রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

বিদ্রোহ ও বিপ্লবের নজরুল

রহিমা আক্তার মৌ : বিপ্লব ব্যতীত কোন বড় পরিবর্তন আসে না। বড় পরিবর্তন না এলে সমাজ, সভ্যতা এগোয় না। সেই সমাজ আর সভ্যতার পরিবর্তন এনেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবি সাহিত্যিকের কাজ সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়া। এজন্য কবিকে বিপ্লবী বা বিদ্রোহী হতে হয়। নজরুল ছিলেন আমাদের সেই বিপ্লবী ও বিদ্রোহী কবি।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলকে নিয়ে বিশ্ব কবি বলেছেন, ‘আয় চলে আয়রে ধুমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ধুমকেতুর মতো প্রলয় নাচনের কাঁপন জাগিয়ে হতভম্ব করে দিয়েছিলেন বৃটিশ রাজশক্তিকে। আজ আকাশে বাতাসে বিদ্রোহী কবির বাণী বিদ্রোহের সুর। কবি তার রচনার মধ্যেই প্রকাশ করেছেন তিনি বিপ্লবী কবি বিদ্রোহী কবি। নিজেই নিজেকে বিপ্লবী মহাবিপ্লবী বলেছেন। বিদ্রোহী মহাবিদ্রোহী কবি বলে পরিচয় দিয়েছেন।
আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী ও বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের (১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে) ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই বিদ্রোহী কবি। বাবা কাজী ফকির আহমেদ ও মা জাহেদা খাতুনের ৫ম সন্তান ছিলেন কাজী নজরুল। নজরুলের পিতামহ ছিলেন কাজী আমিনুল্লাহ ও মাতামহ মুন্সী তোফায়েল আলী। বিদ্রোহী কবি তাঁর ২১-২২ বছরের সাহিত্য জীবনে হাজার হাজার সাহিত্য রচনা করেছেন। সব রচনায় কবিকে আমরা আলাদাভাবে পাই। কবির বিভিন্ন অংশ হিসাবে পাই। কিন্তু বিদ্রোহী কবিতায় কবিকে পরিপূর্ণভাবে আমরা পাই। এই কবিতায় কবি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে স্থান দিয়েছেন। কবি নিজেকেই বিদ্রোহী বলে জাতির কাছে তুলে ধরেছেন।
বিদ্রোহী কবিতায় কবি আকাশ বাতাস, প্রকৃতি, জয়-পরাজয়, সমাজ, সংস্কার নারী পুরুষ শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সুর তালসহ এমনকি বিধবা নারীর কথাও তুলে ধরেছেন এবং প্রতিটি বাক্যে তিনি আমি বলে প্রকাশ করেছেন। বিদ্রোহী কবি তার এই কবিতায় ব্যক্তির আমিকে তুলে ধরেছেন। আমার আমিত্বকে প্রকাশ করেছেন।
বিদ্রোহী কবি প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন ইংরেজ শাসনশক্তির বিরুদ্ধে। এরপর বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানী নব-উপনিবেশায়নের বিরুদ্ধে গর্জন করে উঠল, তখনও নজরুল এসে দাঁড়ালেন এখানকার গণমানুষের মিছিলের সামনের সারিতে। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের সাথে তুলনা করা যায় এমন কোনো কবি কোনো সময়ই খুঁজে পায়নি পাবেও না। সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বিদ্রোহী ও বিপ্লবী কবি কাজী নজরুলের রচনা। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলকে নিয়ে কবির সাহিত্য রচনা নিয়ে নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ বলেছেন, ‘অনেক ভালো কবির মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভাল কবি নয়, অনেক ভালো গায়কের মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভালো গায়ক নয়, অনেক ভালো সুরকারের মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভালো সুরকার নয়, বাংলা কাব্য সাহিত্যে, বাংলার সঙ্গীতে। বাংলার সুর সৃজন লোকে নজরুলের নেই কোনো পিতৃ-পুরুষ, নেই কোনো উত্তরাধিকারী। সে দাঁড়িয়ে আছে স্বতন্ত্র, একক, একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যক্তিত্ব ও শক্তি।”
মানবতাবাদী ও সৃজনশীল ধারার মানুষেরা সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সকল মানুষের অন্তরের শক্তিকে নাড়া দিয়ে দেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একই ধারারই একজন সফল স্রষ্টা যিনি মানুষের মনের আবেগকে মন্থন করতে গিয়ে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছেন এবং তা প্রকাশ করেছেন গানে। ফলে একদিকে গণমানুষের গান রচনা করেছেন তিনি এর পাশাপাশি ধর্মীয়ভাব ধারার গান লিখে উদার ও সমন্বয়বাদী মানসিকতার সঞ্জীবন দিয়েছেন। মধ্য যুগে মুসলমানদের আগমনের ফরে পার্সীয় সুফি সঙ্গীতের প্রভাবে ভারতীয় সঙ্গীত প্লাবিত হয় এবং ধ্রুপদের বিস্তার লঘু হয়ে পড়ে। কিন্তু পার্সীয় সঙ্গীতের যে অজস্র ফর্ম বা কাঠামো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তা আধুনিককালে বাংলায় এনে হাজির করেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
বিপ্লবের কবি কাজী নজরুল ছিলেন বাংলা ভাষায় প্রথম অসাম্প্রদায়িক কবি। দ্বিমাত্রিক ঐতিহ্য রোধে ঋদ্ধ ছিল নজরুলের সৃষ্টিশীল মানস। জন্মসূত্রে ভারতীয় উত্তরাধিকারে তিনি গ্রহণ করেছেন আপন উত্তরাধিকার হিসাবে। অন্যদিকে ধর্মবিশ্বাস সূত্রে তিনি অর্জন করেছেন পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নজরুল ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, তিনি বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এ কালে যেমন, সেকালেও তেমনি ধর্মকে শোষণের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ভ-, মোল্লা, মৌলভী আর পুরোহিতের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নজরুল ছিলেন সোচ্চার। বিপ্লবের নজরুল সব সময় ভিন্ন দৃষ্টিতে মানুষকে বিচার করেছিলেন মানুষ হিসাবে, জাতি ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ সকল বিভেদ বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্বের যে মহান সাধনা তাই আলাদা করেছে। আলাদা করেছে তার সৃষ্টি কর্মকে। সমসাময়িকদের চেয়ে একটা আধুনিক মানবতাবাদী রোধ তিনি খুব গভীর এবং বিশ্বস্তভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন। সাহিত্য বোধ এবং ব্যক্তিত্বের  প্রকাশ সম্পর্কে নজরুলের দৃষ্টিতে অষ্পষ্টতা ছিল না। তার দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ, তার চলা ছিল নিজের আদর্শে, নিজের প্রাণের আবেগে। নজরুল তার নিজের বোধের কাছে যা স্পষ্ট বা ভালো মনে করেছেন, তাই সে করেছেন। তার সাহিত্যে তিনি তাই প্রকাশ করেছেন।
বিদ্রোহের সুর নিয়ে আসা বাঙালীর ভোঁতা বোধে প্রবল এক আঘাত হানা নজরুল তার ভিন্ন এক স্বরের কারণেই আমাদের কাছে একই সাথে এতো আলোচিত ও বিতর্কিত এতো বেশি পুঁজিত। বিদ্রোহী ও বিপ্লবের কবি কাজী নজরুলকে নিয়ে কবি, গবেষক ও ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক বলেন, ‘ নজরুলকে আমরা সবাই চিনি ‘বিদ্রোহী’ কবি রূপে, এর মূল কারণ তাঁর বহুখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। তবে স্বদেশ ও রাজনীতির বিবেচনায় নজরুল মূলত বাঙালী জাতীয়তাবাদী স্বাদেশিকতার বিপ্লববাদী কবি। এক কথায় স্বাধীন বাঙালি জাতীয়তার স্বপ্নদ্রষ্টা কবি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম।’
তাইতো কবি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করেছেন তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। শেষ চরণে তিনি লিখেছেন,
‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ চিহ্ন’
আমি খেয়ালী বিধির বশ করিব ভিন্ন!
আমি চির বিদ্রোহী বীর
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ