রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

যৌতুকের অভিশাপ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ

সেলিনা শৈরে : যৌতুক বা পণ হল কন্যার বিবাহে পিতা-মাতার সম্পত্তির হস্তান্তর প্রক্রিয়া। পাত্র-পাত্রীর যুক্ত হওয়ার সময়ে অর্থাৎ বিয়ের সময় পাত্রীর জন্য যা কিছু মূল্যবান সামগ্রী দেয়া হয়, তা যৌতুক। যৌতুক সাধারণত কনে মূল্য ও স্ত্রীধন সংশ্লিষ্ট ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও কনে মূল্য বা কনে সেবা বর বা তার পরিবার কর্তৃক কনের পিতামাতার নিকট পরিশোধিত হয়, অর্থাৎ যৌতুক বর বা তার পরিবারকে প্রদত্ত কনের পরিবার কর্তৃক হস্তান্তরিত সম্পদ। একইভাবে, যৌতুক বিয়ের সময় বরের কর্তৃক নববধূর নির্দিষ্ট সম্পত্তি এবং যা তার মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সাধারণ অর্থে যৌতুক বলতে বিয়ের সময় বরকে কনের অভিভাবক কর্তৃক প্রদেয় অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রীকে বুঝায়। এছাড়া বর কনের আত্মীয়, অভ্যাগত অতিথিরা সাধারনত স্বেচ্ছায় নবদম্পতিকে দিয়ে থাকেন যা তারা তাদের নতুন সংসারে সুবিধামত ব্যবহার করতে পারে। হিন্দু আইনে যৌতুককে নারীর সম্পত্তির উৎস বলা হয়। এতে তার নিরঙ্কুশ অধিকার স্বীকৃত। হিন্দু সমাজে নারীরা পুরুষদের মতো একই ভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো না। তাই অনেক আগে থেকেই হিন্দু সমাজে নারীদেরকে বিয়ের সময়ে যৌতুক দেবার প্রচলন ছিল। কালক্রমে তা বিয়ের পণ হিসাবে আভির্ভূত হয় যা একসময় কনে পক্ষের জন্য এক কষ্টকর রীতি হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধক আইন অনুসারে- প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যদি কোন পক্ষ অপর পক্ষকে বিয়ের আগে-পরে-চলাকালীন যে কোন সময় যে কোন সম্পদ বা মূল্যবান জামানত হস্তান্তর করে বা করতে সম্মত হয় সেটাই যৌতুক বলে বিবেচ্য হবে।”তবে বিয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নন এমন কেউ ৫০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের কোন বস্তু উপহার হিসাবে কোন পক্ষকে দিলে তা যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে না। তবে বিয়ের শর্ত হিসাবে এই সমপরিমান কোন কিছু আদান প্রদান করলে তা যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুসারে বিয়ে স্থির থাকার শর্ত হিসাবে বা বিয়ের পণ হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বা প্রদান করা হবে এই মর্মে কোন শর্ত যে কোন সম্পদ যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের মোহরানা যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে না। প্রচলিত আইনে যৌতুক দেয়া বা নেয়া উভয়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে। যৌতুক দাবী করার জন্যও একই সাজা হতে পারে। বাংলাদেশের সমাজে যৌতুকের জন্য নারীর প্রতি অসম্মান, অত্যাচার নির্যাতন, হত্যার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারী থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে যৌতুক সংক্রান্ত প্রকাশিত খবরগুলোতে যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। তা এই সমাজের জন্য সত্যিই ভাবনার বিষয়। পাঠকের দৃষ্টিতে আনার জন্য ক্রমান্বয়ে দেশের আনাচে কানাচে আলোচিত কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো।
ঘটনা-এক। ০৩ জানুয়ারী ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম যৌতুকের মামলায় পুলিশের এএসআই কারাগারে। ঘটনাটি নেত্রকোনা জেলার। নেত্রকোনা জেলার এক তরুণী নিলুফার ইয়াসমিন ওরফে লাকী (২৪) তার স্বামী একই জেলার মদন উপজেলার শিবাশ্রম গ্রামের বাসিন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মাজহারুল ইসলাম (৩৫) এর বিরুদ্ধে নেত্রকোনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যৌতুকের অভিযোগ দায়ের করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, মদনের শিবাশ্রম গ্রামের মৃত আবদুল হাকিমের ছেলে মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে ২০১৩ সালের ২২ জুন নেত্রকোনা পৌর শহরের কাটলি এলাকার বাসিন্দা আবদুল ওয়াদুদের মেয়ে নিলুফার ইয়াসমিনের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মাজহারুল ইসলাম তাঁর স্ত্রীকে বাবার বাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা আনার জন্য নানানভাবে চাপ দেন। এরপর নিলুফার তাঁর বাবার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা এনে দেন। পরে তাঁর স্বামী মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে আরও টাকা আনার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ২০১৭ সালের ৩ মে স্ত্রী নিলুফারকে ৩ লাখ টাকা এনে দিতে বলেন মাজহারুল। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় নিলুফারকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন মাজহারুল। এতে মাজহারুলকে প্ররোচিত করেন তাঁর বড় ভাই ও মা। এই ঘটনায় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর নিলুফার ইয়াসমিন বাদী হয়ে স্বামী মাজহারুল ইসলাম, শাশুড়ি হোসনা আক্তার ও ভাশুর আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় মাজহারুল ইসলাম জামিনের প্রার্থনা করলে বিচারক তাঁর জামিন নামঞ্জুর কারাগারে পাঠান।
ঘটনা-দুই। ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ তারিখে নিউজের শিরোনাম যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূর চুল কর্তনের অভিযোগ। যৌতুকের দাবিতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে এক গৃহবধূকে নির্যাতন করে তাঁর মাথার চুল স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেটে ফেলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূর নাম ইতি বেগম। তিনি বেতকাপা গ্রামের মোস্তফা মিয়ার স্ত্রী। এ ঘটনায় পুলিশ গৃহবধূকে উদ্ধার এবং তাঁর শাশুড়ি মঞ্জুয়ারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। তবে তাঁর স্বামী মোস্তফা মিয়া এবং শ্বশুর ফেলু মিয়া থাকে পলাতক।
পুলিশ জানায়, প্রায় তিন বছর আগে পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা গ্রামের ফেলু মিয়ার ছেলে মোস্তফা মিয়ার সঙ্গে সাঘাটা উপজেলার টেপা পদুমশহর উল্যাপাড়া গ্রামের প্রয়াত আমীর উদ্দিনের মেয়ে ইতি বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই মোটা অঙ্কের যৌতুক চেয়ে প্রায়ই মোস্তফা ও তাঁর মা-বাবা ইতিকে শারীরিক নির্যাতন করতেন। এ বিষয়ে একাধিকবার সালিস বৈঠক হয়। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।
গৃহবধূকে ঘরে আটকে রেখে যৌতুক হিসেবে ১০ হাজার টাকা আনতে বলেন স্বামী মোস্তফাসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কিন্তু টাকা আনতে রাজি না হওয়ায় তাঁরা ইতিকে মারধর শুরু করেন। মারধরের একপর্যায়ে তাঁরা গৃহবধূর হাত-পা বেঁধে মাথার চুল কেটে ঘরে বন্দী করে রাখেন। এ ঘটনার কয়েক দিন পর ঢাকায় অবস্থানরত ইতির মা আকলিমা বেগম খবর পান। তিনি ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে জামাতার বাড়ি বেতকাপা গ্রামে যান। সেখানে গেলে মোস্তফা ও তাঁর মা-বাবা তাঁকে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ বেতকাপা গ্রামে গিয়ে ইতিকে উদ্ধার এবং তাঁর শাশুড়ি মঞ্জুয়ারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় গৃহবধূ ইতি বেগম বাদী হয়ে পলাশবাড়ী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করা হয়। পরে ইতিকে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ইতি বেগম গতকাল রোববার অভিযোগ করেন, ‘টাকার জন্য সব সময় ওরা আমাকে মেরেছে। আমার কোনো দোষ নাই। আমি বিচার চাই।’ তাঁর মা আকলিমা বেগম অভিযোগ করেন, ‘যৌতুকের জন্য ওরা আমার মেয়েকে প্রায়ই মারধর করত। আমি সালিস ডেকে বিচার চাই। কিন্তু ওরা সেই বিচার মানেনি। আমার মেয়ের মাথার পেছনের চুল কেটে দেয় ওরা। আপনারা ওদের বিচার করেন।’
ঘটনা-তিন। ০৪ মার্চ ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম স্ত্রী হত্যায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ড। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় যৌতুকের জন্য স্ত্রী তাহমিনা খাতুনকে (২৭) হত্যার দায়ে স্বামী মো. আকাশ ওরফে মিঠুকে (৩৪) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতের বিচারক জিয়া হায়দার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আকাশ জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার তিয়রবিলা গ্রামের বাসিন্দা। মামলার বিবরণে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের মহাম্মদ জুম্মা গ্রামে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই রাতে খুন হন তাহমিনা। তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর স্বামী আকাশ পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে খবর পেয়ে সদর থানা-পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। তাহমিনা হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা সবদ আলী বাদী হয়ে জামাতা আকাশকে আসামি করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, ৫০ হাজার টাকা যৌতুকের দাবিতে আকাশ প্রায়ই তাহমিনাকে নির্যাতন করতেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই বাবার বাড়িতে চলে যান তাহমিনা। ওই দিনই তাহমিনার বাবার বাড়িতে যান আকাশ। মধ্যরাতে মেয়ের গোঙানি শুনতে পেয়ে জেগে ওঠেন বাবা এবং জামাতাকে পালিয়ে যেতে দেখেন। এরপর মেয়ের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ পারভেজ তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আকাশ ওরফে মিঠুর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
ঘটনা-চার।  ১৪ মার্চ ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম যৌতুক মামলায় পুলিশ সদস্য কারাগারে। গোপালগঞ্জে স্ত্রীর করা যৌতুক মামলায় পুলিশ সদস্য মো. সজিব হাওলাদারকে (২৩) কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের গোপালগঞ্জ অঞ্চল-৩এর বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বীনা দাশ তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ সদস্য মো. সজিব হাওলাদার কোটালীপাড়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামের ঠান্ডা হাওলাদারের ছেলে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ