শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জনগণের টাকায় নির্মিত সড়কে পাইকারি টোল আরোপ অযৌক্তিক

 

এইচ এম আকতার: সড়কে টোল আরোপ নিয়ে জনমনে বিরাজ করছে বিভ্রান্তি। কী হবে, না হবে, তা কেউ জানে না। গত ২৪ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘টোল নীতিমালা ২০১৪’ অনুমোদন করা হয়। এর একদিন পরই যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে জানান যে, পুরোনো সড়কে টোল বসছে না! কিন্তু টোল নীতিমালায় বলা হয়েছে এর উল্টো কথা পৃথিবীর কোন দেশের সব সড়ক মহাসড়কে টোল নেই। যেখানে টোল রয়েছে সেখানে বিকল্প সড়ক রয়েছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ(পিপিপি) এর মাধ্যমে কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত রাস্তায় টোল রয়েছে। জনগণের টাকায় নির্মিত সড়কে পাইকারি টোল আরোপ অবান্তর।

জানা গেছে, প্রতিটি বাজেটেই সড়ক মহাসড়ক নির্মাণ এবং মেরামতে বরাদ্দ থাকে। যা দিয়ে সারা বছর মহাসড়ক উন্নয়ন এবং মেরামত করা হয়ে থাকে। এ নিয়ে বছরের মাঝখানে নতুন করে মহাসড়ককে টোলের আওতায় আনার তোন প্রয়োজন নেই। তাহলে কি কারণে হঠাৎ করে সরকার মহাসড়ক টোলের নীতিমালা করলো। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উকি দিচ্ছে।

জানা গেছে, যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে এ বছরের বাজেটে। কারণ যোগাযোগ খাতে মেগা সব প্রকল্পের কাজ চলছে। যা শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগে যাবে। এ কারণে এ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়। তার পরেও আবার কি কারণে মহা সড়ক টোল বসাতে হবে তা জানতে চায় সাধারন জনগন। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে এক মুরগী দু’বার জবাই করার মত। নিয়মিত বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে। এর সাথে নতুন করে সব মহাসড়কে টোল বসানো।

নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যদি তা কার্যকর করা হয় তাহলে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। কারণ প্রতি পণ্য বহনে পরিবহনকে সড়ক মহাসড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। জ¦ালানি তেল প্রতিটি জেলায় উপজেলায় পৌছাতে পরিবহণ ব্যবহার করতে হয়। এভাবে প্রতিটি পণ্য কিংবা সেবা সড়ক মহাসড়কের সাথে সম্পৃক্ত। আর এ কারণেই মহাসড়রক টোল আদায় করা হলে জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

সরকার প্রণীত টোল নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের সব জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক-মহাসড়ক, জেলা সড়ক ও উড়াল সড়কে গাড়ি চালানোর জন্য নির্ধারিত হারে টোল দিতে হবে। নীতিমালা হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদে পাস করার প্রয়োজন পড়বে না। এ ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে রয়েছে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী ইত্যাদি মহাসড়ক। আঞ্চলিক মহাসড়ক হলো, সিলেট-তামাবিল সড়ক, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক, ঢাকা-কালীগঞ্জ-ঘোড়াশালের মতো সড়কগুলো। আর জেলা সড়ক বলতে জেলা সদর ও উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী সড়ককে বোঝানো হচ্ছে। যানবাহন ভেদে সর্বনিম্ন ৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা টোল আরোপ করা হবে। কনটেইনারবাহী ট্রেইলার, ট্রাক, বাস থেকে শুরু করে রিকশা, ভ্যান, বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ি সব ধরনের যানবাহন ১৩টি ক্যাটাগরিতে টোলের আওতায় আসবে। এছাড়া সব সেতু ও ফেরিতে একক কাঠামোর আওতায় টোল আদায় করা হবে। 

নীতিমালা অনুযায়ী, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবহারে ট্রেইলারের টোল হবে ১ হাজার টাকা, ভারী ট্রাক ৮০০, মাঝারি ট্রাক ৪০০, বড় বাস ৩৬০, ছোট ট্রাক ৩০০, মিনিবাস ২০০, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যানবাহন (ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার) ২৪০, মাইক্রোবাস, পিকআপ ১৬০, ব্যক্তিগত গাড়ি ১০০, অটোরিকশা, টেম্পো ৪০, মোটরসাইকেল ২০ ও রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ১০ ও বাইসাইকেল ৫ টাকা।

 জাতীয় মহাসড়ক ব্যবহারে টোলের হার হবে উল্লিখিত পরিমাণের চার ভাগের তিন ভাগ, আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষেত্রে অর্ধেক ও জেলা সড়কের ক্ষেত্রে চার ভাগের এক ভাগ। তবে দৈর্ঘ্য ভেদে টোলের হার পরিবর্তন হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার চাইলে যেকোনো সড়ককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করে সর্বোচ্চ হারে টোল আরোপ করতে পারবে। 

এদিকে ২০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যরে সেতুর ওপর টোল আরোপ করা হবে না। তবে ২০১ থেকে ৫০০, ৫০১ থেকে ৭৫০, ৭৫১ থেকে ১ হাজার ও ১ হাজার মিটারের অধিক দৈর্ঘ্যরে সেতুর জন্য নির্ধারিত হারে টোল দিতে হবে। এক্ষেত্রে যানবাহনের আকার ভেদে টোলের হার নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া ফেরি ও ফেরির স্থলে নির্মিত সেতুর জন্য টোল দিতে হবে। ফেরির স্থলে নির্মিত সেতুর দৈর্ঘ্য ২০০ মিটারের কম হলেও কমপক্ষে এক বছর টোল আদায় করা হবে। প্রসঙ্গত, টোল নীতিমালা অনুমোদন সংক্রান্ত লিখিত আদেশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগমন্ত্রীর অনুমোদনের পর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। এজন্য ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে। গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই নতুন নীতিমালা কার্যকর হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, এ নীতিমালা বাস্তবায়নের কোনো তারিখ বেঁধে দেওয়া হয়নি। সড়ক বিভাগ তাদের সুবিধামতো সময়ে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করবে।

গত ২৪ মার্চ মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘টোল নীতিমালা ২০১৪’ অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, সড়ক ও সেতু থেকে আদায় করা টোল সড়ক উন্নয়ন তহবিলে যাবে, যা দিয়ে সড়ক কাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। টোল আদায়ের পদ্ধতিকে স্বচ্ছ, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতেই এ নীতিমালা।

 তিনি আরও জানান, টোলের বিদ্যমান হার বাড়লেও সিগনিফিক্যান্ট কোনো ইমপ্যাক্ট হবে না। দ্রব্যমূল্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। আদায় করা টোলের পরিমাণ আমাদের ওভারঅল জিডিপির তুলনায় অনেক কম। সড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক এ প্রসঙ্গে বলেন, আগে একেক সময় একেক সেতুর টোল আদায়ের জন্য বারবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে যেতে হতো। স্থানীয় জনগণ আবার তা মানতেন না। এ কারণে টোলের হার নির্ধারণ নিয়ে সময়ক্ষেপণ ও নানা তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হতো। এজন্য টোল আদায়ের নীতিমালাটি করা হয়েছে। তাতে সব বিষয় সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। মহাসড়কে রিকশা ও ঠেলাগাড়ি চলাচল নিরুৎসাহিত করতে টোলের হার নির্ধারণে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। টোল নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মহাসড়ক ব্যবহারে এর আগে টোল আরোপ করা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য টোল দিতে হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও নির্দিষ্ট কিছু মহাসড়কে টোল রয়েছে। তবে বাংলাদেশে চাইলেও তা চালু করা সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে বিধানটি চালু করা হচ্ছে। বিষয়টি কার্যকর করতে বেশ কিছু সময় লাগবে।

প্রধানত সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তিগুলো দেয়া হয়েছে তাতে বলা হচ্ছে, টোল নীতিমালা না থাকার ফলে টোল ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছিল। এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে সড়ক বিভাগ উন্নত হবে। যাত্রীরা আগের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীও এর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা সেবা দিতে পারলে জনগণ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না। সরকারের পক্ষ থেকে আরও যুক্তি দেয়া হচ্ছে যে, প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ ইউরোপ, আমেরিকার সর্বত্রই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে টোলের ব্যবস্থা চালু আছে। এছাড়া কিছু যানবাহনকে মহাসড়ক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতেই তাদের ওপর টোল আরোপ করা হয়েছে বলেও যুক্তি এসছে। যদিও সরকার নানা ধরনের যুক্তি দিচ্ছে।

 তবে টোল নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মূলত বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুসরণ করে এ নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সওজের বিভিন্ন সড়ক ব্যবহারের ওপর চার্জ আদায় করে তা থেকে সড়ক-মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ১৯৯৩ সালে পরামর্শ দেয় বিশ্বব্যাংক। তবে নীতিমালা না থাকায় গত দুই দশকে তা সম্ভব হয়নি। টোল নীতিমালায় বলা হয়েছে, আদায়কৃত টোল সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলে জমা হবে, যা দিয়ে দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক মেরামত করা হবে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এভাবে সড়কে টোল আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়াটাকে আত্মঘাতী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

 বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সড়কে টোল আদায়ের কারণে জনদুর্ভোগ বাড়বে। বাস-ট্রাকের ভাড়া বাড়বে। যাতায়াত ব্যয় বাড়বে। এর পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে, যা রপ্তানি বাণিজ্যকে চাপে ফেলবে। এই সুযোগে বাস-ট্রাক মালিকরা ভাড়া কয়েকগুণ বাড়াবেন। এতে জনগণের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না। লাভ যা হবে তা বাস-ট্রাক মালিকের। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা আমাদের মতো গরিব দেশের ক্ষেত্রে কী ভয়াবহ পরিণাম বয়ে আনতে পারে তা তো আমরা দেখছি। তারা বাণিজ্যিকীকরণের দিকে সবকিছু ঠেলে দিতে চায়। গরিব জনগণের অবস্থা কী হবে, তা তারা ভাবে না। তারা ভাবে পুঁজিপতিদের কথা। তাদের পরামর্শে সব সময় পুঁজিপতিরা লাভবান হয়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটবে। এ সরকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এমন মূর্খের মতো কথা বলবেন, এটা আমি ভাবিনি। কীভাবে তিনি বলছেন যে, এর কোনো প্রভাব জনজীবনে পড়বে না? স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে। যেসব যানবাহনে করে খাদ্যপণ্য পরিবহন করা হয় তার ওপর টোল বসানো হলে সেই টোল কয়েকগুণ হয়ে খাদ্যপণ্যের ওপর পড়বে। এখানে যারা সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করেন, টোল বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে তারা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াবেন অনেক বেশি হারে। এটা জনগণের ওপর বিরাট বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হবে।

সড়ক-মহাসড়কে টোল ধার্য করা হলে তা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। বিদ্যুতের দাম বাড়ার রেশ কাটতে না কাটতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। সেবা খাতে এভাবে একের পর এক মূল্যবৃদ্ধি বা করারোপের ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাপন ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এই টোল আরোপের ফলে বাস ভাড়া বাড়বে, পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে। রপ্তানি পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না দেশের অনেক পণ্য। সব মিলিয়ে একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হবে।

বিশিষ্ট নাগরিকেরা এবং রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরকারের উচিত হবে সড়ক ব্যবহারকারী দেশের সাধারণ মানুষসহ সব মহলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নীতিমালা তৈরি করা। এককভাবে কোনো অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত সরকার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। তা হবে সরকারের জন্য একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর মাশুল তাদেরকে দিতে হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। সেই দুর্নীতির জন্য দাতারা এখন আর টাকা দিচ্ছে না। সরকারের দুর্নীতির মাশুল কেন জনগণ দেবে?

 বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই সরকার অবৈধ পথে ক্ষমতায় এসেছে। এখন তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তাদের এজেন্ডা হচ্ছে লুটপাট করা। এই করারোপ জনগণকে নির্যাতনের জন্য সরকারের নতুন পদক্ষেপ। জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর ওপর মহাসড়কে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সড়ক পথে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ডাকাতি ও দুর্ঘটনা বন্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকারি দলের লোকজনের পকেট ভারী করার জন্যই সড়ক পথে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এটা জনগণের ওপর আরেকটি জুলুম ও অত্যাচার করা হবে। এর আগে তারা বিদ্যুৎ, গ্যাস, জাতীয় অর্থনীতিকে লোপাট করেছে। কুইক রেন্টালের মাধ্যমে জনগণের পকেট কেটেছে। এখন আবার তারা জনগণের পকেট কেটে লোপাট করার জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। রাতে মহাসড়কে ডাকাতি হচ্ছে। জনগণের চলাচলের নিরাপত্তা দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিলে ভিন্ন কথা ছিল। সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনীতির নানা খাতে এর প্রভাব পড়ছে। এখন সরকার তার দায় জনগণের কাঁধে চাপাচ্ছে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও একই রকম। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, বাসদের কেন্দ্রীয় কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটি এই সিদ্ধান্তকে জনগণকে চাবুক মারার শামিল গণ্য করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। 

সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেবে। সড়ক ব্যবহারের জন্য যদি সরকার টোল আদায় করে তবে জনগণের উচিত হবে সরকারকে কর দেওয়া বন্ধ করা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনগণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেবে। সরকার এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করলে সিপিবি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবে। 

সরকার যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সড়কে টোল ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, এটা একেবারে ডাহা মিথ্যা কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম হচ্ছে, সরকার নিয়ন্ত্রিত সড়কে কোনো টোল দিতে হয় না। সাধারণত ইউরোপ, আমেরিকার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে একাধিক সড়ক বা উড়ালসেতুর ব্যবস্থা থাকে। সাধারণ জনগণ সরকারি সড়কে চলাফেরা করেন। আর যারা বেশি টাকা ব্যয় করতে সক্ষম তারা যানজটমুক্ত হয়ে দ্রুত যাওয়ার জন্য বেসরকারিভাবে নির্মিত সড়ক বা উড়ালসেতু ধরে যাতায়াত করেন। এজন্য তারা টোল দেন। কিন্তু সরকারি সড়কের ক্ষেত্রে কোথাও জনগণকে কর দিতে হয় না। এসব সড়কে কিছুটা যানজট থাকে। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনার সড়কগুলো দিয়ে দ্রুত যাতায়াত করা যায়। কারণ টোল গুনে সবাই তাতে ওঠে না। যেখানে টোল দিতে হয়, তার আশেপাশে অবশ্যই টোলবিহীন সড়কও থাকে, যা দিয়ে সাধারণ জনগণ যাতায়াত করে। 

ঢাকার ভেতর থেকে হাইওয়ে- সর্বত্র ভয়ঙ্কর যানজট। যানজটে বসে থেকে কেন মানুষকে অতিরিক্ত টোল দিতে হবে, এটা সাধারণ প্রশ্ন। পৃথিবীর কোনো দেশে এমন নিয়ম নেই। ভারতে টোল আছে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি একই সঙ্গে আমাদের বঙ্গবন্ধু সেতুর চেয়ে সেদেশের অনেক বড় বড় সেতু সম্পূর্ণ টোলমুক্ত। দুবাই-সিঙ্গাপুরের রাস্তায় টোল দিতে হয়। টোল দিতে হয় জাপানের রাস্তায় ও ফ্লাইওভারেও। দুবাই-সিঙ্গাপুর-জাপানের মানুষের আয়, তাদের অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের পরিকল্পনাবিদদের ধারণা নেই বিধায় তারা দুটোকে এক করে দেখছেন। কোরিয়াতে শুধু টোল দিতে হয় হাইওয়েতে। যারা টোল দিতে না চায়, তারা লোকাল রাস্তা নির্বাচন করতে পারে। সেই সুযোগ দেয়া হয় এবং এর অনেক বিকল্প আছে। যানজটমুক্ত অনেকগুলো লেনের কারণে বেশির ভাগ মানুষ এখানে টোল দিয়ে হাইওয়েকেই নির্বাচন করে। এই টাকাটা তারা দেয় বিশেষ সুবিধা ভোগের নিমিত্তে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি, হল্যান্ড ও বেলজিয়ামের হাইওয়েতে কোনো টোল নেই। ইতালিতে হাইওয়েতে টোল আছে কিন্তু বড় শহরের মধ্যে ঢুকতে-বেরোতে প্রায় ১০/২০ কিলোমিটার ফ্রি। যেমন ভেনিস, মিলান। ফ্রান্সেও এমনই। টোলযুক্ত হাইওয়েগুলো করার মূল উদ্দেশ্য হলো, দূরের শহরে যেতে যেন থামতে না হয়, অর্থাৎ ট্রাফিক সিগনালমুক্ত রাস্তা। এসব রাস্তায় সর্বোচ্চ গতি ১৩০ কি.মি.। পাশাপাশি টোল ফ্রি রাস্তা আছে। যা দিয়ে সব শহরেই যাওয়া যায়। এসব রাস্তাও অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সিগনাল মুক্ত তবে সর্বোচ্চ গতি সীমা ৯০ কি.মি.।

সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামসুল হক বলেন, মহাসড়কের সেতু ও সড়ক থেকে টোল আদায়ের নিয়ম ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আছে। তবে তা এমনভাবে নয় যে, সবাইকে দিতেই হবে। সাধারণত গরিব জনসাধারণের জন্য বিকল্প সড়ক থাকে। সেতুর ক্ষেত্রে অবশ্য অধিকাংশ জায়গায় সবাইকেই টোল দিতে হয়। আমাদের দেশে যদি সেবা দেওয়া নিশ্চিত করা হয়, তাহলে আরও কিছু ক্ষেত্রে টোল আদায় করা অযৌক্তিক নয়। টোল থেকে আদায় হওয়া অর্থে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করে চলাচলের আরামদায়ক সড়ক ব্যবহার করতে পারলে এ টোল নেওয়া যায়। তবে একসঙ্গে টোল আদায় করলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বহন করা কষ্টকর হবে। আর এ টোল আদায় করাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজরা সংগঠিত হবে। এসব বিষয়ে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে।

 স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুদারের মতে, মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সরকারের দুর্নীতির কারণে এখন দাতারা সড়ক খাতে তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের দুর্নীতির মাশুল কেন দেশের সাধারণ নাগরিকদের দিতে হবে?

 তিনি বলেন, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি কমালে এবং প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ করা হলে কাজের মান বাড়বে। অর্থের অপচয়ও রোধ হবে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর স্থায়িত্বও দীর্ঘস্থায়ী হবে। সরকার এই সিদ্ধান্ত এককভাবে নিলে তা হবে অযৌক্তিক ও জনবিরোধী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ