মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

আমাদের বিত্তের দৈন্য বনাম চিত্তের দৈন্য

আখতার হামিদ খান : বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পরিচিতি রয়েছে প্রধানত তিনটি কারণে। প্রথমত এদেশের জনবসতি অতিঘনতু। গুটিদুয়েক ক্ষুদ্রায়তন নগর রাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে প্রায় ১০০০ মানুষ। বাংলাদেশের জনঘনত্বের মাত্রা এতটাই যে পৃথিবীর সকল মানুষকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এনে জড় করলেও সে দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব বাংলাদেশের মতো হবে না। আমাদের বিশ্বপরিচিতির দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ব্যাপক গণদারিদ্র্য। দক্ষিণ এশিয়ার একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, আর  গোটা বিশ্বে আমাদের অবস্থান হবে প্রথম ২০/৩০ টির মধ্যে ততো বটেই। সম্প্রতি বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে পরিচিত  গোষ্ঠীর নেতৃত্ব জুটেছে আমাদের। এটা আমাদের জন্য খুব একটা গৌরবের পরিচয় নয়। তৃতীয় যে কারণে আমাদের কুখ্যাতি, তা বহুল প্রচারিত আলোচিত তো বটেই, বলা হয় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের তালিকায় আমাদের অবস্থান গত পাঁচ বছর ধরে ছিল সবার উপরে। এ বছর তালিকায় এই অবস্থানের খানিকটা উন্নতি ঘটেছে যদিও তাতে খুব একটা কিছু যায় আসে না। আর্থ-সামাজিক মানচিত্রে আমাদের অবস্থানের স্বরূপটি কত না মানদ-ে উঠে এসেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের পাতায় পাতায়। জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই হচ্ছে দরিদ্র । এরা জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে অক্ষম, সংখ্যায় প্রায় সাড়ে ছয় কোটি। এর মধ্যে অতি দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। পরিবারপিছু আয় ও ব্যয় সমীক্ষা ২০০৫ অনুযায়ী দেশে বর্তমান  মোট পরিবার রয়েছে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার। এরমধ্যে ২১ লাখ ১০ হাজার পরিবারের কোনো আয় কিংবা রোজগার নেই অর্থাৎ সেই পরিবারগুলোতে উপার্জনক্ষম মানুষ একজনও নেই। তার মানে দেশের মোট জনসংখ্যার এক কোটি দুই লাখ তেত্রিশ হাজার পাঁচশত মানুষ একেবারেই উপার্জনহীন, অর্থাৎ পথের ভিখিরি আর এদের বড় অংশই বাস করে গ্রামে। আর মাত্র একজন শিক্ষার প্রসার ও মান উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য। সেটা  তো আশানুরূপ হচ্ছে না। শিক্ষা ও শিক্ষার্থী সংখ্যা এই দুই ক্ষেত্রেই বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশী মক্তব মাদরাসায় । দেখা যাচ্ছে মিলিটারি ও মাদরাসা  পোষাতেই সব সরকারের মনোযোগ বেশী। অপরদিকে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে প্রবলভাবে। শিক্ষা এখন আর দশটা ভোগ্যবস্তুর মতোই বাজারের পণ্য, যে যেমন দাম দিতে পারবে সে সেই মানের কিনতে পারবে।
বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র। ফলে বেকারত্ব এত ব্যাপক যে তা দেশের প্রাপ্ত শ্রম সময়ের ৪০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে শিক্ষিত অশিক্ষিত দুই-ই রয়েছে। গ্রামীণ অকৃষিখাত এবং শহুরে অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা স্বনিয়োজিত (এদের সংখ্যা অনেক) তাদের আয় খুবই কম। এছাড়াও অদক্ষ, আধাদক্ষ বা সাধারণ শ্রমজীবীদের মজুরি, বেতন খুবই কম। পোশাক শিল্প বাদ দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা ও নির্মাণ কাজেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে। এতে করে দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার জন্য আনুপাতিকহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। এমন কি দ্রুত বেড়ে ওঠা পোশাক শিল্পের পক্ষেও প্রধানত, ঠিকাদারী (Order supplier) প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে এতে কর্মসংস্থান ততটা হয় না। ফলে কি শহরে কি গ্রামে সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মসন্ধানীদের সামনে নেই কোনো ভবিষ্যৎ, বিপথগামী অথবা বিদেশগামী হওয়া ছাড়া। তাই যখন যে যেভাবে পারছে তরুণেরা বিদেশে ছুটছে বৈধ-অবৈধ উপায়ে, সমুদ্রে ভেসে পাড়ি জমাচ্ছে প্রাণ হাতে করে। বিদেশে কর্মরত এই গোষ্ঠীর পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত এখন যদিও এ বিষয়টি তেমনভাবে উচ্চারিত হয় না। এর কাজ ৯, অপরদিকে দেশে শিল্পপুঁজির আশানুরূপ বিকাশ হয়নি। বেসরকারি খাত বিকাশের জন্য বিদেশী চাপ ও সরকারি প্রচেষ্টার ফলে লাভ যা হয়েছে তা মূলত ওই বণিক পুঁজির (Trading capital) প্রসার। উৎপাদনমুখী বেসরকারি খাত বরং এদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে আছে। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোই এখন অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে দেখা দিয়েছে একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণ। ক্ষুদ্র এই ধনিক-বণিক গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং এই প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবে সমাজে একটি নব্য পুঁজিপতি শ্রেণীর উত্থান ও বিকাশ স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নিষ্ঠুর সত্য। উৎপাদনশীল পুঁজির বিকাশ না ঘটায়, লুটেরা পুঁজির অব্যাহত তৎপরতায় অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে গেল। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব তাদেরকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘চাটার দল বলে। নবাগত এই ধনিক  গোষ্ঠী ১৯৭৬ সালে এসে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়; বিশৃঙ্খল, অগোছালো লুটপাটের স্থলে শুরু হয় সংগঠিত, সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন। খুব দ্রুত অকল্পনীয় সম্পদের মালিক বনে চিত্র গত ২৭.১.২০০৮ ইং তারিখের একটি জাতীয় দৈনিকে উঠে এসেছে। এতে একজন জনস্বাস্থ্য গবেষক এদেশে যক্ষ্মার প্রকোপ প্রসঙ্গে বলেছেন, যক্ষ্মা দরিদ্রদের রােগ। দেশে প্রতিলাখ মানুষের মধ্যে ১০২ জন যক্ষ্মা রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী যক্ষ্মা কবলিত ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম, এক বছর আগে ছিল ষষ্ঠ। সারা দেশে বছরে ৭০ হাজার মানুষ যক্ষ্মায় মারা যায়। অর্থাৎ যক্ষ্মার প্রকোপ আমরা কমাতে পারছি না।
নবজাতকের মৃত্যু, শিশু অপুষ্টির চিত্রটিও অনুরূপ ভয়াবহ। প্রতিবছর এদেশে ২৮ দিন পর্যন্ত বয়সী শিশু মারা যায় এক লাখ বিশ হাজার। অর্থাৎ দৈনিক হিসেবে ৩২৮ জন যাদের অর্ধেকের মৃত্যু ঘটে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায়। একই চিত্র পুষ্টি ক্ষেত্রেও। দিনমজুর, পোশাক শ্রমিক এবং চর-বস্তির অগণিত মানুষকে দেখি-এর শিকার হতে। বারবার বন্যা আর তীব্র নদী ভাঙনের শিকার হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয় এরাই। উল্লেখিত এই জনগােষ্ঠীর বিপন্ন হতদরিদ্র ছবি গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সিডর শহরবাসী আমাদের চোখে কিছু সময়ের জন্য হলেও খুলে দিয়ে গেছে। টিভি পর্দায়। কী দেখলাম আমরা? এদের বাড়িঘর এত ঠুনকো, টিনের চালার যা সিডর তাে বটেই এর চেয়েও দুর্বল ঝড়ে উড়ে যায় শক্ত পাকা ঘরের বেলা যা ঘটে না। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তেমন পাকা-বাড়িঘর বানানোর সামর্থ্য এদের নেই। অপর হৃদয়বিদারক চিত্র যা আমরা শহরবাসীরা দেখলাম উপদ্রুত এই মানুষগুলোর (সব বয়সের) চেহারায়, অবয়বে, পোশাকে নিদারুণ দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের ছাপ। জীর্ণ-শীর্ণ-অপুষ্টি জর্জরিত সবাই-এমন অবস্থা একরাতের সিডর তৈরি করে দিয়ে যায় নি। এ চিত্র আবহমান দারিদ্র্যের ফসল।
২ স্বাস্থ্যসেবায় বিত্তনির্ভর এই বিভাজন শিক্ষাক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রতিফলিত। স্বাধীন দেশের উপযোগী অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি ’৭৫-পরবর্তী সব সরকারই কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছে। শিক্ষা এখন তিনটি সমান্তরাল ধারায় প্রবাহিত সম্পন্নদের জন্য ব্যয়বহুল, প্রধানত, ইংরেজী মাধ্যমের বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, মধ্য ও নিম্নবিত্তের জন্য সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং গরীরের জন্য কিছু নিম্নমানের সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক বেসরকারী মক্তব মাদ্রাসা। শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ১৯৭২ সালে ছিল রাজস্ব ব্যয়ের ২১.১৪ শতাংশ। পরে এ হার ক্রমান্বয়ে নেমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৫.৮%। পাশাপাশি বেড়েছে প্রতিরক্ষা ব্যয়। এই খাতে অনেক ব্যয় আছে যা আসে অন্যান্য খাত থেকে। কাজেই তা মােট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের হিসেবে সাদা চোখে ধরা পড়ে না। এই নিদারুণ অস্বচ্ছতা প্রতিরক্ষা খাতের একটি অগ্রহণযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভর্তির হার বেড়েছে, পাঠ শেষ করারও হার বেড়েছে, কিন্তু ৫০-৫৫ শতাংশ সাক্ষরতার হার সার্ক এলাকাতেও নিম্নতমের একটি। এই সাক্ষরদের বেশীরভাগই কেবল নাম সই করতে পারে। কিন্তু শিক্ষিত জনশক্তি গড়তে হলে মাধ্যমিক ঔষধের দোকান, গহনা, ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকান, বিদ্যাবণিকদের তৈরি ব্যয়বহুল কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বেসরকারী উদ্যোগের রমরমা বিকাশ চোখে পড়ার মতো। বৃদ্ধির আরো খবর আছে। দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ভয়াবহভাবে। এই মূল্যবৃদ্ধির সুফল তৃণমূল পর্যায়ে দরিদ্র উৎপাদকেরা কিন্তু পায় না,  ছোট দোকানদারেরা পায় না, কারণ মাঝখানে তৈরী হয়েছে চাঁদাবাজ, মাস্তান ও দলীয় সন্ত্রাসীরা। এদের শেকড় সমাজের উপর তলায় বহুদূর প্রসারিত। সেজন্য বাজারে নতুন একটা শব্দও চলে এসেছে বলা হয় এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে এক শ্রেণীর মজুতদার সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে যারা ক্ষমতাবানদেরই লােক।
মানুষের মৌলিক চাহিদার অতিপ্রয়োজনীয় তিনটি বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ইতিবাচক অর্জন শতকরা ৯৭ ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা আর শিশুদের টিকাদান কর্মসূচীর সফল বিস্তার। কিন্তু আর্সেনিক সমস্যার কারণে সেই পানি আর নিরাপদ থাকে নি একটা বিরাট জনগােষ্ঠীর জন্য। গড় আয়ু তেমন বাড়েনি, আর জিডিপির মাত্র দেড় শতাংশ রাষ্ট্র ব্যয় করে জনস্বাস্থ্য খাতে। অস্বাস্থ্য ও রোগবালাই দরিদ্র মানুষের জন্য দুর্দশা ডেকে আনে, তাদের ধার-দেনা ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম বড় উৎস হলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুযােগ তারা পায় খুব কম। পাশ-করা ডাক্তার রয়েছেন প্রতি লাখে ২০ জন। সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও অব্যবস্থার কারণে এই অপ্রতুল বরাদ্দেরও সামান্য অংশ গরীরের উপকারে আসে। ২০০৭ সালের ২১ জুনের দৈনিক যুগান্তরে লেখা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের মানসম্মত খাবার জোটে না। রোগীদের জন্য বরাদ্দ কয়েক কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে খাচ্ছে সিন্ডিকেট। ২৫ জুনে খবর ছাপা হয়েছে অর্থবছরের শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের উৎসব’। মোট বরাদ্দ বিশ কোটি টাকার মধ্যে বড় জোর কোটি তিনেক টাকা খরচ হবে বাদবাকী টাকা চলে যাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ডাক্তার নেতা ও তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের পকেটে। অর্থবছরের শেষে এ ধরনের বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ লুটপাটের উদ্দেশ্যেই দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ওই দিনের দৈনিক যুগান্তর-এ ২৬ জুনের নিউজউইকে বাংলাদেশ নিয়ে লেখা প্রতিবেদন অবলম্বনে একজন কলাম লেখকের মন্তব্য, প্রতিকূলতার পাহাড় পেরিয়ে বাড়ন্ত বাংলাদেশ’ । মাত্র দুটো সরকারি মেডিকেল কলেজেই দুর্নীতির যে চিত্র প্রকাশ পেলো  গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার কঠিন বন্ধন থেকে বেরোতে না পারলে এদেশ সত্যিই সকল নাগরিক বিশেষ করে দরিদ্র ও বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য বাড়ন্ত’ হবে কী করে? উচ্চবিত্তরা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদেশে যান, এমনকি মধ্যবিত্তরাও যতটা সাধ্যে। কুলায় গলাকাটা বেসরকারী ব্যবস্থার দ্বারস্থ হন। কেবলমাত্র নিরুপায় নিম্নমধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনদের একাংশ এই নড়বড়ে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গ্রাহক। বাদবাকীদের ভরসা তুকতাক, ঝাড়ফুক, তন্ত্রমন্ত্র ও হাতুড়েরা। সর্ব অর্থে নিরুপায় জনগোষ্ঠীর আরেকটি  রোজগার করে এমন পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার। জরিপ অনুযায়ী, এ দেশের মানুষ তার আয়ের ৫৩.৩১ শতাংশ অর্থই ব্যয় করে খাদ্যসংগ্রহ করতে। ফলে খাদ্যমূল্য বাড়লে দেশের বেশীর ভাগ মানুষের দুর্দশা-দুর্গতি বেড়ে যায় অনুরূপ মাত্রায়। অনাহার-অর্ধাহার হয়ে দাঁড়ায় তাদের নিত্যদিনের নিয়তি।
দারিদ্রলাঘবে বাংলাদেশের অগ্রগতি বছরে ১.২ শতাংশ হারে। এই গতিতে এগুলে এদেশের জনদারিদ্র্য পুরোপুরি নির্মূল হতে সময় লাগবে শতাধিক বছর । একে কি বলা যাবে ‘উন্নয়নের জোয়ারের ফসল? ২০০৪ সালে ইউএনডিপি (UNDP) মানব উন্নয়ন রিপাের্টে ৯৫টি উন্নয়নশীল দেশে মানবদারিদ্র্য সূচকের একটি তালিকা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২ তম, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। একই বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত একুশ শতকে বাংলাদেশ : রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক প্রেক্ষিত’ শীর্ষক পঞ্চদশ দ্বিবার্ষিক সম্মেলনেও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মৌলিক চাহিদার ন্যূনতম প্রাপ্যতা বিবেচনায় দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দরিদ্র এবং এক তৃতীয়াংশ অতি দরিদ্র। আর মানবমর্যাদার নিরিখে এদেশের আরো অনেক বেশি মানুষই দরিদ্র। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বাস যে গ্রামে, সেখানে আয় ও  রোজগারের মূল উৎস হচ্ছে ভূমি। কিন্তু দেশের ৮৬ শতাংশ মানুষই হয় ভূমিহীন বা ভূমিদরিদ্র। দেশের অধিকাংশ মানুষের অন্য কোনাে সম্পদও নেই, থাকলেও তা খুবই কম। সহজ শর্তে ঋণও পায় না তারা। ক্ষুদ্রঋণ বেশকিছু দরিদ্র মানুষ পেয়ে থাকে তবে দরিদ্রতম ১৫ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ পায় না। কারণ এটা পেতে হলে যে পরিমাণ জমি তাদের থাকা প্রয়োজন তা তাদের থাকে না। চড়া সুদের ক্ষুদ্রঋণ কোনো মতে টিকে-থাকা মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ হয়ত গড়ে দেবে কিন্তু স্বচ্ছলতা ও স্বনির্ভরতার মহাদেশ এতে গড়ে উঠবে না। এ সত্য স্বীকার করে নিয়ে ২০০৭ সালের ৬ জুলাই ঢাকায় ক্ষুদ্রঋণ সিকিউরিটাইজেশন (Securitization) কর্মসূচীর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে ব্র্যাক-এর সভাপতি বলেছেন, বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। কেবল ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য। বিমোচন সম্ভব নয়। এজন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে উন্নতি ঘটানো দরকার।’ [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ