শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কাশ্মীর নিয়ে ইমরান খানের সঙ্গে সৌদী-আমিরাত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

সংগ্রাম ডেস্ক : কাশ্মীর সংকট নিরসনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত বুধবার পাকিস্তান সফরে এসে ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করেন তারা।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম জিয়ো নিউজ উর্দুর খবরে বলা হয়, সৌদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল-জুবায়ের ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান বুধবার একদিনের সফরে পাকিস্তান পৌঁছালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি তাদের বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান। জিয়ো নিউজ উর্দু, রয়টার্স, পার্সটুডে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলেন মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী দফতরের দেয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ও উপত্যকাটির সবশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে ইমরান খান সৌদী ও আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। বিশেষত গত এক মাস যাবৎ সেখানে কারফিউর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।

কাশ্মীরে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ উপত্যকাটিতে বসবাসের স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি।

ইমরান খান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি সরাতে ভারত নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি করবে বলেও আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী দফতরের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠকে সৌদি ও আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ দেশের অবস্থান ব্যক্ত করেন।

পাকিস্তানের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কের কথা জানিয়ে তারা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রতি জোর দেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কাশ্মীরের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সৌদী ও আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টির শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানে সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। শান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশ দু’টি সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলেও আশ্বাস দেন তারা।

পার্সটুডের খবরে বলা হয়, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ইস্যুতে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ অবস্থান গ্রহণ করার জন্য সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি অনুরোধ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তান ও কাশ্মীরের জনগণ যখন মুসলিম বিশ্ব থেকে জোরালো সমর্থন আশা করছে তখন ইসলামাবাদ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে এই অনুরোধ জানালো।

গত ৫ আগস্ট বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার এবং ভারতের সঙ্গে একীভূত করে নিয়েছে। এ অবস্থায় যখন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর নীরবতার কারণে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের জনগণের ভেতরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে তখন ইসলামাবাদ এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ভারতের ওই পদক্ষেপের ব্যাপারে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশ অনেকটা নীরব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

এ অবস্থার ভেতর দিয়ে গতকাল সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জোবায়ের এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান একসঙ্গে ইসলামাবাদ সফর করেন। তাদের এই নজিরবিহীন ঐক্যবদ্ধ সফরের ভেতর দিয়ে পাকিস্তানের প্রতি এ দুই দেশের সমর্থনের বিষয়টি আশ্বস্ত করা হয়েছে।

দুই মন্ত্রী প্রথমে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশির সঙ্গে। এরপর তারা বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে- প্রতিটি বৈঠকেই কাশ্মীর ছিল মূল এজেন্ডা।

যদিও সরকারি বিবৃতিতে এ সমস্ত কথা বলা হয়নি তবে বিভিন্ন সূত্র পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে যে, কাশ্মীরের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব অতিসম্প্রতি যে সম্মাননা দিয়েছে তাতে পাকিস্তানের জনগণের ভেতর প্রচ- ক্ষোভ এবং হতাশা তৈরি হয়েছে। ক্ষোভ নিরসনের জন্য সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুই মন্ত্রী ইসলামাবাদ সফর করেছেন। তারা কাশ্মীর পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোর ব্যাপারে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেন।

‘পাকিস্তানী সেনাদের লাশের ওপর দিয়ে কাশ্মীর নিয়ে চুক্তি করতে হবে’

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কাশ্মীর নিয়ে যেকোনো ধরনের আপসকামী চুক্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে, পাকিস্তানের সেনাদের লাশের উপর দিয়ে এ ধরনের চুক্তি হতে পারে।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিফ গফুর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমি কাশ্মীরের জনগণকে এই বার্তা দিতে চাই যে, আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং এই সমর্থন অব্যাহত থাকবে।”

কাশ্মীরকে পাক সামরিক বাহিনীর জন্য ‘ধমনী’ উল্লেখ করে জেনারেল গফুর বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যা প্রয়োজন তার সবই করতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, কাশ্মীর হচ্ছে আমাদের ধমনী এবং এর জন্য আমরা শেষ বুলেট পর্যন্ত, শেষ সেনা এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করব। জেনারেল গফুর ভারতকে সতর্ক করে বলেন, যখন কোনো জাতির সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে তখন তারা যুদ্ধ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া; ডানপাশে কাশ্মীরের কারফিউয়ের মধ্যে টহল দিচ্ছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা  

তিনি বলেন, “যুদ্ধ শুরু করার জন্য আমাদের অর্থনীতি দুর্বল নয়, আমাদের কাশ্মীরী ভাইদের সাহায্যের জন্য আমরা আমাদের পকেটের দিকে তাকাবো না।”

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার আমেরিকা সফরের সময় কাশ্মীর নিয়ে চুক্তি হয়েছে কিনা- এমন এক প্রশ্নের জবাবে  জেনারেল আসিফ গফুর বলেন, “এটি সম্পূর্ণভাবে গুজব, এর কোন ভিত্তি নেই।”

তিনি বলেন, “আপনারা কি করে ভাবেন যে, কাশ্মীর ইস্যুতে এই ধরনের চুক্তি সম্ভব? কাশ্মীর নিয়ে যেকোনো ধরনের চুক্তি হবে আমাদের লাশের উপর দিয়ে। গত ৭২ বছর ধরে কাশ্মীর সম্পর্কে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে, এখন কেন পরিবর্তন হবে?”

আইএসপিআরের মহাপরিচালক বলেন, সামরিক বাহিনী পাকিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের অবদান রয়েছে। ভারত যদি কোনোরকম মিথ্যা অজুহাত তুলে আগ্রাসনের চেষ্টা চালায় তাহলে তার কঠোর এবং দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ভারতকে জানা উচিত যে, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে হয় না; এর জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষতা, কৌশল এবং আত্মোৎসর্গের প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মধ্যে এর সবই রয়েছে।

কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ফোনালাপ

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে মতবিনিময় করেছেন। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল কাসেম মোহাম্মদ আব্দুল মোমিনের সঙ্গে টেলিফোনালাপে পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে ভারত সরকারের গৃহীত একতরফা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, নয়াদিল্লীর এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের বিপর্যয়কর ও মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, অবরোধের কারণে সেখানে তীব্র খাদ্য ও ওষুধ সংকট চলছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা বিধানের নামে ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীরে যে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে তাতে সেখানকার শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এ টেলিফোন সংলাপে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।   

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের মাধ্যমে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেছে পাকিস্তান সরকার যাতে নয়াদিল্লী কাশ্মীরের ব্যাপারে তাদের নীতি পুনর্মূল্যায়ন করে। পাকিস্তান সরকার চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাশ্মীর বিষয়ে মতবিনিময় করেছে এবং এ ব্যাপারে ওই দেশগুলোর সমর্থন লাভের চেষ্টা করেছে।

ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তান বিষয়টিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও উত্থাপন করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কাশ্মীর বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা এবং ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনালাপে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের একতরফা পদক্ষেপের ব্যাপারে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করতে তিনি চেষ্টা চালিয়েছেন।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র এবং এর মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ হচ্ছে মুসলমান। এ কারণে দেশটির কর্মকর্তারা কাশ্মীরের মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব ও তাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করবে বলে সকলের প্রত্যাশা। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে আশ্রয় দেয়ায় কাশ্মীরের মুসলমানদের ব্যাপারেও ঢাকা কর্তৃপক্ষ একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে এবং তাদের প্রতি সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ