বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্যারাম্বুলেটর

হেলাল আরিফীন : প্যারাম্বুলেটরে চাঁদের মতো ফুটফুটে একটা শিশুকে নিয়ে রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সবুজ। ওকে ঘেঁষেই শাঁ শাঁ করে ছুটে যাচ্ছে নানান ধরনের গাড়ি। পথচারীরা ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শিশুটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ আবার সবুজকে সাবধান করে দিচ্ছে যেন কোন গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে না যায়। প্যারাম্বুলেটরে বাবার সাথে হেঁটে যাওয়া আজকের এই শিশুটি হয়তো একদিন বড় হবে। তারপর এই শহরেরই কোন একটা রাস্তা দিয়ে এরকম কোন একটা গাড়ি চালিয়ে যাবে হয়তো। কিম্বা ততদিনে হারিয়েও যেতে পারে প্রকৃতির অতল গহব্বরে। কেননা মানুষকে তো ঝড় ঝাঞ্ঝা, অনেক বিপদ আপদ পেরিয়েই বড় হতে হয়।

মাঝবয়সী একজন লোক। মুখ ভর্তি কাঁচা পাকায় মেশান খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাতে পুরনো ধরণের একটা এ্যাটাচি ব্যাগ। লোকটি শিশুটির দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে  যেন শিশুটি তার খুব পরিচিত বা নিজের কেউ। শিশুটির মুখের দিকে অস্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে সবুজের কেমন সন্দেহ হলো। এ ব্যাটা ছিনতাইকারী নয় তো ? শিশু ছিনতাইকারী ? 

আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ভাণ করে আমার সোনামণিটাকে নিয়ে  হঠাত দৌড় দিল। তারপর ভিড়ের সাথে মিশে গিয়ে একটা বাসে উঠে অদৃশ্য হলো। আরে না, আমি একটু বেশীই ভাবছি। ঢাকা শহরে অনেক কিছুই ছিনতাই হয়, তাই বলে শিশু ছিনতাই এমনটা শোনা যায়নি কখনও। শোনা না গেলে কী হবে, কোনকিছুই অসম্ভব নয় ইটপাথরের এই শহরে। বরং চুপ না থেকে কথা বলে দেখি লোকটার উদ্দেশ্য কী ? 

সবুজ লোকটির উদ্দেশ্যে বলল, এই যে ভাই, কী, কী দেখছেন ? অনেকক্ষণই তো ওকে দেখলেন, এখন একটু সরে গেলে ভালো হয়। 

লোকটিকে বেশ অন্যমনস্ক মনে হচ্ছে। সবুজের কথা শুনতে পেয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। লোকটি মৃদু হেসে বলল, আপনার সোনামণিটাকে একটু কোলে নিই ? 

সবুজ লোকটির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। না, এর উদ্দেশ্য  ভালো মনে হচ্ছে না। যখন তখন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। 

লোকটি  ইতস্তের গলায় বলল, কী ভাবছেন ? সোনামণিটাকে একবার কোলে নিতে চাইলাম। 

সবুজ ব্যস্ত হয়ে বলল, না, না, আপনি যান। আমার ছেলে অপরিচিত কারো কোলে থাকে না। অপরিচিত কেউ ওকে কোলে নিলে খুব কান্না করে।  লোকটি ঝটপট বলল, কাঁদবে না, আমি একটু কোলে নিলাম। 

কথাটা বলার পর শিশুটিকে প্যারাম্বুলেটার থেকে তুলে নিতে নিলে সবুজ বাধা দিয়ে বলল, না, ধরবেন না আমার সোনামণিকে। আপনাকে বললাম না ও কাঁদবে। 

সবুজের বাধার মুখে এক রকম জোর করেই শিশুটিকে কোলে তুলে নিল লোকটি। আর কোলে তুলে নিতেই শিশুটির মুখে নির্মল হাসি ফুটে উঠল। শিশুটির চাঁদপনা সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটি আনমনা হয়ে চুপচাপ কী ভাবছে কে জানে। কিন্তু সবুজের উঁচু স্বরের কথায় পথচারীদের একটা অংশ ওদেরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গেছে। 

বলিষ্ঠ চেহারার এক যুবক। বয়স ২৫॥২৬ হবে। সে এগিয়ে এসে অতি উৎসাহের গলায় বলল, কী হয়েছে ভাই ? লোকটি আপনার বাচ্চাকে কোলে নিয়েছে কেন ? চেহারা সুরত দেখে তো ভাল মনে হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য খারাপ মনে হচ্ছে। 

ওদেরকে ঘিরে জোটপাকানো লোকগুলোর ভেতর থেকে লোকটির উদ্দেশ্যে একেকজন একেক কথা বলছে। কিন্তু কোনদিকেই  লোকটির কোন খেয়াল নেই। সে শিশুটিকে গভীর আগ্রহে আদর করছে। এবং আদর করতে করতে হঠাৎই সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। অতি উৎসাহী যুবকটি পেছন থেকে এসে লোকটির শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, এই ব্যাটা, কই যাস ? বাচ্চাটা দে ব্যাটা ধান্দাবাজ  !

পেছন থেকে আরেকজন অতি উৎসাহী  যুবক এসে লোকটিকে একটি উঁচু গ্রামের ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বলল, এই শালা শিশু পাচারকারী। আপনারা এখনও দাঁড়াইয়া আছেন ক্যান ? মারেন শালারে। 

পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে সবুজ লোকটির কোল থেকে বাচ্চাটিকে জোরপূর্বক নিজের বুকে টেনে নিল। জটলা দেখে ওদের পাশে হঠাৎ একটি পুলিশ ভ্যান এসে থামল। একজন পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নেমে এসে দরাজ গলায় বললেন, কী হয়েছে এখানে ? ভিড় কীসের ? 

অতি উৎসাহী প্রথম যুবকটি বলল, স্যার, ওনার এই বাচ্চাটিকে এই লোকটি  প্যারাম্বুলেটার থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। 

পুলিশ অফিসার সবুজের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা আপনার বাচ্চা ?

জি স্যার। 

এই লোকটি কি আপনার বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল ?

জি  স্যার। এই লোকটিই  আমার বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। 

পুলিশ অফিসার পাশে দাঁড়ানো  সেন্ট্রিকে বললেন, একে গাড়িতে তোল। 

পুলিশ কাস্টডিতে একজন যুবকের সাথে রাখা হয়েছে লোকটিকে। যুবক ছেলেটি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, সবজি আছে ?

মানে ? সবজি থাকব ক্যান ? 

ও, আপনে তো দেখছি এই লাইনের না ? তাহলে আপনে কোন লাইনের ? 

লোকটি রাগি গলায় বলল, দ্যাখেন, অযথা বক বক করবেন না। আমি কোন লাইন ফাইন কইরা এইখানে আসি নাই ? 

যুবক ছেলেটি হেসে বলল, লাইন ফাইন কইরা এইখানে আসেন নাই ? পুলিশ তাহলে আপনারে ক্যান আনছে? জামাই আদর করার জন্য ?

একজন পুলিশকে এদিকে আসতে দেখে যুবক ছেলেটি আবারও হেসে বলল, ওই যে আসছে, আপনার শ্বশুর আসছে। আপনারে একটু আদর যতœ  করবে মনে হচ্ছে। 

লোকটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য অন্য  আরেকটি রুমে নিয়ে যাওয়া  হল। সেখানে আগে থেকেই একজন পুলিশ অফিসার বসে ছিলেন। লোকটিকে তার সামনে একটি চেয়ারে বসতে দেয়া হল। পুলিশ অফিসার চোয়াল শক্ত করে কঠিন গলায় বললেন, নাম কি তোর ? আসল নাম বলবি। কোনরকম চালাকি করার চেষ্টা করবি না। 

লোকটি কম্পিত গলায় বলল, সাদেক আলি।

পুলিশ অফিসার বললেন, এই কাজে তোর সাথে আর কে কে আছে তাদের নাম বল। 

স্যার, আমি ছেলে ধরা না।

পুলিশ অফিসার থমথমে গলায় বললেন, তুই ছেলে ধরা না, তুই তাহলে কী ? 

স্যার, আমি একজন জ্যোতিষী। 

পুলিশ অফিসার রাগি  গলায় বললেন,এসব উল্টাপাল্টা কথা বলে লাভ নাই। ভালই ভালই সত্যি কথা বল। তা না হলে পিঠের চামড়া কিন্তু রাখব না ! 

সাদেক আলি ভয়ে কয়েকবার ঢোক গিলে বলল, স্যার, বিশ্বাস করেন, আমি সত্যিই একজন জ্যোতিষী। 

এবার পুলিশ অফিসারটির মুখে  তাচ্ছিল্ল্যের হাসি ফুটে উঠল - তুই সত্যিই একজন জ্যোতিষী ? 

সত্য কথা স্যার। 

পুলিশ অফিসার সাদেক আলির  চোখের সামনে অবজ্ঞাভরে ডান হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,আমার হাতটা তাহলে একটু দেখে দে তো ?

পুলিশ অফিসারটির বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে এক নজর তাকাতেই সাদেক আলির চেহারায় কালো ছায়া পড়ল। পুলিশ অফিসার হেসে বললেন, কী, একদম চুপ মেরে গেলি যে ? আমার হাতটা দেখে একটা কিছু বল। 

সাদেক আলি কম্পিত গলায় বলল, স্যার, আপনার খুব একটা খারাপ খবর আছে !

পুলিশ অফিসার এবার অট্টহাসিতে প্রায় ফেটে পড়ে বললেন, খারাপ খবর ? তা কী খারাপ খবর বল শুনি ?

পকেটে মোবাইল সেটটিতে রিং হতে  থাকলে তিনি হাসি  থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, দাঁড়া, ফোনটা আগে  রিসিভ করে নিই। তারপর তোর মুখ থেকে আমার খারাপ খবরটা শুনে পিটিয়ে তোর অবস্থা কেমন খারাপ করে দিই---- হ্যালো---- ?

স্যার, আফা মণি------- !

হ্যাঁ, কী হয়েছে তার ?

স্যার, আফনে তাড়াতাড়ি বাসায়  আসেন।  

কেন, কী হয়েছে সেটা আগে বলবি তো ? 

আফা মণি আত্মহত্যা করেছে।

হোয়াট----- !

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ