মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আসামে সরকারের কোপে পড়েছে বিদেশী গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা

৫ সেপ্টেম্বর, টাইমস অব ইন্ডিয়া : নাগরিক তালিকা (এনআরসি) থেকে বাদ পড়েছেন ভারতের আসামের ১৯ লাখ মানুষ। নাগরিকত্ব হারানোয় বিপুলসংখ্যক এসব মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ।

এনআরসিতে পরিবারের সবার নাম থাকলেও বাদ পড়েন হাইলাকান্দির সাবিত্রী দেবী। এতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

৩১ আগস্টে প্রকাশিত চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় পরিবারের বাকি সব সদস্যের নাম থাকলেও নাগরিকত্ব হারান সাবিত্রী। এরপর থেকে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে বাথরুমে ঢুকে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। এরপর আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিলচর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয় তাকে। তার দেহ প্রায় ৯৫ শতাংশ পুড়ে যায়। চিকিৎসকেরা সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার তিনি মারা যান। এ দিকে এ ঘটনা জানাজানি হতেই এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এনআরসি থেকে বাদ পড়া অন্যান্য মানুষের মধ্যে আতংক দেখা যায়। নাগরিক তালিকা প্রকাশের দিনই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন আসামের শায়েরা বেগম নামের এক বৃদ্ধা। শোনিতপুরের এই বাসিন্দার নামও বাদ পড়ে তালিকা থেকে।

২০১৫ সালে নাগরিকত্বের তালিকা হালনাগাদ শুরু হওয়ার পর থেকে তালিকা থেকে বাদ পড়ে নাগরিকত্ব হারিয়ে আটক হওয়ার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন অনেক মানুষ। ‘সিটিজেন ফর জাস্টিস এন্ড পিস’ সংস্থার সংগঠক জমশের আলি এ ধরনের ৫১টি আত্মহত্যার তালিকা দিয়েছেন। 

আসামে এক বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কারের খবর নিয়ে তোলপাড়

কাশ্মীরের পর এ বার কি আসাম! রাজ্য জুড়ে এনআরসি সংক্রান্ত গরমিলের ঘটনা সামনে আসতেই সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার অভিযোগ উঠল নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, প্রথম ধাক্কায় মূলত সরকারের কোপে পড়েছেন বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদেরা। সরকার শান্ত বলে দাবি করে এলেও কাশ্মীর যে অশান্ত তা বিদেশি সংবাদমাধ্যমেই প্রথম সামনে এসেছিল। সেই খবরকে অস্ত্র করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয় পাকিস্তান।

এতে অস্বস্তিতে পড়ে সরকার। অস্বীকার করে সব অভিযোগ। জানায়, দেশি-বিদেশি কোনো সংবাদমাধ্যমের উপরেই বিধিনিষেধ জারি করা হয়নি। কাশ্মীরের পরে আসামে এনআরসি নিয়েও এই ধরনের কোনো সংবাদ প্রকাশ হোক তা মোটেই কাম্য নয় সরকারের কাছে। পাকিস্তান জানিয়ে রেখেছে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে সরব হবে। ওই বৈঠকের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘন-সংক্রান্ত কোনো তথ্য যেন বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, তার জন্য তলে-তলে সক্রিয় রয়েছে নয়াদিল্লি। অভিযোগ উঠেছে, নেতিবাচক খবর রুখতে সব বিদেশি সাংবাদিককে আসাম ছাড়তে বলা হয়েছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের এক বিদেশিনি সাংবাদিককে পুলিশ পাহারায় বিমানবন্দরে ছেড়ে আসা হয়েছে। আসামকে সংরক্ষিত এলাকা বা‘প্রোটেকটেড এরিয়া’ বলে দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। যেখানে যেতে নিতে হবে ‘প্রোটেকটেড এরিয়া পারমিট (পিএপি)’। ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। আসামের স্বরাষ্ট্র দফতরও জানিয়েছে, কোনো বিদেশি সাংবাদিককে রাজ্য থেকে বার করে দেয়া হয়নি। অসমকে ‘প্রোটেকটেড এরিয়া’ ঘোযণা করে কোনো নির্দেশও জারি হয়নি। যাদের সাংবাদিককে বার করে দেয়া হয়েছে বলে খবর, সেই সংস্থাও জানায়, ওই সাংবাদিক স্বেচ্ছায় অসম থেকে ফিরে এসেছেন। তাকে জোর করা হয়নি।

এতে বলা হয়, একটি বিষয় স্পষ্ট, ভবিষ্যতে সরকার-বিরোধী খবর রুখতে চাইলে বিধিনিষেধ জারি করতে পারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্তা পবনকুমার বাধে আনন্দবাজারকে বলেন, ‘‘শুধু আসামই নয়, জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্বের সব রাজ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয় বিদেশি সাংবাদিকদের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পরে সেই অনুমতি দেয়া হয়। এটা নতুন নিয়ম নয়। এর সঙ্গে এনআরসির সম্পর্ক নেই।’’ এ প্রসঙ্গে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির ৮২ নম্বর ধারা উদ্ধৃত করেন। পরে মন্ত্রণালয়ে টুইট করে জানায়, খবরটি ভুয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘প্রোটেকটেড এরিয়া’র তালিকায় হিমাচলপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরের অংশবিশেষ, অরুণাচল, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিমের নাম থাকলেও আসাম নেই। তবে কেন আসামে আসতে ‘পিএপি’-র ধাঁচে অনুমতিপত্র লাগবে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুখ খোলেনি। পবন জানান, ‘পিএপি’ ও এই অনুমতিপত্র এক নয়। বিদেশি সাংবাদিকদের উত্তর-পূর্বে যেকোনো এলাকায় আসতেই অনুমতি লাগে।

আন্তর্জাতিক সমালোচনা রুখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুখপাত্র রবীশ কুমার আগেই বলেছেন, এনআরসির সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নেই। তা সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত ও পরিচালিত প্রক্রিয়া। তার দাবি, মানবাধিকার ভঙ্গের কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু মুখ বন্ধ করা যাচ্ছে না অসমের মানুষের। চুপ নেই সংবাদমাধ্যমগুলিও। তাই প্রশ্ন উঠছে, মন্ত্রণালয়ের ‘সূত্র’ মারফত ইচ্ছাকৃত ভাবেই কি ছড়ানো হলো ঘটনাহীন রটনা! যাতে অন্তত বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে কৌশলে আসাম থেকে দূরে রাখা যায়!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ