সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মিরসরাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ

মিরসরাইয়ে নাহার এগ্রো গ্রুপের বিভিন্ন প্রজেক্টে চাষ করা ড্রাগন ফল -সংগ্রাম

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : কয়েক বছর পূর্বেও ড্রাগন ফল সম্পর্কে ধারনা ছিলো না মানুষের। প্রথমে কেউ কেউ শখের বসে এই ফলের চাষ করেন। এখন মিরসরাইয়ে অনেকটা বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের সর্বাধুনিক ও বহুমুখী গুণে গুণান্বিত পুষ্টিকর ফলের রাজা ‘ড্রাগন’ ফল। জানা গেছে, পাতাবিহীন এই গাছটি ক্যাকটাসের মত দেখতে। এই গাছটিকে অনেকে ক্যাকটাস মনে করে। বাংলাদেশের আবহাওয়া জলবায়ু ড্রাগন ফল চাষের অনুকূল হওয়ায় বর্তমানে অনেকে শখের বসে ও বাণিজ্যিকভাবে এই ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছে। অল্প জায়গায় স্বল্প খরচেই চাষ করা যায় ড্রাগন। সুস্বাদু এ ফলটি বিক্রি করেও বেশ ভালোই লাভ হয়। মিরসরাইয়েও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে ড্রাগন ফলের চাষ। ফসলি জমি কিংবা বাড়ির ছাদের টবে ড্রাগন গাছ লাগানো যায়।
কয়েক বছর আগেও ড্রাগন ফল পরিচিত ছিল না। এখন এটি বেশ পরিচিত। এ ফলের বিভিন্ন ভেষজ গুণ থাকায় উপজেলায় কেউ বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে, আবার কেউ খামারের জমিতে চাষ করছেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই ড্রাগন চাষের সুবিধায় দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে স্থানীয়রা।
সূত্র জানায়, মিরসরাইয়ে নাহার এগ্রো গ্রপের বিভিন্ন প্রজেক্টে গত এক দশক ধরে ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। এখানে প্রথমে নিজেদের খাওয়ার জন্য ছোট পরিসরে চাষ করলেও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ করছেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানের জিএম (প্রোডাকশন) আতিকুর রহমান। তিনি জানান, নাহার এগ্রো গ্রুপের পশ্চিম অলিনগর, সোনাপাহাড়, করেরহাট, কুমিরা ও ফটিকছড়ি প্রকল্পে ড্রাগন ফলের বাগান রয়েছে।  জানা গেছে, অনেকটা শখের বশে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছিলেন নাহার এগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান টুটুল। শতভাগ সফলও হয়েছেন। এখন বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফল আবাদ করছেন তিনি। রাকিবুর রহমান টুটুল পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ড সফরকালে এই ড্রাগন ফলটির চাষাবাদ ও পুষ্টিগুণ দেখে বাংলাদেশের আবহাওয়ায়ও চাষাবাদ সম্ভব জেনে কয়েকটি কাটিং নিয়ে আসেন। এর পর মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকার নাহার এগ্রো হ্যাচারির পতিত জমিতে চাষ শুরু করেন। এরপর পশ্চিম অলিনগর, সোনাপাহাড়, করেরহাট, কুমিরা ও ফটিকছড়ি প্রকল্পে চাষ করা হয়েছে। গত বছর করেরহাট প্রকল্পে ২৬শ কেজি ড্রাগন উৎপাদন হয়েছে। এই বিষয়ে ড্রাগন ফল চাষের উদ্যোক্তা রাকিবুর রহমান টুটুল বলেন, ২০০৯ সালে থাইল্যান্ড থেকে ড্রাগন গাছের কলম নিয়ে আসি। থাইল্যান্ডে যখন ড্রাগন ফল খাই তখন এই ফলের মূল্য ছিল ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা। তখন আমি চিন্তা করলাম থাইল্যান্ডে যদি ড্রাগন ফল হয়ে থাকে আমাদের দেশে কেন হবে না। আমি দুটি কাটিং নিয়ে আসি। সেগুলো রোপন করা হয় নাহার এগ্রোর ফার্মের ভেতরে। পরে বানিজ্যকিভাবে আরো পরিসর বাড়িয়ে চাষ করে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে কাটিং করেছি। এরপর প্রায় ৫ বছর অনেক পরিশ্রম করে বাগান করা হয়। এই অর্থকরী ফল চাষে উপজেলা কৃষি বিভাগের সাহায্য নিয়ে অনেকেই চাষ করতে এগিয়ে আসতে পারে বলে তিনি জানান। নাহার এগ্রো গ্রুপের জিএম (প্রোডাকশন) মনোজ কুমার চৌহান বলেন, আমাদের ড্রাগন বাগান পরিচর্চার জন্য কৃষি অফিসার সহযোগিতা করেন। তারা মাঝে মাঝে বাগান পরিদর্শন করেন। আমাদের একটা স্পেশাল টিম রয়েছে যারা ড্রাগনের জন্য কাজ করে থাকে। এমন সফলতায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী এই ফল জনপ্রিয়তা হওয়ার অন্যতম কারণ পুষ্টি গুণাগুণ।  জানা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্যে ড্রাগন ফলের জন্ম। প্রায় এক শ’ বছর আগে জনৈক ব্যক্তি এই ড্রাগন ফলের বীজ ভিয়েতনামে নিয়ে আসেন। এর পর থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় ড্রাগন ফলের চাষ। বর্তমানে এই ফল সেখানে অন্যতম প্রধান ফল হিসেবে পরিচিতি পায়। পরে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে এই ফলের চাষ সম্প্রসারিত হতে থাকে।
এই ফল কাঁচা-পাকা উভয়ই খাওয়া যায়। খাদ্য ও ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ ড্রাগন ফল খেতেও সুস্বাদু। সারা বছর এই ফলের গাছ রোপণ করা যায়। অধিক তাপ সহ্যকারী গাছ তাই গ্রীস্মপ্রধান দেশে এর চাষ ভালো হয়। শীতের চার-পাঁচ মাস ছাড়া বছরের অবশিষ্ট সাত-আট মাস ড্রাগন ফল পাওয়া যায়। আগামী দুই দশকের মধ্যেই ড্রাগন ফল পৃথিবীর সেরা ফল হিসেবে গণ্য হবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন।
ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম হাইড্রোসেনাস এন্টেটাস। যেভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করা যাবে: আবহাওয়া অনুযায়ী জমি নির্বাচন করতে হবে। কেননা ড্রাগন ফল প্রচুর আলো পছন্দ করে। মধ্যম বৃষ্টিপাত এ ফলের জন্য ভালো। তবে পানি জমে না এমন উঁচু জমিতে এ ফলের চাষ করা ভালো। ড্রাগনের উপযোগী জাত নির্বাচন করে বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা) বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল) এ ছাড়াও হলুদ ড্রাগন ফল ও কালচে লাল ড্রাগন ফল চাষ করা যেতে পারে। এপ্রিল মাসে গাছে ফুল আসে। অক্টোবর পর্যন্ত ফল দেয়। মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান, ড্রাগন ফলের পুষ্টি গুনাগুন অনেক। আমাদের দেশে ধীরে ধীরে এই ফলের চাষ বড়ছে। সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে-দোআঁশ মাটিই ড্রাগন চাষের জন্য উত্তম। তবে এর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে যত্ন নিতে হবে। তিনি আরো জানান, ড্রাগন ফলের চাষ সম্পর্কে আমরা মানুষকে ঊর্ধ্ব করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ