান) ড. নাসির উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ২০১৭ সালের ৪ জুলাই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় দুদক। তবে এই সময় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। দুদকের পরিচালক জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালাল চক্র ও নানাবিধ অনিয়ম পাওয়া গেছে। অনিয়মের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে, যানবাহনের শ্রেণি পরিবর্তন করে সেতুর টোলের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাতের অভিযোগে গত ১৬ জুলাই রূপসা নদীর ওপর খানজাহান আলী সেতুতে অভিযান চালায় দুদক। দুদক জানায়, রূপসা নদীর ওপর খানজাহান আলী সেতুটির টোল প্লাজায় সরকার নির্ধারিত হারে টোল আদায় না করে সরকারের রাজস্বের ক্ষতি করা হচ্ছে। এমন অভিযোগে অভিযানে দুদক টিম জানতে পারে, টোল গ্রহণে শ্রেণি অনুযায়ী হার নির্ধারণ করা থাকলেও উক্ত সেতুর ইজারার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘ইউডিসি জিআইইটিসি জেভি’র নিয়োগ করা আদায়কারীগণ যানবাহনের শ্রেণি পরিবর্তন করে অর্থ আত্মসাৎ করছেন। আদায়কারীরা বড় ট্রাককে মাঝারি ট্রাক বা ছোট ট্রাক দেখিয়ে, বড় বাসকে মিনিবাস বা মাইক্রোবাস দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব খাতে কম অর্থ জমা দিচ্ছে এবং অবশিষ্ট অর্থ আত্মসাৎ করছে। এ বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করা হয়।
এ ব্যাপারে দুদক খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, দুদক’র ১০৬নং হটলাইনে অভিযোগের কল পেয়ে প্রধান কার্যালয় থেকেই ‘ঝটিকা অভিযানের’ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে নির্দেশনা মোতাবেকই তারা অভিযান পরিচালনা করে থাকেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ