সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

সড়ক দুর্ঘটনা এবং অরক্ষিত ফ্লাইওভার

 

রাজধানী ঢাকা সবদিক থেকেই এক বিপদজনক মহনগরীতে পরিণত হয়েছে। পুলিশের মাধ্যমে সরকারের উপর্যুপরি হুমকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও গত ২৭ আগস্টও বাংলামোটর এলাকায় বাসের চাকায় থেতলে গেছে একজন নারীর পা। কৃষ্ণা রায় চৌধুরী নামের এই নারীকে এখন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকরা তার থেতলে যাওয়া পাটিকে কেটে ফেলেছেন। ফলে কোনোভাবে বেঁচে গেলেও কৃষ্ণা রায় চৌধুরীকে সারাজীবন একটি পা ছাড়াই চলতে হবে। 

ওদিকে অনুসন্ধানে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে সেগুলোর কোনো একটিও বাস মালিক ও চালকের পাশাপাশি সরকার ও পুলিশেরও পক্ষে যায় না। কারণ, বছরের বেশি সময় ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেও দুটি বিশেষ তথ্য সচেতন মানুষ মাত্রকে ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত করেছে। প্রথম তথ্যটি হলো, বাসটি চালাচ্ছিল এক বদলি চালক। অর্থাৎ সে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিয়মিত চালক ছিল না। 

দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, ক্যান্টনমেন্ট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত রুটে চলাচলকারী বাসটির বিরুদ্ধে এর আগেও কয়েকটি মামলা হয়েছে। ওদিকে দ্রুতই শেষ হচ্ছে বাসের রুট পারমিটের মেয়াদ। অর্থাৎ সবদিক থেকেই বাসটি চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেটা শুধু চলাচলই করছিল না, একজন নারীর জীবনকেও বিপন্ন করে ছেড়েছে।

প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণে শুধু নয়, অন্য কিছু কারণেও সম্প্রতি রাজধানীর সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন ফ্লাইওভারের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৬ আগস্টের সর্বশেষ ঘটনায় একজন পাঠাও চালককে ছুরিকাঘাত করে তার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই করেছে দুর্বৃত্তরা। রক্তাক্ত পাঠাও চালককে রাস্তায় ফেলে রেখে তারা মোটর সাইকেলটিও নিয়ে গেছে। এখানে একটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ফ্লাইওভারে একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আর এর প্রধান কারণ হলো, কোনো ফ্লাইওভারেই পুলিশসহ কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো টহল বা প্রহরা নেই। আমরা মনে করি, ফ্লাইওভারগুলো যেহেতু সাধারণ কোনো সড়ক নয় এবং বিশেষ করে রাতের বেলায় যেহেতু প্রতিটি ফ্লাইওভারই যানবাহন ও মানুষবিহীন এবং নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, সেহেতু ফ্লাইওভারগুলোর কিছু কিছু এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সশস্ত্র পুলিশের প্রহরার ব্যবস্থা করা দরকার।

প্রসঙ্গক্রমে রাজপথের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্পর্কেও না বলে পারা যায় না। স্মরণ করা দরকার, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় বেপরোয়া বাস চালকের কারণে দু’জন কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে স্বতঃস্ফ’র্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ওই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আশা ও ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে কয়েকদিন পর্যন্ত দুর্ঘটনা কিছুটা কমিয়ে আনা হলেও মাস না যেতেই সামগ্রিক অবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতির বরং আরো মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। সর্বশেষ বাংলামোটর এলাকায় কৃষ্ণা রায় চৌধুরীর পা থেতলে দেয়ার ঘটনাও অবনতি ঘটার তথ্যটিকেই প্রাধান্যে এনেছে। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত রাজধানীসহ সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নেয়া। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন কেউ যাতে চালকের আসনে বসতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রয়েছে ত্রুটিযুক্ত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন। এসবই চলাচল করতে পারছে উৎকোচের বিনিময়ে। দুর্ঘটনা কমাতে চাইলে এ ধরনের কোনো যানবাহনকে চলাচল করতে দেয়া যাবে না। 

এভাবে সব মিলিয়ে জনস্বার্থে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হলেই রাজপথসহ সড়ক- মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তেমন ব্যবস্থাই নেয়া দরকার। এই ব্যবস্থা নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে। সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ শুধু আশ্বাস ও মিষ্টি কথা শুনতে চায় না। তারা কাজ দেখতে চায়। বড় কথা, প্রতিদিন তারা স্বজনদের মৃত্যু ও লাশ দেখতে চায় না। তারা চায়, কৃষ্ণা রায়ের মতো আর কাউকে যেন পা হারাতে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ