রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

শাহ ও শর্মারা আসলে কী চাইছেন

আসামের নাগরিক তালিকা (এনআরসি) বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে ভারতের সুবচনে আমাদের মন্ত্রীরা আশ্বস্ত হলেও হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলছেন ভিন্ন কথা। আসামের অর্থমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ এই বিজেপি নেতা এখন বলছেন, বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের মধ্যে ১৪-১৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত নিতে বাংলাদেশ সরকারকে বলবেন তারা। আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর দিন রোববার ভারতের গণমাধ্যম নিউজ-১৮কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন হেমন্ত বিশ্ব শর্মা। উল্লেখ্য যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করছেন শর্মা।
মিস্টার শর্মার এই চিন্তা-চেতনা যে একেবারে নতুন কিছু, তা কিন্তু নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে সাওয়াই মধুপুরের এক জনসভায় শাসক দল বিজেপি’র প্রধান অমিত শাহও তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আসামের ৪০ লাখ বহিরাগতকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এরা ঘুন পোকার মতো, আমাদের দেশকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। এসব বহিরাগতরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, এরা সন্ত্রাসী। ভারতের কোনো শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্যকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যারা বলছেন আসামের এনআরসি শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তারা কি ভুলে গেছেন অমিত শাহ-এর সেই বক্তব্য ‘চুন চুন করকে হাটায়ে গা’। বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন তারা শুধু আইনত অবৈধ বলেই চিহ্নিত হবেন না, সামাজিকভাবে নিগ্রহের শিকার হবেন। বাসা ভাড়া পেতে, ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করতেও তারা সমস্যায় পড়বেন। আর চাকরি পাবেন কি তারা? অর্থাৎ তোমরা ঘুনপোকা, দেশ থেকে চলে যাও। এমন লাঞ্ছনার মুখে তো তারা সীমান্তবর্তী দেশেই আশ্রয় পেতে চাইবেন। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বেলায় তো আমরা এমনটিই দেখেছি।
আসামের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতবাসী, বাংলাদেশী ও বিশ্ববাসীর কি করণীয় কিছু আছে? প্রশ্নটির সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের অধিকারবোধ ও মানবিকবোধ। বর্তমান সভ্যতায় আমরা ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের মধ্যে যে অহংবোধ ও আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করছি তাতে তারা নীতি কিংবা উচ্চতর মানবিকবোধকে তেমন গুরুত্ব দেন না। তাই তাদের প্রতি আবেদন-নিবেদন করে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। তারা যে স্বদেশ কিংবা বিশ্বের জন্য কোনো ভাল কাজ করছেন না প্রথমে সেই বিষয়টি তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। এ জন্য প্রতিবাদ প্রয়োজন দেশের ভেতরে এবং বাইরে। ভারতের নাগরিক সমাজ এ ক্ষেত্রে সঙ্গত ভূমিকা পালন করলে আন্তর্জাতিক বিশ্বও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে পারে। কারণ তারা জানেন যে, ঐতিহ্যগতভাবে ভারত একটি বহু ধর্ম, বহু বর্ণ ও বহু ভাষার গণতান্ত্রিক দেশ। বৈচিত্র্যের ঐক্যই তাদের রাষ্ট্রীয় দর্শন বা নীতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মোদির বিজেপি সরকার বৈচিত্র্যের বদলে দেশকে হিন্দুত্ববাদী ধারায় পরিচালনার চেষ্টা করছে। ভারতের বিবেকবান ও সচেতন মানুষ দেশের স্বার্থেই এমন রাজনীতিকে সমর্থন করতে পারছেন না। তারা বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করছেন।
বিজেপি নেতারা বলছেন, বহিরাগত হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা ভারতে আশ্রয় পাবে, নাগরিকত্ব পাবে, কিন্তু মুসলিমরা নয়। তাদের এমন সাম্প্রদায়িক চেতনা ভিন্নভাবে লক্ষ্য করা যায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও এনআরসি তথা চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা প্রণয়ন তৎপরতায়ও। এমন রাজনৈতিক চেতনা স্বদেশ কিংবা বিশ্বব্যবস্থার জন্য কখনও কল্যাণকর হতে পারে না। রোহিঙ্গা সঙ্কট আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, চুপ করে থাকলে কিংবা দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ওপর ভরসা করলে আখেরে আমাদের পস্তাতে হবে। তাই এনআরসির আড়ালে অমিত শাহ ও হিমন্ত শর্মারা যা করতে চাইছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সময় এখনই। এতটুকু না করলে মানুষের সমাজ টিকে থাকবে কেমন করে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ