বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বিশ্বমোড়লদের ভূমিকা

দু’বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও ধর্ষণের মুখে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় দেশটির সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা। তাঁদের জায়গা-জমি বাজারহাট, দোকানপাট সবই এখন দেশটির সেনাসদস্য ও রাখাইনদের জবরদখলে। মৃত্যুকূপ থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সরকার চমৎকার মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। উল্লেখ্য, আগে থেকেই প্রায় দেড়-দু’লাখ রোহিঙ্গা বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরমধ্যে দু’বছরে আরও অনেক রোহিঙ্গাশিশু এখানে জন্ম নিয়েছে। তাই সব মিলে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এখন প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ। নিঃসন্দেহে এদেশের জন্য একটি বিরাট বোঝা। বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সাহায্যের জন্য বিশ্বের বিবেকবান সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তায়ও দিয়েছে বিশ্বসাহায্য সংস্থাগুলো। তবে এভাবে আর কতদিন আমাদের বোঝা হয়ে থাকবেন রোহিঙ্গারা? এটা একটা মানবিক প্রশ্ন। আবার মৃত্যুপুরীতে ওদের ঠেলে দেয়াও হবে অমানবিক। রোহিঙ্গারা নিজবাড়িঘরে ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছেন। এদেশে আশ্রয় নেবার দু'বছর পূর্তির এক সমাবেশে একথাই দৃঢ়কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তাঁদের দেশে ফিরবার এ সদিচ্ছার জন্য ধন্যবাদ। তবে সেখানে ফিরে ওরা যাতে জীবন নিয়ে বাঁচতে পারেন, তাঁদের স্ত্রী-কন্যারা নিরাপদ থাকেন সে নিশ্চয়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এব্যাপারে বিশ্বমোড়লদের যথাযথ ভূমিকা অবশ্যই থাকবে। অন্যথায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে ক্ষুধার্ত শেয়ালের গর্তে মুরগি ফেলে দেবার শামিল।
মনে রাখতে হবে বেড়াল কিন্তু সাধে গাছে ওঠে না। কুত্তা যখন ধরবার জন্য তেড়ে আসে তখন প্রাণ বাঁচাতে গাছে ওঠে। রোহিঙ্গারা এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েই বাড়িঘর, জায়গাজমি ফেলে নাফনদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। মরণাপন্ন এবং পলায়নপর মানুষের ওপরও গুলি চালিয়েছে মিয়ানমারের সেনাসদস্য ও রাখাইন অস্ত্রবাজরা। মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের প্রতি জেনোসাইড বা গণহত্যা চালিয়েছে তাতো জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের রিপোর্টেই প্রকাশ। এরপরও যারা বলতে চান রোহিঙ্গারা ‘সখ করে’ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন, তাঁরা আসলে বিবেক-বিবেচনা বিসর্জন করেছেন বৈকি। বাংলাদেশ অবশ্য দু'দফা উদ্যোগ নেয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের। দিন-তারিখও ঠিক করা হয়। কিন্তু মিয়ানমারের অনাগ্রহ এবং রহস্যজনক আচরণে রোহিঙ্গারা যেমন প্রত্যাবাসনে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন, তেমনি রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশও সাময়িকভাবে থেমে যায়। তবে এ শুভ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আর যেক'জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাবার কথা ওঠে তা খুবই নগণ্য এবং হাস্যকর।
রোহিঙ্গারা নিজবাড়িঘরে ফিরতে চান না এমন নয়। তাঁরা সবাই ফিরতে চান। তবে তাঁরা কেড়ে নেয়া নাগরিকত্ব, জায়গাজমি ফেরত এবং নিরাপদ বসবাসের অধিকার চান। এর নিশ্চয়তা পেলে কয়েক হাজার করে নয় একসঙ্গে এবং একযোগে সবাই দেশে ফিরতে আগ্রহী। এটাই তাঁরা শরণার্থী হবার দ্বি-বার্ষিকীর সমাবেশে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন। আকুতি জানিয়েছেন দেশে ফিরবার। নিজের দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পেলে কেউ কি শরণার্থীশিবিরের ঘিঞ্জিঘরে বাস করতে চান? নিশ্চয়ই না।
আমরা মনে করি রোহিঙ্গারা নিজদেশে ফিরে যাবেন। এজন্য তাঁরা প্রস্তুতও। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করে কালক্ষেপণ করছে। বারবার ধোঁকা দিচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠাতে দু'দফা ব্যর্থ হয়ে যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁদের সুযোগ-সুবিধে বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়েছেন তা অনেকটাই অসৌজন্যমূলক এবং অবমাননাকর। রোহিঙ্গাসমস্যা বাংলাদেশ একা সমাধা করতে পারবে না। বিষয়টি এখন দ্বিপাক্ষিক নয়। বহুপাক্ষিক। জাতিসংঘসহ আমেরিকা, রাশিয়া, চিন, ভারত, জাপানের হস্তক্ষেপ ব্যতীত মিয়ানমার মাথা নত করে রোহিঙ্গাসংকট নিরসনে অগ্রসর হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিন এবং ভারত রোহিঙ্গারা নিজদেশে ফিরে যাক তা মনেপ্রাণে চায় না। সরাসরি বিরোধিতাও করে না। এ দোমুখো নীতির কারণে রোহিঙ্গাপ্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চাপে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষত পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। আর্থসামাজিক জটিলতাও কম সৃষ্টি হচ্ছে না। শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে পার্বত্য অঞ্চলের জটিলতা আরও বাড়বে। তাই সসম্মানে শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ খুব জরুরি। এব্যাপারে বাংলাদেশকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। কারণ সমস্যাটা এখন আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। তবে এগোতে হবে কৌশলে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ