শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না

মিয়া হোসেন: হিজরী নববর্ষের ১ম মাস মহররমের তৃতীয় দিন আজ। মহররম মাস এলেই স্বরণ হয় আনন্দ ও বেদনা ভারাক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর কথা। হৃদয়ের স্মৃতিপটে ভেসে উঠে কারবালার মর্মান্তিক দৃশ্যপট। ইয়াজিদের বর্বরতা আর সীমারের নিষ্ঠুরতার ঘটনায় আজো মানুষ শিউরে ওঠে মর্মবেদনা প্রকাশ করে। ইসলামের ইতিহাসে তারা রচনা করেছিল কলঙ্কজনক অধ্যায়ের। ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা যে চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম ঘোষণা করেছেন তার মধ্যে মহররম মাস অন্যতম। এমাসের দশমদিন পবিত্র আশুরা। এদিন রাসূল (সাঃ) এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন বিন আলী (রাঃ) সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার মরুপ্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
ঐতিহাসিক কাল ধরেই মহররম মাস গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে আসছে। রাসূল (সাঃ) আশুরার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। তিনি ঐদিন রোযা রাখতেন এবং ঐদিন রোযা রাখতে উৎসাহিত করেছেন। বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) আশুরার তাৎপর্য বর্ণনাকালে সাহাবায়ে কেরাম আরজ করেন, তবে কী আল্লাহ তায়ালা এ দিনটিকে সমস্ত দিনের চেয়ে অধিক মর্যাদা দিয়েছেন? রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন হ্যাঁ। এরপর তিনি এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা আসমান, জমিন, লওহ, কলম, সাগর, পর্বত এই দিনে সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম পূর্বকালে বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন কারণে এই দিন রোযা রাখতো। হাদীসে এসেছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর মদীনার ইহুদীদেরকে আশুরার দিনে রোযা রাখতে দেখে তার কারন জানতে চাইলেন। ইহুদীরা জবাব দিল, এই দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনকে সাগরে নিমজ্জিত করে হযরত মুসা (আঃ)কে বিজয়ী করেছেন। তাই এ দিনটিতে রোযা রাখি। এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) বলেন, তার সাথে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়েও নিবিড়। অতপর তিনি সাহাবায়ে কেরামকে এদিন রোযা রাখার নির্দেশ দেন। বর্ণিত আছে যে, আশুরার দিন রোযা রাখলে ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায় বিধায় রাসূল (সাঃ) তার পূর্বের বা পরের দিন আরেকটি রোযা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
আশুরার দিনে পৃথিবীতে এমন একটি ঘটনার অবতারণা হয়েছিল যার বিবরণ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে এভাবে তুলে ধরেছেন। এরশাদ হচ্ছে, স্মরণ কর, যখন আমি ফেরাউনী সম্প্রদায় হতে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম, যারা পুত্রগণকে হত্যা করত ও তোমাদের কন্যাগণকে জীবিত রেখে তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত এবং এতে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহাপরীক্ষা ছিল এবং যখন তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিধাবিভক্ত করেছিলাম এবং তোমাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম ও ফেরাউনী সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছিলাম এবং তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে” (সূরা বাকারা- আয়াত ৪৯-৫০)। এই আয়াতে হযরত মুসা (আ:) ও বনী ইসরাইলীদের নিরাপদে নীলনদ অতিক্রম করা, ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনীর ডুবে মরার কাহিনী অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ভাষায় বিবৃত হয়েছে। এই কাহিনীর সুদূর প্রসারী দিক নির্দেশনার মাঝে যে দু‘টি বিষয় খুবই প্রণিধানযোগ্য তা হচ্ছে, সত্য চিরকাল বিজয়ী ও সমুদ্ভাসিত থাকে। মিথ্যা ও অসত্যের শক্তি দম্ভ অহংকার ও দর্প ক্ষণিকের জন্য উচ্চকিত হলেও পরিণামে সত্যের তেজোদীপ্ত আঘাতে মিথ্যা ও অন্যায়ের বেড়াজালে আবদ্ধ তাসের ঘরের মত ইতিহাসের অতল তলায় হারিয়ে যায়, নি:শেষ হয়ে যায়। কোন অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠীই শাস্তির নিগড় থেকে নিজেদেরকে ছলেবলে কৌশলে রক্ষা করতে পারেনি। যেমনটি আমরা জালিম ও অবিশ্বাসী ফেরাউনের জীবনে দেখতে পাই এবং একইভাবে ইয়াজিদের শাসনামলেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আর এ জন্যই ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তার বালক পুত্রের নিহত হওয়ার সাথে সাথে সাধের গড়া সাম্রাজ্যের প্রতিটি পত্র খসে পড়েছিল এবং সেখানে ঝেকে বসেছিল মারওয়ানী কূটমমন্ত্রণার কুটিল জলসা। তাই আজ বিশ্ব জোড়া মুসলিম মিল্লাতের উচিত ত্যাগ ও আতেœাৎসর্গের মহিমায় বলীয়ান হয়ে সত্যাশ্রয়ী জীবনের রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা এবং মর্সিয়া ক্রন্দনের সামিয়ানাকে ছিন্নভিন্ন করে সত্যের ঝান্ডাকে সমুন্নত করা। কেননা এ পথেই রয়েছে মুক্তি ও নিষ্কৃতি, স্বস্তি  এবং তৃপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ