বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মিন্দানাওয়ের স্বাধীনতার পথপরিক্রমা

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : বর্তমান পৃথিবীতে যতগুলো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল রয়েছে তার মাঝে সর্বপূর্বের ছোট্ট অঞ্চলটির নাম মিন্দানাও।  প্রায় ৩৮ হাজার বর্গমাইলব্যাপী শত শত দ্বীপ নিয়ে গঠিত অঞ্চলটিতে প্রায় ৬০০ বছর ধরে ইসলামী অনুশাসনের অনুশীলন চলে আসছে। সাবেক জলো-সলো অঞ্চল নিয়ে গঠিত মিন্দানাওকে স্থানীয় মুসলিমরা ভালোবেসে বাংসামরো বলে অভিহিত করেন। এ যেন তাদের প্রাণের স্পন্দন যা একটি মাত্র শব্দে সাগরের উচ্ছ্বল উর্মিমালাকে একই সূত্রে গেঁথে রেখেছে। ফিলিপিনো জাতীয় সমীক্ষা অনুযায়ী জানা যায়, এ অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ২.৫ কোটি জনগণের ৯৮% মুসলিম এ অঞ্চলে বসবাস করছেন।
মিন্দানাওয়ে ইসলামের আগমন: ১৪ শতকে ভারত উপমহাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যখন ইসলাম দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করছিল তখন শায়েখ করিম আল মাখদুমের নেতৃত্বে আরব বণিকরা বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে এ অঞ্চলে আসেন। ব্যবসার পাশাপাশি ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারে তাঁরা নিজেদের নিয়োজিত করাতে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা খুব দ্রুতই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে থাকেন। শুরু হয় ইসলামের বিজয় মিশন। কিছুদিন পর অঞ্চলটিতে প্রথমবারের মত সাঈয়েদ আল হাশিম আবু বকরের মাধ্যমে সালতানাতের শুরু হয়। তাঁকে ডাকা হতো শরিফ আল হুসাইন উপাধিতে। পরবর্তীতে ব্রুনাই স¤্রাট সুলতান বলখিয়া মিন্দানাও দখল করে নিলে এই দ্বীপপুঞ্জে ইসলামের আধিপত্য আরও অধিক দৃঢ় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অঞ্চলটি নানান সময়ে কখনও মালয়, কখনও চাইনিজ এবং কখনও স্থানীয় সুলতানদের মাধ্যমে শাসিত হতে থাকে। কিন্তু শান্তির আকাশে কালোমেঘ উঁকি দিতে বেশি সময় নেয়নি। ষোড়শ শতকে আন্দালুস বিজয়ী স্প্যানিশরা মুসলিমদের পরাজিত করবার লক্ষ্যে দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়ে। স্পেনের কর্ডোভা ও গ্রানাডাসহ স্বনামধন্য মুসলিম আঞ্চলিক পরিচিতিতে অবশ্যই সর্বপূর্বের এ অঞ্চলটির নাম ছিল এবং সম্পদ ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মিন্দানাও কলোনি আধিপত্যবাদীদের কালো দৃষ্টিতে পড়তে সময় নেয়নি।
সম্পদের পাশাপাশি পৃথিবীর সর্বপূর্ব থেকে প্রতিদিন আল্লাহর নাম ঘোষিত হয়ে দিন শুরু হবে এ যেন তাদের সহ্য হচ্ছিল না। তাই এডমিরাল মিগুয়েল লোপেজ ডি লেগাসপির নেতৃত্বে আধুনিক সমরাস্ত্রসজ্জিত নৌবাহিনী প্রেরণ করলে তারা শান্তিপ্রিয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নারকীয় তা-ব চালায়।  সুলতান সুলাইমান স্প্যানিশদের কাছে পরাজিত হলে খুব দ্রুতই সমগ্র মিন্দানাও অঞ্চল স্প্যানিশ খৃস্টান মিশনারিদের দখলে চলে যায় ও অঞ্চলটি স্পেনের সর্বপূর্বের ঘাঁটি ও কলোনিতে রূপান্তরিত হয়। চলতে থাকে একদিকে মুসলিম নিধন অপরদিকে খৃস্টান রাষ্ট্রীয়করণ। মুসলিম মিন্দানাও, ম্যানিলা ও অন্যান্য অঞ্চল দখল করে স্প্যানিশ রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নামানুসারে অঞ্চলটির নতুন নামকরণ করা হয় ফিলিপাইন।  স্প্যানিশদের পরবর্তীতে ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারে বিজয়ী হয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ১৮৯৮ সালে নিজেদের কলোনি হিসেবে ঘোষণা করে। শুরু হয় নতুন এক কালো অধ্যায়। 
মরো মুসলিম আন্দোলন: মুসলিমদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আঘাতের পর আঘাত খেয়েও ঢলে না পড়ে লড়ে যাওয়ার মানসিকতা প্রদর্শন।  স্প্যানিশদের নানাবিধ অত্যাচার, নিষ্পেষণ, লুন্ঠন ও গণহত্যার পরও মুসলিমরা বারংবার উঠে দাঁড়িয়ে লড়ে যাবার মানসিকতা দেখিয়েছেন। নানান অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে লড়াই করে যাবার ফলে মিন্দানাও এককভাবে স্প্যানিশদের অধীনস্ত হয়নি। এরপর আমেরিকার কালো হাতের ছোবল থেকে বাঁচতে স্থানীয় মুসলিমরা নানান সময়ে লড়াই করে গেছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ফিলিপাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরই যেন ম্যানিলা সরকার সব ভুলে বসে। 
এভাবেই খ-খ- লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধিকার আন্দোলন চালিয়ে গেলেও কোনও সামগ্রিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতাকামী জনতার প্রধান বাধা ছিল নিজেদের স্ব স্ব জাতীয় চেতনা। ফিলিপাইনের স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই জলো ফিলিপাইনের অধীন হতে অনীহা প্রকাশ করে। ১৯১২ সালে আমেরিকান কংগ্রেস ফিলিপাইনের স্বাধীনতার কথা চিন্তা করলে ১৯২১ সালে জলোর প্রায় ৫১ জন নেতা প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন ডি হার্ডিংয়ের কাছে প্রস্তাব রাখেন যে, এ অঞ্চলের মুসলিমরা খৃস্টান ফিলিপাইনদের শাসন মানতে প্রস্তুত নয়। তার চাইতে বরং জলোকে আমেরিকা ইচ্ছা করলে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করতে অথবা আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। যারা সীমান্তের পর সীমান্তে ঝগড়া লাগিয়ে রেখেছেন তাঁরা কি মেনে নেবেন কখনও এমন প্রস্তাব? তাই আমেরিকা টালবাহানা করে অবশেষে ম্যানিলার অধীনস্ত করেই মিন্দানাওকে স্বাধীন ফিলিপাইনের অংশ বলে ঘোষণা করে।
৪৬, ৪৭, ৪৮ এই তিন বছরে পৃথিবীর তিনপ্রান্তে মুসলিমদের জন্য এক বিড়ম্বনা ফিলিপাইন, ভারত ও ইসরাঈল নামক রাষ্ট্রগুলোর জন্ম হয়।  
ম্যানিলা ও জলোর এই যে টানাপোড়েন তা ১৯৪৬ সালের স্বাধীনতা লাভের পরও চলতে থাকে। ধীরে ধীরে দুই অঞ্চল উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৬১ সালে কংগ্রেস ওমর আমিলবাংশা বিল নং- ৫৬৫৮ এ জলো তথা মিন্দানাওকে স্বাধীনতা দেবার দাবি জানান।  ম্যানিলা সরকার তা মেনে নিতে পারেনি। স্বৈরশাসক ফার্ডিনান্ড মার্কোস মিন্দানাওবাসীর প্রায় ৩ শতাধিক বছরের প্রাণের দাবি গলাটিপে হত্যা করতে চালায় গণহত্যা যা জাবিদা গণহত্যা নামে পরিচিত। 
মুসলিম নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন সরল পথে মিন্দানাওয়ের মুক্তি অসম্ভব। তাই দাতো উতুগ মাতালান ১৯৬৯ সালে জাবিদা গণহত্যার পরপরই স্বাধীন মিন্দানাওয়ের ইশতেহার ঘোষণা করে গঠন করেন ‘মুসলিম ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিন্দানাও’। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় হঠাৎ গড়ে ওঠা দলে নেতৃত্বের সংকট। ১৯৭২ সালে সৃষ্টি হয় নূর মিসৌরির আরও সুসংহত সংঘটন ‘মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’। রাজনৈতিক দাবি আদায়ে শুধুমাত্র আন্দোলন নয় চলতে থাকে যুদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে নূর মিসৌরী মিন্দানাওকে বাংসামরো রিপাবলিক হিসেবে ঘোষণা করেন। 
ম্যানিলা সরকার মুসলিমদের প্রাণের দাবি মেনে নিতে পারেনি। কারণ তাঁদের চোখে মুসলিমরা ছিলেন সংখ্যায় ১০% এবং ফিলিপিনো ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই ফিলিপাইন সরকার মুসলিমদের ওপর নির্দয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরই মাঝে ফ্রন্টে আদর্শিক সংঘাত শুরু হলে ইখওয়ানপন্থি নেতা হাশিম সালামত 'মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট' নামে আলাদা দল গঠন করে মানুষের মনে শুধু মিন্দানাওয়ের স্বাধীনতাই নয় বরং ইসলামী মিন্দানাওয়ের স্বপ্ন বোনা শুরু করলে তা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। এবার ‘এমআইএলএফ’-এর প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় সহায়তায় এগিয়ে আসে মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই দারুসসালাম।
আমেরিকা এতদিন ম্যানিলাকে সমর্থন ও সাহায্য দিয়ে আসলেও মুসলিম ফ্রন্ট নাম শুনেই যেন তাদের পিলে চমকে ওঠে। এবার আমেরিকা ‘এমআইএলএফ’-কে ধ্বংস করতে শুধু সহায়তাই নয় বরং ৭ম নৌবহরের মেরিন সেনাদের লেলিয়ে দেয়। মোড়লরা চুপচাপ প্রত্যক্ষ করে ধ্বংসযজ্ঞ। একদিকে ফিলিপাইন ও আমেরিকা, অন্যদিকে এমএনএলএফ বনাম এমআইএকএফ দ্বন্দ্ব মিন্দানাওবাসীদের স্বপ্নগুলোকে নানান সময় নানান দিকে ঘোরায়। শত বাধা বিপত্তির পরও এমআইএকএফ নিজ দাবির প্রতি অটল থেকে জনমানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথা ভেবে ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যায়। যদিও মাঝে কয়েকবার এই দ্বীপাঞ্চল দ্রোহের আগুনে জ্বলেছে। কিন্তু তা খুব বেশি সময় ধরে এগোয়নি। ২০১২ সালে শান্তিচুক্তি, ২০১৪ সালে পিস চ্যায়ার লাভ দলটিকে আরও উচ্চে নিয়ে যায়। যার সর্বশেষ সংযোজন বর্তমান মিন্দানাওয়ের স্বায়ত্বশাসন লাভ। মিন্দানাও শুধু একটি অবহেলিত মুসলিম অঞ্চলই নয় বরং সমগ্র বিশ্বে উপেক্ষিত মুসলিমদের জন্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আদর্শিক নাম। আসলে এই হচ্ছে হার না-মানা মিন্দানাওয়ের স্বাধীনতার পথপরিক্রমা। স্বায়ত্তশাসনের পথ ধরেই মিন্দানাওয়ে হয়তো খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ