সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

আসলের নকল, নানা কমিশন এবং দুর্নীতির সয়লাব

ইবনে নূরুল হুদা : আমার মামীর নাম ‘ইন্দিরা গান্ধী’। বিষয়টি নিয়ে আমার কৌতুহলের অন্ত ছিল না। মামীর বাবা-মা কেন সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নামে মেয়ের নাম রেখেছিলেন তা আমার কাছে মোটেই বোধগম্য হয়নি। আমরা তাকে জানি ‘গান্ধী মামী’ হিসেবে। মা ডাকেন ‘গান্ধী ভাবী’। এমনিভাবেই ‘গান্ধী’ নামের সাথে ‘সম্পর্ক’ যোগ করে তাকে সম্বোধন করেন স্বজনরা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তাকে কখনো উষ্মা প্রকাশ করতে দেখিনি। বরং তার নীরব অভিব্যক্তিই বলে দেয় তার প্রকৃত নামই ‘ইন্দিরা গান্ধী’। যা ছিল আমার চিন্তার বাইরে।

মাতৃতুল্য মামী বেশ আগেই বিধবা হয়েছেন। বয়সের ভারে অনেকটাই নুব্জ এখন। বেশ রাশভারী মানুষ। কথাবার্তায় বেশ হিসেবী। পরিচ্ছদে কেতাদুরস্ত; চালাফেরাও বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ। সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ‘প্রিয়দর্শিনী’র মতই দীর্ঘাঙ্গীনি। তাই মনে হতো এজন্যই হয়তো মামীর নাম হয়েছে ‘ইন্দিরা গান্ধী’। একথা ভেবে মাঝে মাঝে পুলকিতও হতাম আমি। 

কিছু দিন আগে বাড়ী যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এসেছিলেন মেঝো খালাও। রাতে আলাপচারিতায় মা’র কাছে জানতে চেয়েছিলাম  ‘গান্ধী মামী’র নামের রহস্য নিয়ে। হঠাৎ বৃষ্টির মতই মা-খালা দু’জনেই এক পসলা হেসে দিলেন। খালা এবার ফাঁস করলেন ‘ইন্দিরা গান্ধী’ নামের লুকানো রহস্য। জানলাম ‘আসমা খাতুন’এর স্বামীর নাম (মামার নাম) ‘মুজিব’ জন্যই রহস্য করে লোকজন তাকে ‘ইন্দিরা গান্ধী’ বলে ডাকা শুধু করে। আর এই রহস্যের আড়ালেই ‘আসমা’ নাম ঢাকা পড়েছিল এই দম্পতির জীবনের শুরুতেই। 

নামের এমন বিকৃতি আমাদের সমাজে নেহাত কম নয়। ‘আসমা’ নামের বিকৃতি ঘটেছিল বৈবাহিক কারণে। বিষয়টি নিয়ে তার কৃতিত্ব, অপরাধ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য কোনটাই অনুষঙ্গ ছিল না। বরং জীবনের এক অনিবার্য বাঁক পরিবর্তনের ভিকটিম হয়েছেন তিনি। মেনেও নিয়েছেন স্বাভাবিক ভাবেই। ‘মামী’ হয়তো এই নামের আড়ালেই অতীতের বিস্মৃত স্মৃতিগুলোই রোমন্থন করে শান্তনা খোঁজেন। এমনটিই মনে হয়েছে আমার কাছে।

আমাদের সমাজে ব্যক্তির আচার-আচরণ, স্বকীয়তা, বৈশিষ্ট্য ও কর্মের জন্যও নামের বিকৃতি ঘটে বা ঘটানো হয়। আর তা প্রায় ক্ষেত্রেই হয় নেতিবাচক ভাবনায়। অবশ্য সীমিত ক্ষেত্রে হলেও ইতিবাচকও হয়। যেমন শামসুন্নাহার ভাবী ছিপছিপে গড়নের জন্য ‘ফুরফুরী’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তেমনি বৈশিষ্ট্যগত কারণে নিঃসন্তান আমেছা খাতুন-লাড্ডুর মা, প্রফুল্ল চন্দ্র-ফুলা, রকিব উদ্দীন-অকি, জামাল উদ্দীন-লৈরা, রহিমা খাতুন-ঢৈমা, মমতাজ-ভোলান, রজীব উদ্দিন-বঙ্কিম এবং মোতাহার-পোড়া নামে পরিচিতি পেয়েছেন। এদের অধিকাংশই আমার নিকট প্রতিবেশী হলেও আমাদের দেশের একজন প্রয়াত রাজনীতিকও নিয়ন্ত্রণহীন ও অনির্ভরযোগ্য কথাবার্তার কারণেই নানাবিধ বিশেষণে বিশেষিত হয়েছেন । যা আমাদের লোকাচারের ঐহিত্যকে ও বৈশিষ্ট্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

নামের এমন বিকৃতি যে ব্যক্তি পর্যায়ে হয় এমন নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরেও এমন বিকৃতির ঘটনা বিরল নয়। একথা কারো অজানা নয় যে, আমাদের দেশে নিকট অতীতে ছিল ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’। কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণেই তা ‘দুর্নীতি লালন ব্যুরো’ হিসেবে জনশ্রুতি ও পরিচিতি পেয়েছিল। অবস্থাটা এমন প্রান্তিকতায় পৌঁছেছিল যে, শেষ পর্যন্ত এই ব্যুরো বিলুপ্ত হয়ে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ এর যাত্রা শুরু হয়। মনে করা হয়েছিল যে, এই কমিশন দুর্নীতি দমনে সহায়ক হবে। কিন্তু আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি বরং ‘গুড়ে বালি’ পড়েছে। কমিশনের আহামরি কোন সাফল্য এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়নি বরং কমিশন শুধু কর্মদক্ষতার  পরিচয় দিয়েছে বিরোধী দল দুরস্ত করার ক্ষেত্রে-এমন অভিযোগ রয়েছে প্রায় সর্বমহলে। জাহালম নামে একজন শ্রমিককে নিয়ে দুদক যেভাবে বিতর্কিত হয়েছে তাতে ‘কমিশন’ও ‘ব্যুরো’র ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে কি না, এমন কথা উঠেছে মানুষের মুখেমুখে। কমিশনের নামের সাথে কোন ‘অপবিশেষণ’ যোগ হয় কি না সে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। কারণ, দুদক বিরোধী দল ঠেঙিয়ে যেভাবে সরকারি দলের নেতাদের অতীতে দায়মুক্তি দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে তাতে কেউ যদি ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ এর নাম বিকৃত করে ‘দায়মুক্তি কমিশন’ আখ্যা দেয় তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। এমনটিই মনে করেন আত্মসচেতন মানুষ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা দল যখন স্ব স্ব নামের সার্থকতা প্রমাণ ও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় তখনই নামের বিকৃতি বা নামে সাথে নতুন বিশেষণ বা অপবিশেষণ যোগ হতে দেখা যায়। যেমন কোন সরকারের যখন নৈতিক বিচ্যুতি ঘটে তখন সরকারের সাথে ‘গণবিরোধী’, ‘অগণতান্ত্রিক’, ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘ফ্যাসিবাদী’ সহ নানা ধরনের অপবিশেষণ যুক্ত হওয়া অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর রাষ্ট্রের কার্যকারিতা যখন শিথিল হয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয় ‘ব্যর্থ’ নামের তকমা। ম্যাক্স ওয়েবারের প্রভাব বিস্তারকারী সজ্ঞানুযায়ি, ‘রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আইনানুগ বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাদের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্রবাহিনী, নাগরিক, সমাজ, আমলাতন্ত্র, আদালত এবং আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী’। এসব উপকরণে আমাদের কোন কমতি আছে বলে মনে করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বিচ্যুতিটা হলো আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। তাই আমাদের দেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলা না হলেও একেবারে ‘সফল রাষ্ট্র’ বলার সুযোগটা এখনও সৃষ্টি হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

মূলত আইন প্রণয়ন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এমন ধারণা থেকেই রাষ্ট্র নামক সংঘের ব্যুৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে  আমাদের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটাই ভারী বলে  মনে করার মত অনুসঙ্গ বিদ্যমান। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, বাংলাদেশে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু অবস্থান নিয়ে সরকার কথা বলার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করেছে। ভিন্নমত ও বিরোধী দলের প্রতি অসহিষ্ণুতার কারণেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত ২৭ আগস্ট এক আলোচনা সভায় ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘...বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করেই বঙ্গবন্ধুর সোনারবংলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তার বক্তব্যে ¯পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে নির্মূলতন্ত্র চলছে। ফলে দেশে একটা ভয়ের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আর এমন ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দেশে সুশাসন ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকার যে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় রয়েছে, এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধী শক্তি দূর্বল হয়ে পড়েছে সরকারি দলন-পীড়ন ও অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই। মূলত শক্তিশালী বিরোধী অবস্থানে কেউ থাকতে না পারায় সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতির কারণে মুক্তিযুদ্ধের  মূল চেতনা-গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির  দিকেই যাচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টমহল। সঙ্গত কারণেই আমাদের রাষ্ট্রাচার ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না সে প্রশ্নও ক্রমেই জোরালো ভিত্তি পাচ্ছে। ফলে দেশে গণতন্ত্রের পরিবর্তে ‘জুলুমতন্ত্র’ চলছে-একথা বললে কি অত্যুক্তি করা হবে ?

মূলত ব্যর্থ রাষ্ট্র বলতে এমন এক পর্যায়ের রাষ্ট্রকে বোঝায় যেখানে সরকার ও সমাজ রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক দাবী পূরণে ব্যর্থ হয়। একবিংশ শতকের শুরুতে পাকিস্তান সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পশ্চিমারা এমন তকমা ব্যবহার করতে শুরু করে। এরূপ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উত্তর-ঔপনিবেশিককালে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী কর্তৃক অর্থনৈতিক সাহায্য, ত্রাণ ইত্যাদি পাওয়া সত্ত্বেও নিজস্ব অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থা, জি ডি পি, জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক মর্যাদা পাল্টাতে পারেনি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে যেখানে উল্লেখযোগ্য হারে উন্নয়ন সাধিত হয়নি এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকারের মত অনুসঙ্গগুলোও হয়ে পড়েছে ভঙ্গুর। 

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া, আফ্রিকার এবং মধ্য এশিয়ার কতিপয় দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাছাড়ও ১৯৭০-৮০’র দশকের লেবানন, কঙ্গো, কলম্বিয়া প্রভৃতি দেশগুলোও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। যেসব বৈশিষ্ট ও ব্যর্থতার কারণে এসব দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছে তার কিছু অনুসঙ্গ আমাদের মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণের আশু কোন সম্ভবনাও দেখা যাচ্ছে না। তাই ক্রমেই আমরাও ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করতে যাচ্ছি কি না সে প্রশ্নের ভিত্তিও ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।

ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় আমাদের দেশের নাম না থাকলেও সুশাসন ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক বৈশ্বিক সূচকে আমাদের অবস্থা মোটেই ইতিবাচক নয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আমাদের দেশের সুশাসনের সূচক বিষয়ক যেসব গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়নি বরং আমাদেরকে হতাশই করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘঠিত সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও নিষ্ঠুরতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংঘঠিত নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। 

এতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে সরকারের সংসদীয় কাঠামোর কথা উল্লেখ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষমতা থাকে একব্যক্তির হাতে। বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন বিবেচনাতেই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। একইসঙ্গে ভোটার ও বিরোধীদলকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মত নানা অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় বিশ্বস্ত কিছু সূত্র থেকে হয়রানি, হুমকি, গ্রেফতার ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে যা বিরোধী দল ও তার সমর্থকদের স্বাধীনভাবে প্রচারণা ও সমাবেশে বাধা সৃষ্টি করেছে’।

এই প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদ্যপান্ত তুলে ধরা হয়। যা বহির্বিশ্বে যেমন আমাদের সন্মান বৃদ্ধি করেনি, তেমনি আমরা নিজেরাও আত্মপ্রবঞ্চিত জাতি হিসেবে আত্মশ্লাঘায় ভুগছি। মূলত এবারের নির্বাচন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোন মহলের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বক্তব্য থেকে। গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। সম্প্রতি এক নিয়োমিত সংবাদ সম্মেলনে ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র রবার্ট পালাদিনো সেই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। ভুয়া ভোট, ভোটার ও বিরোধীদের হুমকি দেওয়াসহ অনিয়মের খবর বিস্তৃতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।’ যা আমাদের এ যাবৎকালের সকল অর্জনকেই ম্লান করে দিয়েছে।

মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের দেশের গণতন্ত্রের সব যাত্রা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে রাতেই ব্যালট বাক্স ভরানোর অভিযোগ এবারই প্রথম উঠেছে। এমন অভিযোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে করা হলেও প্রথম দিকে নির্বাচন কমিশন কোন ভাবেই পাত্তা দিতে চায়নি। ফলে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন হুদা কমিশন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, নির্বাচন নিয়ে অতি বাজে অভিজ্ঞতার কারণেই জনগণ এখন রীতিমত নির্বাচন বিমূখ। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর ডিএনসিসি ও উপজেলা নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় ভোটারশুণ্য। একথা সরকারি দলের অনেক নেতার বক্তব্য থেকেও প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি সে কথার স্বীকৃতি মিলেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য থেকেও। 

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ না থাকলে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে’। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে যে জনগণের অংশগ্রহণ নেই একথার মাধ্যমেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার আত্মস্বীকৃতি মিলেছে। কিন্তু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তার চেয়ারও ঝুঁকির মুখে পড়বে একথা তিনি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আর কী কারণে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ নেই, আর দেশের মানুষ কেনই নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েছে এ নিয়ে তার কোন বক্তব্য নেই। মূলত আমাদের দেশের নির্বাচন সংস্কৃতির এই বেহাল দশার জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনই অধিক দায়ি বলে মনে করা হয়। যদিও এ বাজে অবস্থার সূচনা হয়েছিল গত ‘রকীব’ কমিশনের সময় থেকেই।

বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের ইঙ্গিতও বেশ গুরুত্ব বহন করে। তার বক্তব্য খুবই বাস্তব সম্মতবলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের শোকযাত্রায় সামিল হতে চাই না। রাজনৈতিক দলগুলোর এই বিষয়টা বিবেচনা করে দেখা উচিত। তার ভাষায়, ‘নির্বাচন বিষয়ে অনাস্থা থেকেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। যেসব কারণে আমরা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি, সেসবের কারণ খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত আবশ্যক’। কিন্তু তার এই যৌক্তিক কথাগুলো সরকার বা সংশ্লিষ্টরা মোটেই আমলে নিচ্ছে না। তাই সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই থেকে যাচ্ছে।

মূলত সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জনমতের প্রতিফলন ঘটছে না এমন কারণেই জনগণ এখন নির্বাচনবিমূখ। আর এ জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনকেই দায়ি করছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। বিষয়টি নিয়ে পরোক্ষভাবে হলেও নির্বাচন কমিশনের আত্মস্বীকৃতিও মিলেছে। মূলত সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পানেনি। কমিশনের বিরুদ্ধে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংসের অভিযোগও বেশ জোরালো। 

সাধারণ মানুষ মনে করছে দেশে কোন নির্বাচন হচ্ছে না বরং যা হচ্ছে তা রীতিমত ‘প্রহসন’। আর দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের জন্য প্রধানত নির্বাচন কমিশনকেই দায়ি করা হচ্ছে। তাই অদুর ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের নামে বিকৃত করে কেউ যদি ‘প্রহসন কমিশন’ বা ‘সর্বনাশ কমিশন’ বলে আখ্যা দেয় তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। 

শুধু নির্বাচন ব্যবস্থা ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে নয় বরং আমাদের দেশে অবক্ষয় এখন প্রায় ক্ষেত্রেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে  উঠেছে। দেশে যৌন নির্যাতন সহ অবাধ যৌনাচারের ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর ব্যাপ্তী এখন সর্বত্রই। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই একশ্রেণির জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারাও। নিজের সহকর্মী অথবা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অন্য নারীদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে একশ্রেণির আমলাদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এসব ঘটনায় উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ছাড়াও যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলার ঘটনাও ঘটেছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনকই বলতে হবে। জানা গেছে, ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রায় এক বছর ধরে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করে আসছিলেন উপসচিব এ কে এম রেজাউল করিম রতন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। 

গত বছরের ২৪ অক্টোবর নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক  গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী নারী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগ করেছেন, জেলা প্রশাসক তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কুপ্রস্তাব ও রাতে সার্কিট হাউজে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে  দেয়ায় তাকে দাফতরিকভাবে হয়রানি করা হয়। এর প্রতিকার চেয়ে ওই ম্যাজিস্ট্রেট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।  সে অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ওএসডি করা হয়।

সম্প্রতি জামালপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরকে একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে তার অফিসের একজন নারী কর্মচারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যায়। যা অতীতের সকল ঘটনাকে হার মানিয়েছে। কারণ, জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজ অফিস কক্ষেই নিজের জন্য ‘রঙ্গশালা’ বানিয়ে তার নারী অফিস পিয়নের সাথে আদিম উম্মত্ততায় মেতে উঠেছেন। যা অতীত সকল নগ্নতাকে হার মানিয়েছে। 

আমাদের দেশে জনপ্রশাসন নিয়ে নানা অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। আর একশ্রেণির অতি উচ্চাভিলাষী আমলার কারণে গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমলাতন্ত্র যেভাবে বিতর্কিত হয়েছে তার রেশ কাটিয়ে ওঠা হয়তো সহসাই সম্ভব হবে না। কিন্তু একশ্রেণির ইন্দ্রিয়পরায়ণ আমলার কারণে প্রশাসনে যেভাবে কালিমা লেপন হলো এজন্য কেউ ‘জনপ্রশাসন’ এর নাম বিকৃত করে যদি ‘যৌনপ্রশাসন’ আর কার্যালয়কে ‘রঙ্গালয়’ আখ্যা দেয় তাহলে তার প্রতিবাদ করার মত নৈতিক ভিত্তি থাকবে ?  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ