বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না

এইচ এম আব্দুর রহিম : বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে দেশ নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের একটি দীর্ঘযাত্রা চলছে। দেশে খাদ্য সংকট বা মঙ্গার মত কোন ব্যাপার আপাতত নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে শান্তি নেই। দেশে গণতন্ত্র নেই। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিষফোঁড়ার মত কিছু বিষয় সামনে এসেছে, যা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এর একটি এসিড মশার প্রাদুর্ভাব আর একটি রোহিঙ্গা সংকট। বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হয়ে গেল কিন্তু এর কোন স্থায়ী সমাধান অদ্যাবধি হয়নি।
 ডেঙ্গু নিয়ে অনেক কথা ও আলোচনা হয়েছে। সমাজের প্রতিনিধি স্থানীয়রা অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু কথা দিয়ে তো সব কাজ হয় না। ডেঙ্গু সমস্যা আগে ছিল তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। মানুষও সেভাবে মারা যায়নি। এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন মহামারি আকার ধারণ করেছে । প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা বেশ ভীতিকর। এ বিষয়ে কথা না বললে নয়। এডিস মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশনের অবহেলা ছিল। যদিও প্রথমে সেটা স্বীকার করেনি। মশা মারতে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে।
তাতে মশা মরে না। যারা ওষুধ আমদানি করেছে তাতে তাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং শাস্তিও হওয়া দরকার। তেমন কোন বিষয়তো দেখলাম না। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগে যদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হত, তাহলে ডেঙ্গু এক ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। এটা গেল একটা দিক। আরেক দিক হলো মন্ত্রী বলেছেন, মানুষতো নানাভাবে মারা যায়। পানিতে ডুবে মারা যায়। দুর্ঘটনায় মারা যায়। মশার কামড়ে মারা গেলে এত হৈচৈয়ের কি আছে? এত শোরগোলের কি আছে? সমাজের প্রতিনিধিদের একটু ভেবে চিন্তে কথা বলা উচিত বলে মনে করি। এখন তো মানুষ ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে সচেতন হয়ে গেছে। তবু এর ছোবল থেকে মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। এটা কিন্তু চিন্তার বিষয়।
তার চেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হচ্ছে। এই দেশে বড় ধরনের ঘটনা ঘটে জনপ্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি অর্ডার দিলে কাজ হয়, আর অর্ডার না দিলে কাজ হয় না। ডেঙ্গুতে এখন একশরও বেশী লোক মারা গেছে। সরকারি হিসেব হয়তো এর চেয়ে আরো কম। এটা তো তারা স্বীকার করে না বলে সংখ্যাটি কম। সংখ্যার চেয়ে জরুরী হচ্ছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতির আর বাড়তে দেয়া যাবে না। যে কোন উপায়ে ডেঙ্গু নিমূলের ব্যবস্থা নিতে হবে। ডেঙ্গু এখন আতঙ্কের নাম।এর মধ্যে মারা গেছে ৫০ জন।শত শত মানূষ ভর্তি রয়েছে হাসপাতালে। যে শহরে দুটি সিটি কর্পোরেশনে মশা নিধনে বাজেট ৪০ কোটি টাকা,সে বাজেটের টাকা কোথায় যায় আমরা এ প্রশ্ন কখনো করি না।
 নগর কর্মকর্তারা নাগরিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব দেখা দেয়। এ রোগের প্রকোপ মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। এখন তা ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। ডেঙ্গুর নায়ক দুজন.এক মশা, নাম এডিস এজিপটি,দ্বিতীয় নায়ক ভাইরাস। এত দিন মানুষ জানত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। এখন জানা যাচ্ছে মশার কামড়ে শরীরে ভাইরাস সংক্রামিত হলে ডেঙ্গু হয়। ডেঙ্গু উপসর্গের মধ্যে রয়েছে তীব্রজ্বর,তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। জ্বর থাকে ৫/৭দিন। প্রথম দুই তিন দিন ধরে জ্বরের উপসর্গ বাড়তে থাকে। তারপর একটু অবদমিত হয়। আবার চতুর্থ আর পঞ্চম দিনে আবার উপসর্গ বাড়তে পারে। মাথা ব্যথা, চোখে ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অস্থি গ্রন্তিতে প্রদাহ এবং প্রচন্ড ব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা তীব্র হবে। জ্বরে গলা ফুলে যেতে পারে। ডেঙ্গু আক্রান্ত খুব কম সংখ্যক রোগী (এক থেকে দুই শতাংশ  হেমোরিক জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। অনেকের ধারনা ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগী হেমোরিক জ্বরে আক্রান্ত হয়, এ ধারনা ঠিক নয়। মশার কামড়ের পাঁচ সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ দৃশ্যমান হবে।
সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময়  রোগ সঞ্চয় থেকে প্রথম রোগ লক্ষণ  দেখা দেয়া পর্যন্ত পাঁচ-সাত দিন। এ জন্য পাঁচ/সাত দিন অপেক্ষা না করে প্যাথলজিকাল পরীক্ষা করা হলে তাতে কিছু বোঝা যাবে না। ডেঙ্গুতে জ্বর ও তীব্র ব্যথাবেদনা থাকে না। কিন্তু হেমোরিক জ্বরে মারাত্মক কিছু উপসর্গ দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ জ্বর ও ব্যথা বেদনা ছাড়াও পেটে তীব্র ব্যথা নাক,মুখ, দাতেঁর মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ,রক্ত বমি, কালো কয়লার মতো পায়খানা ইত্যাদি। ডেঙ্গু আক্রান্তরোগী কে সজাগ দৃষ্টিতে রাখতে হবে। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত ক্ষরণ হলে সু চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু হেমারিজ রোগে আক্রান্ত না হলে ভয়ের কোন কারন নেই। জ্বরে আক্রান্ত হলে দুই তিন দিনের মধ্যে রক্ত ক্ষরণ শুরু হবে।
শিশুদের জন্য হেমোরিক জ্বর ভয়ংকর হতে পারে। হেমোরিক ডেঙ্গুতে শিশুদের মৃত্যুহার  বেশী। ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমনের কারণে হয়ে থাকে বলে এর প্রতিকারে কৌশল  কার্যকরী নয়। এই ডেঙ্গুতে এন্টিবায়েটিক ব্যবহার করা অনুচিত। জ্বর ব্যথা বেদনার জন্য এসপিরিন ও আইবোপ্রুফেন জাতীয় ঔষধ  গুলো রক্তক্ষরনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন সব রোগে ঔষধ প্রয়োজন হয় না। আবার কোন কোন রোগের বেলায় ওষুধ প্রয়োগ করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে হেমোরিক জ্বরের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিজ্ঞ  ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। হেমোরিক ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে  স্থানান্তর করতে হবে। প্রচুর পানি পান করাতে হবে।                       
ডেঙ্গু রোগের হাত থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হল রোগটি প্রতিরোধ করা। ড.কামাল হোসেন বলেছেন, সরকার এ রোগ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গু মশা প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতনতার প্রয়োজন। ডেঙ্গু এসিড মশাবাহিত একটি রোগ। যে টি ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত। ট্রপিকাল কান্ট্রিগুলোতে সাধারণতো এই রোগের প্রার্দুভাব বেশী। যেমন মধ্য আমেরিকায় বেশী হয়। এর মধ্যে রয়েছে মেক্সিকো,বেলিজ ও কোস্টারিকা,থাইল্যান্ড,মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশ এই চেইনে ডেঙ্গুর বিস্তার রয়েছে। সাধারণত এসিড মশা বেশী উচ্চতায় যেতে পারে না। যে কারণে আমরা সমতল  ভূমিতে এই রোগ বেশী দেখে থাকি; যেখানে পানি বেশী থাকে। তবে শারীরিক মেলা মেশায় এটা ছড়ায় না।এটি বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে ছড়ায় না।
এডিস মশার কামড়ে বিশেষ করে এডিস এজিপ টাইয়ের মাধ্যমে এটা ছড়িয়ে পড়ে। এডিস মশার কামড়ে বিশেষ করে এডিস এজিপ টাইয়ের মাধ্যমে এটা ছড়িয়ে পড়ে।এডিস এলবোপিকটাস মশাও ডেঙ্গুর ভাইরাস বহন করে।মশা দেখতে গাঢ় নীলাভ কালো রঙের মশার সমস্ত শরীরে আছে সাদা সাদা ডোরা কাটা দাগ। বেশির ভাগ এসব প্রজাতির মশা পাওয়া যায় থাইল্যান্ড,ইন্ডিয়া, ফিলিপাইন,ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিশেষ করে পোর্টেরিকা,কিউবা,মধ্য আমেরিকা ও আফ্রিকাতে। কেবল উষ্ণ আবহাওয়ায় এই মশা সক্রিয় হয়ে উঠে। ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর সুপ্তবস্থায় থাকে  থেকে ১৫ দিন(সাধারণত ৭ থেকে-১০দিন)। ১৯৮৬ সালে আমেরিকার দক্ষিণ টেক্সাসে ডেঙ্গু রোগটি মহা মারী আকারে দেখা দেয়। মহামারী ঘটে রেইনোসার মেক্সিকো সীমান্তে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব দেখা দেয়েছে বেশ কয়েকবার । ডেঙ্গু কি? এর উত্তর হলো এসিড মশাবাহিত চারধরণের ভাইরাসের যে কোন একটি সংক্রমণে যে অসুস্থতা হয় সেটাই ডেঙ্গু। সীমান্তে এর সাধারণ দুটি ধরণ আছে। এক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর; দুই. হেমোর্যাজিক ফিভার। শেষের টা সবচেয়ে ভয়াবহ।
মশা ম্যালেরিয়ার বাহক। আবার মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের ও বাহক। কোন মশা কোন রোগের কোন রোগের বাহক তা  আপাতত দৃষ্টিতে জানা মুশকিল। আবার কোন মশা ভাইরাসের বাহক আর কোনটি বাহক নয় তা জানা সম্ভব নয়,তাই সব মশা আমাদের শত্রু, সব মশাই আমাদের র্টাগেট। তাই যেখানে মশা পাই সেখানে মশা তাড়াও, মশা সমুলে বিনাশ কর এ হোক আমাদের স্লোগান। এতে সুবিধা দ্বিমুখী। ম্যালেরিয়া মশা, ডেঙ্গুর মশা। সবই নিবর্ংশ হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এই ভাইরাস অন্য সুস্থ লোকের দেহে সংক্রামিত করে এডিস মশা। তাই সংরক্ষণ বন্ধ বা প্রতিরোধ করার জন্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে না কামড়ালে এবং মশা ডেঙ্গু  ভাইরাস বহন না করলে তার কামড়ে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মশা কিভাবে কোথায় জম্মে,কিভাবে এর বংশ বিস্তার ঘটায় এসব আমরা এটা অনেকেই জানি। তার পর ও প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন মশা ঘর বাড়ির আনাচে কানাচে ডিম পাড়ে।
 মশার ডিম পাড়ার জায়গাগুলোর মধ্যে পানি সমৃদ্ধ ড্র্রাম, মাটির ভাঙ্গা হাঁড়ি-পাতিল বা তার ভগ্নাবশেষ। বিভিন্ন ছোট বড় পাত্র। বালতি ফুলের টব, ফুলদানি পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার, পলিথিন, ব্যাগ, ছোট বড় গর্ত, নালা বা পুকুর ইত্যাদি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে সব স্থানে মশা জম্মায় এবং বংশ বিস্তার করে,সেখানটা পরিস্কার পরিছন্ন করে ফেলতে হবে। জলাবদ্ধতা জায়গা শুকিয়ে ফেততে হবে। প্রয়োজন মতো মশার ঔষধ ছিটাতে হবে। পরিবেশ, দূষণ  থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য কে বিরত রাখতে হবে। এই পদক্ষেপ গুলো বর্ষার আগে পরে করা উত্তম। ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব দেখা যায় যে সব দেশে। সেই দেশ গুলো হল,সাউথ প্যাসিফিক, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল,দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল,পাকিস্তান,ভারত,বাংলাদেশ,জাপান ইত্যাদি। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভাল এ কথাটি আমরা প্রায় বলে থাকি। কিন্তু মুখে যাই বলি না কেন বাস্তবে তা প্রয়েগ করি না এখানো রোগ বিপদ আপদ আমাদের ববেক বুদ্ধিকে নাড়িয়ে দেয়,আতঙ্কিত করে। তখন আমরা অনন্যোপায় হলেও কিছুটা সচেতন হই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ