রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আমাদের চামড়াশিল্প

ইবনে নূরুল হুদা: আমাদের সম্ভবনাময় চামড়াশিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অতীতে আমরা চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী রপ্তানী করে প্রভূত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারলে সাম্প্রতিক সময়ে সে অবস্থা আর নেই। এবারই চামড়ার বাজারে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ধরনের দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী এই অতীত গৌরব হারাতে বসেছে।
মূলত চামড়াশিল্প  দীর্ঘকাল ধরেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানির জন্য চামড়া এবং চামড়াজাত সামগ্রী উৎপাদন করে আসছে। কাঁচা চামড়া এবং সেমিপাকা চামড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি সামগ্রী। সব সময়ই বিশ্ব বাজারে এ দেশের সব ধরনের চামড়ার চাহিদা রয়েছে। গত দু’দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য আধুনিকায়ন ঘটেছে এবং এর ফলে বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়ার তৈরি সামগ্রী প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঈর্শ্বনীয়ভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে পরবর্তী সরকারগুলি চামড়া শিল্পকে রপ্তানি মূল্যের ওপর ভর্তুকি প্রদান করে আসছে। ফলে আমাদের দেশের চামড়া শিল্প একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে বলা যায়।
আমাদের দেশ থেকে শতকরা ৯৫ ভাগ কাঁচা চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্যাদি; প্রধানত আধা পাকা ও পাকা চামড়া, চামড়ার তৈরি  পোশাক এবং জুতা বিদেশে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। অধিকাংশ চামড়া এবং চামড়াজাত সামগ্রী রপ্তানি করা হয় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ানে। এসব রপ্তানির মূল্য সংযোজনের শতকরা ৮৫ ভাগ স্থানীয় এবং ১৫ ভাগ বিদেশি। ১৯৯৮ সালে চামড়া খাতে বিদেশে রপ্তানি হয় ১৬ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ১৭ কোটি ৮০ লক্ষ বর্গফুট চামড়া।
২০০৯ সালে বিদেশে রপ্তানি হয় ২৮ কোটি ৮৪ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের চামড়া। বিশ্বের চামড়া খাতে রপ্তানির শতকরা দু’ভাগ হচ্ছে বাংলাদেশের। চর্মজাত সামগ্রী তথা জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, হাত মোজা, ব্যাগ, মানি ব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট ইত্যাদি রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক দিক।
আমাদের দেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক পশু পালনের মতো ঘাস ও গাছপালার সমারোহ। সর্বোপরি অনুকূল পারিপার্শ্বিকতাও বিদ্যমান। আমাদের কাঁচা চামড়া গুণগতভাবে উৎকৃষ্টমানের। কারণ এ দেশের মাঠে ও ফসলের ক্ষেতে চামড়ার জন্য ক্ষতিকর কাঁটাতারের ব্যবহার নেই। কুষ্টিয়ার কালো ছাগলের চামড়া চমৎকার গঠন এবং প্রসার-ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। এদেশে গৃহপালিত পশু সযতেœ প্রতিপালনের বিষয়টিও চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দেশের শতকরা ৪০ ভাগ চামড়া সরবরাহ হয় প্রতিবছর পবিত্র  ঈদুল আযহা উৎসবে কোরবানিকৃত পশুর চামড়া থেকে। দৈনন্দিন মাংস সরবরাহের জন্য জবাইকৃত পশুর চামড়া ছাড়াও বিবাহ ও অন্যান্য উৎসবাদি উদযাপন থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয়ে থাকে। রপ্তানি মূল্যের ওপর ভর্তুকি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে চামড়ার ট্যানিং শিল্প উন্নয়নের প্রসার ঘটছে, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁচা চামড়ার সরবরাহ দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদিত সামগ্রীর পরিমাণ বৃদ্ধিকল্পে এ খাতে বিনিযয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। যা এই শিল্পের জন্য ইতিবাচকই বলতে হবে।
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের চামড়ার রপ্তানি বাজার প্রতিবছর ১০-১৫% বাড়ছে এবং এ অঙ্কে আয় দাঁড়িয়েছে বছরে গড়ে ২২৫ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিলাস দ্রব্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বস্তুত উন্নতমানের চামড়ার সামগ্রী সবসময়ই একটি উন্নত বিলাস দ্রব্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের মসৃন চামড়া জাপান এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে বেশ বাজার সৃষ্টি করতে পেড়েছে। চামড়া শিল্পের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার পিছনে দেশে মজুরির কম হার এবং ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের চামড়া উৎপাদানকারীরা কেবল উৎপাদন এবং রপ্তানি কাজে সম্পৃক্ত থাকতে আগ্রহী। কিন্তু নিম্ন পর্যায়ের কর্মকান্ডে তাদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ বা আগ্রহও নেই। তবুও পুমা, পিভোলিনোস, হুগো বস ইত্যাদি বিখ্যাত কোম্পানি যে বাংলাদেশ থেকে চর্মজাত শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ করছে তা থেকেই বোঝা যায় চামড়া শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ সম্ভবনাকে কাজে লাগানো গেলে এই শিল্পের অধিকতর বিকাশের মাধ্যমে প্রভূত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শিল্প অনেকটাই ছন্দ হারিয়েছে বলা যায়। দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ রফতানি খাত চামড়াশিল্প মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করেছে। এই শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব, সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ট্যানারি মালিকদের কারসাজি, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, ব্যাংকঋণ প্রাপ্তি ও আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা সহ নানাবিধ কারণে চামড়াশিল্পে অস্থিরতা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। মূলত আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী। ধান, পাট, শেয়ারবাজার, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান-সর্বত্রই এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তিদের অবাধ বিচরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে চামড়ার অনাকাঙ্খিত দরপতনে এদের সক্রিয় প্রভাব রয়েছে বলেই মনে করা হয়। ফলে চামড়ার অনাকাঙ্খিতভাবে দরপতন ঘটেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে,  এবারের ঈদে কোনো কোনো স্থানে গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ৫০ এবং ছাগলের চামড়া মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সরকার পক্ষের ভাষ্যমতে, চামড়ার দাম অবিশ্বাস্যভাবে হ্রাস পাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে। কিন্তু সরকারকে দায়িদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ফলে অবস্থারও কোন উন্নতি হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এটাই চামড়ার সর্বনিম্ন দর। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য রীতিমত উদ্বেগজনকই বলতে হবে।
জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। বিগত সাত বছরের মধ্যে সরকার নির্ধারিত এটাই সর্বনিম্ন রেট। ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৮৫ আর সর্বোচ্চ ৯০ টাকা। একইভাবে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। কিন্তু কোনো আড়তদার বা ট্যানারির মালিক এ দামে চামড়া কিনতে সম্মত হননি। আর বিপত্তিটা ঘটেছে সেখানেই।
ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ঢাকার লালবাগ, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ কোরবানির চামড়া রাস্তায় রেখে গেছে; ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। সিলেট পৌর কর্তৃপক্ষ ১০ টন চামড়া ভাগাড়ে নিক্ষেপ করেছে। মৌলভীবাজারে এক লাখ চামড়া পচে গেছে।
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চট্টগ্রামে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে এক লাখেরও বেশি কোরবানির পশুর চামড়া বাধ্য হয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন মওসুমি ব্যবসায়ীরা। আড়তদারদের বক্তব্য হলো- ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের ৫০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় অর্থাভাবে তারা চামড়া কিনতে পারেননি। ফলে আমাদের দেশের চামড়া শিল্প এখন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখী হয়েছে।
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিদেশে চামড়া রফতানি করে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করা পক্ষে সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে মাসে ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ রফতানি করার পরও ১১ কোটি ঘনফুট চামড়া আমাদের দেশে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দেশে চামড়াজাত দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ২২ কোটি ঘনফুট চামড়া রফতানি করা যায়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১১৩ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে আয় হয় ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। ছয় বছরে ৩০ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে এই আয়।
আমাদের দেশে সারা বছরই পশু জবাই হয়। শহর, নগর ও গ্র্্ামের বাজারে সর্বত্র গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার গোশত বিক্রি করা হয়। এতে জনগণের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা যেমন পূরুণ হয়, তেমনি চামড়ার উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, সারা বছর এ দেশে প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হচ্ছে। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে দেশে এ বছর কোরবানি হয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ পশু। বাংলাদেশের ২২০টি ট্যানারি থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া (হাইড ও স্কিন) প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশই গরুর চামড়া। ছাগলের চামড়া ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও মহিষের চামড়া ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ভেড়ার চামড়া রয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মধ্যে ৭৬ শতাংশের বেশি রফতানি করা হয়। আমাদের দেশে ৯৩টি বড় নিবন্ধিত জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখের বেশি জোড়া জুতা তৈরি করে থাকে।
চীন বাংলাদেশী চামড়ার অন্যতম প্রধান আমদানিকারক। দেশটি চামড়া দিয়ে জুতা, স্যান্ডেল, পার্স, ব্যাগ, বেল্ট তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাজারজাত করতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্যের হুমকি দিলে চীনের আমদানিকারকরা আগের দামে চামড়া কিনতে আগ্রহী দেখাচ্ছেন না। ফলে বাংলাদেশের চামড়া রফতানি বাণিজ্যে শুরু হয়েছে ভাটার টান।
দেশীয় চামড়ার অনাকাঙ্খিত দরপতনের ফলে বিপুল পরিমাণ চামড়া চোরাই পথে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এই শিল্পের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে ভারত চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং ক্রমেই তা আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। প্রতি বছর ৫১ মিলিয়ন গরু, ১২৮ মিলিয়ন ছাগল ও ভেড়ার চামড়া উন্নত দেশে রফতানি করে ভারত আয় করে ৬৭৭ মিলিয়ন ডলার। এর আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, হংকং, চীন, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভিয়েতনাম। ভারতীয় চামড়ার বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে এটা। কিন্তু সময়োচিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে আমাদের দেশের চামড়া শিল্পের পরিসর ক্রমেই সংকোচিত হচ্ছে। ফলে এই শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে তেমন আশাবাদী হওয়ার সুযোগ থাকছে না।
আমাদের দেশের ট্যানারিগুলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর না হওয়ায় এবং সিইটিপি সুবিধাসম্বলিত পর্যাপ্ত বর্জ্য শোধনাগার গড়ে না ওঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের চামড়ার কদর রয়েছে। কিন্তু সে সুযোগটা আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না।
‘আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা নেই, ট্যানারিগুলোতে আগের বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় এত চামড়ার চাহিদা নেই, চামড়া কেনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়নি’ ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে এতদিন ট্যানারি মালিকরাই কাঁচা চামড়া কেনার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে এসেছেন। ফলে এ বছর কোরবানির ঈদের পর সারা দেশে কাঁচা চামড়া বিক্রিতে ধস নেমেছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে না। তাই চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ এ বিষয়ে চামড়া শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
সরকারের কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের পর নড়েচড়ে বসেছেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানায়। এতে দেশীয় ট্যানারিগুলো কাঁচা চামড়ার সঙ্কটে পড়বে বলে তাদের অভিযোগ। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তে অটল।
মূলত কূটনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে চামড়ার বাজার খুঁজতে হবে। সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত দ্রব্য রফতানির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি আগেভাগে নিলে মাঠ পর্যায়ের মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারতেন। এটি সরকারের বিলম্বিত উপলব্ধি হলেও খুবই সময়োচিত। তাই এই বিষয়ে পিছপা হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
আমাদের দেশের চামড়াশিল্প একটি অতিসম্ভবনাময় শিল্প। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আমাদের অপার সম্ভবনার এই শিল্প আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। কাঁচা চামড়ার মূল্যমান বিগত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। মূলত সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতার কারণেই এই অনাকাঙ্খিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
তাই এই সম্ভবনাময় শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদি ও যুৎসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হতে। চামড়াশিল্পকে অধিকতর লাভজনক শিল্পে পরিণত করার জন্য চামড়ার বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ চামড়া শিল্পকেও দিতে হবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। অন্যথায় এই সম্ভবনাময় শিল্পের ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ