রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

হিসাব বিভ্রাট

সুমাইয়া আফরোজ : কান্না বিলাপ আর অশ্রুপাতে পুরো বাড়ি সরগরম। বৃদ্ধ মঈন শেখকে হসপিটাল থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাঁচার আর কোন আশা নেই। হাঁপানির যে টান এতদিন অস্থির করে রেখেছিল আসন্ন মৃত্যু সংবাদে সেটাও যেন শান্ত হয়ে গেছে। এখন নির্জীব মঈন শেখ মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে কখনো ঘুমিয়ে পড়েন আবার কখনো মূর্ছা যান। ঘুম আর মূর্ছা দুটোই এখন তাঁর কাছে সমান।  একাকীত্বের যে অভিযোগ বুকে নিয়ে শেখ সাহেব এতকাল কাটিয়েছেন মৃত্যুর বিছানায় এসে আজ তা দূর হয়েছে। চাকরি, সংসার আর সন্তানদের পড়াশোনার সব অজুহাত ভুলে ছেলেমেয়েরা সবাই আজ তার চোখের সামনে বসে আছে যদিও তিনি খুব কম সময়ই চোখ খোলা রেখে সেই দৃশ্য দেখতে পান। শয্যাশায়ী বাবার পাশে মেয়েরা কাঁদছে সরবে আর ছেলেরা বসে আছে গম্ভীর মুখে। বাড়ির ছোটরা এ ঘরে একবার উঁকি দিয়েই ছুটে পালিয়ে যায়, এখানকার গুমোট আবহাওয়া তাদের ভালো লাগে না মোটেও। এখানে ছাড়া আর সবখানেই তারা তাদের আনন্দের হৈ হুল্লোড় ছড়িয়ে দিচ্ছে। রতনের খুশিই সবার চেয়ে বেশি। শহরের সাহেব সাহেব চেহারার এই ভাইদের খেলার সাথী হিসেবে পাওয়ার এমন সুযোগ হয় নি কখনো। গ্রামের মুক্ত বাতাসে বড় হওয়া রতন সহজেই তাদের খেলায় হারিয়ে দিয়ে পরম খুশিতে মেতে ওঠে। তবে রতনের মা এমন খুশি হতে পারেনি দীর্ঘ সময়ের জন্য এসব সাহেব বিবিদের কাছে পেয়ে। তারা যে তার সাথে মন্দ ব্যবহার করে তা নয়, কিন্তু শুধু ব্যবহার ধুয়ে ধুয়ে পানি খেলে তো পেট ভরবে না। পেট ভরানোর জন্য তো হেঁসেল ধরানো চাই।
এই বাড়ি ভর্তি মানুষের রান্না করতে যে কতক্ষণ হেঁসেল ঠেলতে হয় তা তো আর অন্য কেউ বুঝবে না। বাকী বৌ রা তো শহুরে মানুষ পাড়া গাঁর হেঁসেলে ঘুটেতে কি করে আগুন জ্বলে তাই নাকি তারা জন্মে দেখেনি, আর মেয়েরা তো এসেছেন শোক করতে! শোকের মাঝে ভাত গিলতে বাধা নাই কিন্তু রান্না করতে গেলেই একেবারে শোকের অপমান হয়ে যায়! রাগে দুঃখে একাই গজ গজ করতে থাকে সকেরা বানু। এখনি বাপ মরলে তো সম্পত্তির সমান ভাগ নিতে কেউ ছাড়বে না। এই ছাই এর সংসারে শুধু একাই কলুর বলদের মত খেটে মরা, না থাকত যদি এই সকেরা বানু তবে সব নয় ছয় হয়ে যেত এতদিনে। বাবু সাহেবরা তো সব একে একে চাকরি নিয়ে শহরে গেলেন। এই সংসার তিল তিল করে কে গড়ে তুলল তারপরে? ওরা তো বাপু কেউ চাকরির ভাগ দিবে না অথচ এই সকেরা বানুর হাতে গড়া সংসার আজ ফালি ফালি করে কেটে ভাগ করা হবে। আসলে সকেরা বানু এতদিন ভালোই চলছিল কিন্তু যেই না ডাক্তার বলে দিল যে ‘উনার অসুখ আর সারবার নয়, টিকলে বড়জোর একমাস’। সেই থেকে সকেরা বানুর মাথাটা বিগড়েছে। এখন তার সমস্ত জুড়ে একটাই আশঙ্কা, শ্বশুরের মৃত্যু মানেই সব জমিজমা কেটে কুটে ভাগ হয়ে যাওয়া। এই চিন্তাই তাকে এমন ঝনঝনে করে তুলেছে। দুদিন এভাবে পার করে হঠাৎ ই শান্ত হয়ে যায় সে।
রাতের বেলা মতিন শেখকে একলা পেয়ে উপদেশ দেয়ার ভঙ্গিতে বলল
... তুমি এ কেমন ধারার মানুষ গো রতনের বাপ? বাড়ি ভর্তি কুটুম আর তার বাজার সদাই করার হুঁশ নাই। সরল মানুষ মতিন শেখ বৌ এর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে বলল
... কুটুম আর কোথায়, সবাই তো এই বাড়িরই ছেলে স্বামীর সরলতায় ক্ষুন্ন হয় সকেরা বানু, বোঝে একে আকার ইঙ্গিতে কিছু বুঝানোর চেষ্টা করা বৃথা। তাই রাখঢাক না করে বলতে শুরু করে,
... ঘরের ছেলে হলেও তো সবাই তার মত নয়, ওরা বড়লোক, বড় চাকরি করে, তারা তো ডাল ভাত খেয়ে থাকে না, তাই বলছিলাম ভালো মন্দ কিছু বাজার করো কাল আর আব্বার যখন ডাক এসেই পড়েছে তখন সবাইকে নিয়ে তোমার একবার বসা উচিত, একসাথে তো সহজে সবাইকে পাওয়া যায় না। আব্বার বিষয় আশয় তো এদ্দিন আমরাই দেখতাম এখন তো সব ভাগাভাগির সময় এসেছে।
... সেটা তো হবেই সকেরা বানু,বাপের সম্পত্তিতে সকলের অধিকার সমান। এবার চেষ্টা করে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না সকেরা বানু। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
... তা তোমার হকেই বুঝি শুধু মুখ্যু সুক্কু হয়ে থাকা ছিল? লজ্জায় নুয়ে পড়ে মতিন শেখ। কোন রকমে বলে,
... লেখাপড়ার কপাল কি সবার থাকে? আর আমরা এভাবে তো খারাপ নেই বলো? তার কথায় সম্মতি দিতে পারে না সকেরা বানু।
... আমি অতকিছু বুঝি না। তুমি বড় ভাই,সকলকে নিয়ে বসো, সম্পত্তি সবাই ভাগ করে নিক আমার আপত্তি নাই কিন্তু সড়কের ধারের ওই বারো কাটা জমি আমার রতনের নামে ভাগাভাগির আগে দিতে কইয়ো। আমার রতন বড় হয়ে ওখানটায় চাউলের কল দিবে।
মতিন শেখ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে সকেরা বানুর চেহারার দিকে, তার চেহারার দৃঢ়তায় আর কিছু বলার থাকে না ‘আচ্ছা’ ছাড়া। পরের দিনের সূর্য ডুবে যায় আঁধারের কোলে। মতিন শেখের মৃত মায়ের ঘরে রাতের খাবারের পর সবাই জড়ো হয়। কারো মুখে কোন কথা নেই, সকেরা বানুর ইশারায় তাড়া খেয়ে নিরবতা ভেঙে মুখ খোলে মতিন শেখ।
... আসলে আব্বা আজ মৃত্যু পথযাত্রী, তাই উনি আমাদের মাঝে থাকতেই যদি আমরা তার শেষ দায়িত্ব মানে সম্পদ বন্টন ঠিকঠাক মত করে ফেলতাম তাহলে মনে হয় ভালো হতো। মতিন শেখের কথা শেষ হলে সম্মতি জানালো মেজ ভাই নয়ন শেখ আর ছোট ভাই কমল শেখ। এদের মাঝে নয়ন শেখ নেতা গোছের মানুষ তাই এরপরের বক্তব্যের হাল সেই ধরল।
... আমরাও আসলে ব্যস্ত মানুষ, সংসারের ছোটখাটো বিষয়ে ছুটি নিয়ে আসা হয়ে উঠবে না তাই এখনি সব মীমাংসা হয়ে যাওয়া ভালো।
মতিন শেখের মুখের দিকে তাকিয়ে সকেরা বানু বুঝল যে সে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে তার ওপর ভরসা করে, এখন আর মতিন শেখ কে দিয়ে কোন প্রস্তাব দেয়া সম্ভব নয়। তাই লাজ শরমের মাথা খেয়ে সে নিজেই মুখ খোলে,
... ঠিক কথাই বলছেন ভাই, সংসারের বিষয় আপনাদের কাছে খুবই ছোট, আল্লাহ্ আপনাদের এর বাইরেও অনেক দিছে, তাই সবাই দয়া করে যদি আমার রতনের জন্য সব ভাগাভাগির আগে ওই সড়কের ধারের বারো কাঠা দিয়ে দেন তাহলে তার একটা কিনারা হয়, আমরা তো আপনাদের মত ছেলেকে অত শিক্ষিত বানাইতে পারুম না, চাষার ছেলে চাষবাষ করেই খাবে।
সকেরা বানুর এমন প্রস্তাবে হকচকিয়ে যায় নয়ন শেখ সহ সবাই। তার কথায় যুক্তি থাকলেও পৈতৃক সম্পত্তি এত সহজে কি কেউ হাতছাড়া করতে চায়? কিন্তু তার নিজের উঁচু অবস্থান থেকে তা নাকচ করে দেওয়াও ইমেজের বিষয়। তাই সে কৌশল করে বলে,
... আসলে আমার কোন আপত্তি নাই, যদি সবাই সম্মতি দেয় ... কি বলিস রেবেকা?
শেষ চালটা রেবেকার দিকে ছুড়ে দেয়ার অর্থ হলো বোনদের মাঝে সেই সবচেয়ে অভাবী তাই তার থেকে নিশ্চয় এই উদারতায় সম্মতি নেয়া সহজ নয় তাই যেন ফয়সালার ভার রেবেকার কাঁধেই দিয়ে নিশ্চিত হয় সে। রেবেকা একটু ভেবে বলে ওঠে,
... গরীবেই গরীবের দুঃখ বোঝে, তাই বড় ভাইয়ের ছেলের জন্য যদি আপনারা একটা জমি দিতে চান তো আমার কিসের আপত্তি, সম্পত্তির দরকার তো সবার সমান হয় না। আপনার তো সবাই আল্লাহই দিলে ভালো জায়গায় উইঠ্যা গেছেন, খালি আমারেই এক হাভাতের ঘরে পাঠাইছেন যে খাওয়া পরার চিন্তাই বড় চিন্তা এখন।
নয়ন শেখ বোঝে কাওকে এখানে ভরসা করা ঠিক হবে না, সবাই নিজের আখের গোছানোর চেষ্টা করছে। তাই অল্প ক্ষতি স্বীকার করেই বেঁচে যাওয়া ভালো। তাই বলল,
... বড় ভাবি যখন একটা আবদার করেইছে তখন তাহলে তাই হোক, আর বড় ভাই তুমি কাল মুহুরি ডেকে আনো তারপর সব কাগজ পত্র দেখে ঠিকঠাক মত বাকী সম্পত্তি যে যেভাবে পায় দেয়া হবে। নয়ন শেখের কথায় বৈঠক সংক্ষিপ্ত হয়, আর কারো কিছু বলার থাকে না। অনেকেই মনে মনে অসন্তুষ্ট, কেবল মতিন শেখ কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সকেরা বানুর দিকে।
ভোরবেলাতেই বারবার তাগাদা দিয়ে মতিন শেখকে গঞ্জে পাঠায় সকেরা বানু। আজ তার মনে আর কোন বিরক্তি নেই, যেখানে অন্য সবার ভ্রু কিছুটা কুঁচকানো সেখানে তার মনে খুশির বাঁধভাঙা উল্লাস।
বেশি সময় পার হয় নি, সকাল দশটা, কয়েকজন লোক কিছু একটা ধরাধরি করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসছে আর বলছে, ‘নাই, ওখানেই শেষ হয়ে গেছে’। বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে তার, কী শেষ হয়ে গেছে? এক ছুটে জটলার কাছে এসে রক্তমাখা মতিন শেখের নিথর দেহটার দিকে তাকায়, লোকেরা বলাবলি করছে ‘ট্রাক একেবারে পিষে দিয়ে গেছে গো, চালক শালাটা চোখের পলকে উধাও, আহা কী জোয়ান মানুষ, বৌটা বুক ফেটে মরে যাবে গো।! অচেনা লোকগুলোর কোন কথা কানে যায় না সকেরা বানুর। একবার ডুকরে কেঁদে উঠতে চেষ্টা করে সে কিন্তু না কোন আওয়াজ বের হয় না, সর্বস্বান্ত মানুষটির মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অচেতন হয়ে, তার আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না, হ্যাঁ গো, মুহুরির কাছে ঠিকঠাক গিয়েছিলে তো? তাকে দিয়ে কোন কাজই হয় না।
কয়েক মিনিটের মাঝেই মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা বাড়িটাতে শোকের মাতম ওঠে, পড়া পড়শি জড়ো হতে থাকে মঈন শেখকে স্মরণ করতে করতে। মঈন শেখের ঘরেও কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়, কেউ একজন বলে, ‘লাশ দাফন হবে কখন, কাফনের কাপড় কি কেউ আনতে গেছে?’ অর্ধচেতন মঈন শেখ কেঁপে ওঠে ‘লাশ’ এর কথায়। বৃথা হিসাব করার চেষ্টা করে ভাবে আজ দিয়ে মনে হয় এক মাস হলো, ডক্তারের কথায় ঠিক হলো, এক মাস পরেই আমি মারা গেলাম তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ