মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ছাত্রাবাস ডাফরিন হোস্টেল থেকে কবি নজরুল কলেজ

মুহাম্মদ নূরে আলম : ঢাকা মাদরাসা (বর্তমানে কবি নজরুল কলেজ) এর ছাত্রদের জন্য তৈরি হয়েছিল ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ছাত্রাবাস ডাফরিন হোস্টেল। এটি ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড ডাফরিনের ঢাকা আগমনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মাদরাসার সংশ্রবে এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ১৮৮৮ খ্রি: ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এক সভায় নওয়াব স্যার খাজা আহসানুল্লাহ ঘোষণা করেন অন্যরা সবাই মিলে যে চাঁদা দেবেন তিনি সেটা দ্বিগুন করবেন। লক্ষ্মীবাজার বামে আছে ঢাকার প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবি নজরুল কলেজ। ১৮৭৪ সালে ঢাকা মাদরাসা নামে পরিচিত, যার প্রকৃত নাম মোহসিনীয়া মাদরাসা হিসেবে কাজ শুরু করে। বর্তমান যে ভবনটি তা নির্মিত হয় ১৮৮০ সালে। ১৯১৫ সালে নিউ স্কিম মাদরাসা, ১৯১৯ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। তবে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে এটি হাই স্কুল হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর এটি কবি নজরুল সরকারি কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ জুলাই ঢাকা মাদরাসার দক্ষিণে রাস্তার ধারে বাংলার লেঃ গভর্নর স্যার জন উডবার্ন এর ভিত্তি স্থাপন করেন। এর নির্মাণ ব্যয় ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে নওয়াব সলিমুল্লাহ দেন ১০ হাজার টাকা। বাকি টাকা সরকারি তহবিল ও মোহসীন ফান্ড থেকে মেটানো হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ শেষ হয়। ছাত্রদের থাকার জায়গাসহ এতে অসুস্থ্য ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য এবং নামাযের জন্য একটি করে কক্ষ বরাদ্দ ছিল। ছাত্রাবাস সুপারের থাকার জন্য নীচতলায় একটি কক্ষ ছিল যেখানে এখন বর্তমান হোস্টেল সুপারের অফিস চলে।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা মাদরাসার সাথে থাকা এ্যাংলো পারসিয়ান বিভাগটি আলাদা হয়ে ঢাকা মুসলিম গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পরিণত হলে হোস্টেলটি স্কুলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এখনো উক্ত স্কুলের উচ্চ ক্লাসের ছাত্ররা সেখানে থাকে। তবে বর্তমানে স্থানীয় ছাত্ররা ঐ প্রতিষ্ঠানে বেশি সংখ্যক পড়ে বিধায় হোস্টেলের উপর আগের মত তেমন চাপ নেই। গাছ-গাছালিতে ভরা একটি অঙ্গনের উত্তরে দ্বিতল আকারে হোস্টেলটি অবস্থিত। ৬০ ফুট ও ৪০ ফুট আয়তনের উচ্চ বেদীর উপর নির্মিত ভবনটির দক্ষিণাংশে আছে খোলা বারান্দা । উভয় তলায় দক্ষিণ দিকে ৪টি করে চমৎকার খাঁজকাটা খিলান এবং পূর্ব-পশ্চিমে একটি করে খিলান দ্বারা বারান্দাটি উন্মুক্ত ।
আদিতে ভবনের মেঝে থেকে ১৬ ফুট উচ্চে থাকা ছাদ নির্মাণে লোহার কড়িবর্গা ব্যবহৃত হলেও ১৯৮০ র দশকে তা বদলিয়ে আধুনিক কংক্রিট নির্মিত ছাদ দেয়া হয়েছে । নীচ তলায় ৪টি এবং দোতলায় ৩টি বড় বড় কক্ষ রয়েছে। কাঠের দরজা দিয়ে বারান্দা থেকে প্রতিটি কক্ষে যাওয়া যায়। দরজার বিপরীতে উত্তর দিকের দেয়ালে প্রতি কক্ষে আছে একটি করে জানালা। দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে ভবনের বহির্গাত্রে নির্মিত একটি কংক্রিটের সিঁড়ির সাহায্যে দোতলায় উঠানামা করা য়ায়। ডাফরিন হোস্টেল ঢাকার শিক্ষা পদ্ধতির প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ঢাকার ইতিহাসের শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব সাক্ষী ঐ হোস্টেল একটি জাতীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন। এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ পূর্বক পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী করা দরকার । তথ্যসূত্র: ড. মো: আলমগীর
কবি নজরুল সরকারি কলেজ ঘেঁষেই ঢাকার প্রথম মুসলিম হোস্টেল। যেখানে উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদ থেকেছেন। ইসলামিয়া স্কুলের ছাত্রাবাস, নাম ডাফরিন। ডাফরিন হোস্টেল এবং রাস্তার অপর প্রান্তেই আছে ইসলামিয়া মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়। মুসলিম স্কুলের পর সারিতে আছে যত বিখ্যাত স্কুল। প্রথমেই সেন্ট জোসেফ স্কুল, যেখানে আছে ১৮৮৭ সালে নির্মিত চার্চ। সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুল, সেন্ট অ্যালবার্ট স্কুল; রাস্তার অপর প্রান্তে স্মরণকালে নির্মিত মহানগর মহিলা কলেজ। এই সেই পোস্ট অফিস, যেখানে নিজে চিঠি লিখে নিজের কাছে পোস্ট করতাম। সেই চিঠি বাসায় এলে কী তৃপ্তি ভরে পড়তাম! মাসে-ছয় মাসে বক্সে চিঠি না পড়লেও বক্স আছে স্বমহিমায়। আছে চিরচেনা রাসেল মুচি। রাসেলদের বাড়ি পাশেই, লেখাপড়া করেনি। তাই মুচির কাজ করে জীবন চালায়।
আরও সামনে গেলে রাস্তার শেষ মাথায় আছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। এই তো আমার কলেজ। ১, গোবিন্দ দত্ত লেন। সোজা প্রবেশ করলাম। আহা! ক্যাম্পাস কেমন খাঁ-খাঁ করছে। কত গাছ ছিল! মনে পড়ে ১৯৯৪-৯৫ সালের কথা- মিলনের চায়ের দোকান, লাল দালানের সামনে বিশাল আতা গাছ। মনে পড়ে টিটু, মিতুল, রনি, শাবনাম, রাজু, সোহেল, কেয়া, সাথী...। রনি এখন পরপারে। বাকিদের সঙ্গে দেখা হয় না অনেকদিন। আছে মাশহুর সুইটমিট। মাশহুরের নিমকি আর সমুচা কত দিন খাই না! ভেতরে গিয়ে কিন্তু চিরচেনা মোয়াজ্জেম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। মুখের দিকে না তাকিয়ে বললেন, ‘কি লিবা কও? আমি দাঁড়িয়েই আছি, চেহারার দিকে তাকালেন; তবে চিনতে পারলেন বলে মনে হয় না। আমি বললাম, বাঘামিয়াদের সময়ের আমি। বুঝলাম, না চিনেও বললেন ও হে হে। বহ বহ। কী দিমু? জিলাপি খেয়ে ফুটলাম। ক্যাপিটাল আয় আয় ডাকলেও ভেতরে গেলাম না। আর আছে আহামেদ বার্গার, পাশেই প্রিন্স অফ ওয়েলস। পুরান ঢাকায় প্রিন্স অফ ওয়েলসের অর্ডারি কেক বড়দিনের সবচেয়ে বড় উপহার ও খাবার। বড়দিনের ১০-১৫ দিন আগে থেকে লক্ষীবাজারের এই বেকারি জমজমাট। চিজ, মাখন, ঘি, বাদাম, কিশমিশ, মোরব্বা, ডিম নিজেরা কিনে দিয়ে যান- সেই পসারির সঙ্গে ময়দা যুক্ত হয়ে হয় স্পেশাল কেক। এ ছাড়া বড়দিন সামনে রেখে ব্রিটিশ আমলের প্রতিষ্ঠান প্রিন্স অফ ওয়েলস তৈরি করে স্পেশাল আইটেম। যাকে পুরান ঢাকার মানুষ বড়দিনের বিশেষ খাবার হিসেবে নেন। বড়দিনে ঢাকার সব চার্চ ও খ্রিষ্টান ধর্মশালায় মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া হয়।
ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় আসা ব্রিটিশদের খাদ্য চাহিদা পূরণে মি. ওয়েলস প্রিন্স অফ ওয়েলস নামের এ বেকারিটি চালু করেন। সেই অর্থে এই অঞ্চলের প্রথম বেকারিও এটি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বুদ্ধু মিয়া কাজ করতেন বেকারিতে।
এক সময় মি. ওয়েলস চলে যান। তার শিষ্য বুদ্ধুকে দিয়ে যান প্রিন্স অফ ওয়েলস। বুদ্ধু মিয়া মারা গেলে তার ছেলে নুরুদ্দিন হাল ধরেন প্রিন্স অব ওয়েলসের। নুরুদ্দিনের বয়স এখন ৮৫। সেই শতবর্ষের পুরনো নিয়মেই চলছে বেকারি।
ঢাকা মাদরাসা: ঢাকা মাদরাসা (মোহসিনীয়া মাদরাসা)  বেঙ্গল সরকারের ১৮৭৩ সালের সরকারি আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর জর্জ ক্যাম্পবেলের সময়ে মাদরাসা সংস্কার কমিটির অনুমোদনক্রমে ঢাকায় আলিয়া মাদরাসার একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ডের আর্থিক সহযোগিতায় মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় বলে এর নামকরণ করা মোহসিনীয়া মাদরাসা। তবে মাদরাসাটি ঢাকা মাদরাসা নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এ মাদরাসার প্রথম সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন বাহরুল উলুম মাওলানা  ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী।
ঢাকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল যেসব দরিদর মুসলিম ছাত্ররা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার জন্য স্কুল, কলেজে যেতে পারত না, তাদের লেখাপড়া করার সুযোগ করে দেওয়া। মওলানা ওবায়দুল্লাহ ১৮৭৪ সালের ১৬ মার্চ ঢাকার পাটুয়াটুলীতে একটি ভাড়া বাড়িতে মাদরাসা, হোস্টেল এবং নিজের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে মাদরাসার কার্যক্রম শুরু করেন। পরে তিনি রায়সাহেব বাজারে তিনতলা আরেকটি বাড়ি ভাড়া করে মাদরাসা স্থানান্তর করেন। প্রথম বছরে মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৬৯। ১৮৭৫ সালে মাদরাসা ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার জন্য অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ খোলা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এ বিভাগ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। নওয়াব  খাজা আবদুল গণি মাদরাসার নিজস্ব জমি কেনার জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। এ অর্থ দিয়ে বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের পার্শ্বে মাদরাসার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য দুই একর চল্লিশ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। মাওলানা ওবায়দুল্লাহর তত্ত্বাবধানে মুসলিম স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী মাদরাসা ভবন নির্মাণ করা হয়। এ মাদরাসার নকশা তৈরি করেন মেজর ম্যান এবং ভবন নির্মাণের প্রকৌশলী ছিলেন বিভিয়ান স্কট। ১৮৮০ সালে মাদরাসা নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা মাদরাসায় শুধু আরবি ও ইংরেজি বিভাগ ছিল।
আরবি বিভাগে ৭টি শ্রেণি ছিল। এ মাদরাসায় কলকাতা আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস অনুসরণ করা হতো। এ মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের ছাত্ররা পড়াশুনা করত এন্ট্রান্স পর্যন্ত। ১৮৮১ সালে এ মাদরাসা থেকে তিনজন ছাত্র প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়। ১৮৮৩ সালে ৩৩৮ ছাত্রের মধ্যে ২০২ জন ছিল ইংরেজি বিভাগের। এ বিভাগে আরবি, ফারসি, বাংলা ও বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি পাশ্চাত্য সংস্কৃতিও পড়ানো হতো। ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ড হতে এ মাদরাসার ব্যয় নির্বাহ করা হতো। ১৯১৫ সালে নিউ স্কিম পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হলে ঢাকা মাদরাসা হাই মাদরাসায় উন্নীত হয়। ১৯১৬ সালে অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ আলাদা হয়ে ঢাকা সরকারি মুসলিম হাই স্কুল নাম ধারণ করে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুবিধার্থে এ মাদরাসাকে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তর করা হয়। ১৯৪৭ সালে মাদরাসা বিভাগে ৪টি শ্রেণি ও কলেজ বিভাগে ১টি শ্রেণি ছিল।
১৯৫৭ সালে মানবিক বিভাগ চালু করা হয়। ১৯৬২ সালে মাদরাসা তুলে দিলে মাদরাসার ক্লাসগুলি মাধ্যমিক ক্লাসের সাথে একত্রীকরণ করা হয়। ১৯৬৮ সালে কলেজ থেকে স্কুল আলাদা করে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয়। তখন কলেজের নামকরণ হয় সরকারি ইসলামিয়া কলেজ আর হাইস্কুলের নামকরণ হয় ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুল। ১৯৭০ সালে কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। ১৯৭২ সালে কলেজের নতুন নামকরণ হয় কবি নজরুল সরকারি কলেজ।
তথ্য সূত্র বাংলাপিডিয়া, আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দীকী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ