মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

কাশ্মীরে গণভোট : নেহরুর ওয়াদা সম্পর্কে দালিলিক প্রমাণ : পরে নিজের ওয়াদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

কাশ্মীর নিয়ে ভারত গত ৫ অগাস্ট নতুন করে যে সংকট সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে আমেরিকা ও পশ্চিমা দুনিয়া উত্তেজনা সৃষ্টি না করার জন্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত-পাকিস্তানকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের নসিহত করেছে। পাকিস্তান কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ভারতের সাথে কি আলোচনা করবে? তারা তো বলছে যে পাকিস্তানের সাথে কোনো আলোচনা নাই। কারণ জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের। শুধু তাই নয় আজাদ কাশ্মীর এবং আকসাই চীনও ভারতের। এখন যদি কোনো আলোচনা করতে হয় তাহলে আজাদ কাশ্মীর এবং আকসাই চীন ভারতকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে। দুঃখের বিষয়, এব্যাপারে পশ্চিমাদের মুখে কোনো কথা নেই। আসলে এক অর্থে কাশ্মীর নিয়ে তো কোনো আলোচনা হওয়ারই কথা নয়। কারণ ১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট ভারত বিভক্তির পর পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু অসংখ্য চিঠিপত্র, টেলিফোন এবং বেতার ভাষণে কাশ্মীরে তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন যে কাশ্মীর ভারতেরও না পাকিস্তানেরও না। কাশ্মীর হলো কাশ্মীরীদের। তাই কাশ্মীরী জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। আর সেই ইচ্ছা প্রতিফলিত হবে একটি গণভোটের মাধ্যমে।
২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর ভারতের প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধুতি রায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য আদালত দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দেয়। অরুন্ধুতির অপরাধ, তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এর জবাবে অরুন্ধুতি বলেন, আসলে পন্ডিত নেহরুর বিরুদ্ধে মরণোত্তর  মামলা দাখিল করা উচিত। এরপর  কাশ্মীর সম্পর্কে তিনি নেহরুর প্রতিশ্রুতিমূলক অনেক দলিল  তুলে ধরেন। অরুন্ধুতি রায় এ সম্পর্কে যেসব দলিল তুলে ধরেন তার একটি সংক্ষিপ্তসার নিচে দেওয়া হলো।
॥দুই॥
1. In his telegram to the Prime Minister of  Pakistan, the Indian Prime Minister Pandit Jawaharlal Nehru said, Our view which we have repeatedly made public is that the question of accession in any disputed territory or state must be  decided in accordance with wishes of people and we adhere to this view” (Telegram 402 Primin-2227 dated 27 October 1947 to PM of Pakistan repeating telegram addressed to PM of  UK).
বাংলা অনুবাদঃ- পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর কাছে প্রেরিত টেলিগ্রামে ভারতের প্রধান মন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু বলেন, জনগণের কাছে বার বার আমরা যে কথা বলেছি সেটা হলো এই যে কাশ্মীরের ভারত ভুক্তি অবশ্যই জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী হতে হবে। এবং আমরা এই নীতি মেনে চলি (টেলিগ্রাম নাম্বার ৪০২: প্রাইম মিনিস্টার-২২২৭, তারিখ ২৭ অক্টোবর ১৯৪৭, পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর বরাবর প্রেরিত এবং যুক্তরাজ্যের প্রধান মন্ত্রীর নিকট  অনুলিপি প্রেরিত)।
2.    In his broadcast to the nation over All India Radio on 2 November 1947, Pandit Nehru said, “We are anxious not to finalise anything in a moment of crisis and without the fullest opportunity to be given to the people of Kashmir to have their say. It is for them ultimately to decide. And let me    make it clear that it has been our policy that where there is a dispute about the accession of a state to either Dominion, the accession must be made by the people of that state. It is in accordance with this policy that we have added a proviso to the Instrument of Accession of Kashmir”.
বাংলা অনুবাদঃ- ১৯৪৭ সালের ২ নভেম্বর  অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সম্প্রচারিত বেতার ভাষণে পন্ডিত নেহরু বলেন, সংকট মুহূর্তে এবং কাশ্মীরী জনগণকে তাদের মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ না দিয়ে আমরা কিছুই চূড়ান্ত করবো না। চূড়ান্ত পরিণামে তাদেরকেই (কাশ্মীরীদেরকে) এটি নির্ধারণ করতে হবে। আমি পরিস্কার করে বলতে চাই যে, যে কোনো একটি ডমিনিয়নে যোগদানের ব্যাপারে যদি কোনো বিরোধ থাকে তাহলে সেই রাজ্যের মানুষজনকে ঠিক করতে হবে যে তারা কোন রাষ্ট্রে যোগদান করবে। এই নীতির সাথে সঙ্গতি রেখেই আমরা ভারত ভুক্তির চুক্তিপত্রে  একটি ধারা সন্নিবেশিত করেছি।
৩.    ১৯৪৭ সালের ৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত অপর একটি বেতার ভাষণে নেহরু বলেন, “We have declared that the fate of Kashmir is ultimately to be decided by the people. That pledge we have given not only to the people of Kashmir and to the world. 3 We will not and cannot back out of it”.
বাংলা অনুবাদ : আমরা একথা ঘোষণা করেছি যে কাশ্মীরীদের ভাগ্য চূড়ান্ত পরিণামে কাশ্মীরী জনগণ কর্তৃকই নির্ধারিত হবে। আমরা এ ওয়াদা দিয়েছি কাশ্মীরী জনগণের কাছে এবং বিশ^বাসীর কাছে। এই ওয়াদা থেকে আমরা সরে আসতে পারি না।
৪. পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২১ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে  ৩৬৮ নম্বর চিঠিতে পন্ডিত নেহরু বলেন, In his letter No. 368 Primin dated 21 November 1947 addressed to the PM of Pakistan, Pandit Nehru said, “I have repeatedly stated that as soon as peace and order have been established, Kashmir should decide of accession by Plebiscite or referendum under international auspices such as those of United Nations”.
বাংলা অনুবাদঃ- “ আমি বার বার বলেছি যে, যতদ্রুত শান্তি এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসবে ততদ্রুত আন্তর্জাতিক সংস্থা যথা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট বা রেফারেন্ডামের মাধ্যমে কাশ্মীরীরা কোন দেশে যোগ দেবে সেটি নির্ধারণ করা হবে”। 
5.    In his statement in the Indian Constituent Assembly on 25 November 1947, Pandit Nehru said, “In order to     establish our bonafide, we have suggested that when the people are given the chance to decide their future, this should be done under the supervision of an impartial tribunal such as the United Nations Organisation. The issue in Kashmir is whether violence and naked force should decide the future or the will of the people”.
বাংলা অনুবাদ : ১৯৪৭ সালের ২৫ নভেম্বর  গণপরিষদে প্রদত্ত ভাষণে পন্ডিত নেহরু বলেন, আমাদের কথা রক্ষা করার জন্য আমরা সুপারিশ করেছি যে যখন জনগণকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হবে তখন সেটি করা হবে একটি নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল যথা জাতিসংঘের অধীনে। প্রশ্ন হলো, সহিংসতা এবং বর্বর শক্তি কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছাকে পরিচালিত করবে কিনা?
দেশ বিদেশে পন্ডিত নেহরু গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বার বার রিপিট করেছেন তেমন ১৪টি রেফারেন্স অরুন্ধুতি রায় দিয়েছেন। ১৪টি রেফারেন্সই আমার কাছে আছে। অবশিষ্ট ৮টি রেফারেন্স স্থানাভাবে আজ দিলাম না।
॥তিন॥
কিন্তু এখন কি হচ্ছে ? ১৯৫৪ সালের পর থেকেই পন্ডিত নেহরু তার এতগুলো প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ ইউটার্ন করেন। ১৯৪৭/১৯৪৮ সালে পন্ডিত নেহরু জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন তথা গণভোটের যত ওয়াদাই করুন না কেন, ১৯৫০ সাল থেকেই তিনি ঐ সব ওয়াদা থেকে সরে আসতে শুরু করেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরের দ্বিতীয় মুখ্য মন্ত্রী ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। তার সময়েই অর্থাৎ ১৯৫০ সালে পন্ডিত নেহরু ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারা অন্তর্ভুক্ত করেন। এই ধারায় কাশ্মীরকে স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি হয় ভারতের একটি রাজ্য বা প্রদেশ হিসাবে।  ১৯৫৩ সালে ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে কাশ্মীরের জমিজমা কেনা এবং কাশ্মীরী নারীদেরকে বিয়ে করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই দুটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয় কাশ্মীরীদেরকে শান্তনা দেওয়া জন্য এবং গণভোট থেকে তাদের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য।
কিন্তু কাশ্মীরীরা গণভোটের দাবি থেকে পিছু হটেননি। তারা এই দাবিতে আন্দোলন করেন এবং যে আন্দোলন মাঝে মাঝেই সহিংস রূপ ধারণ করে। গণভোটের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয় সারা কাশ্মীর সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি দিয়ে সেই আন্দোলন দমন করতে গেলে ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ লাগে। সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ১৫ দিন পর যুদ্ধ বিরতি হয়, কিন্তু গণভোটের প্রশ্নটি অমীমাংসিতই রয়ে যায়। ততদিনে কাশ্মীরের ওপর ভারতীয় কব্জা আরও কঠিন হয়। ভারতের ২৯টি প্রদেশ এবং ৭ টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র কাশ্মীর উপত্যকাতেই (লাদাখ এবং আকসাই চীন বাদে) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। জম্মু বাদ দিলে এখানাকার মুসলিম জনসংখ্যা হলো  ৯৭ শতাংশ। আর জম্মু ধরলে ৭৩ শতাংশ। ৩৭০ এবং ৩৫(ক) ধারাতেই কংগ্রেস সরকার ক্ষান্ত ছিল। কিন্তু  বিজেপি সরকার এটা কিছুতেই মানতে পারছিলো না যে ভারতের কোনো প্রদেশ বা অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। কিন্তু ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তাকে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয়। তাই ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোদি সরকার ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গেরুয়া শাসন চালু করার চেষ্টা করে। একাধিক রাজ্যে হিন্দুত্বকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু লাদাখ ও কাশ্মীরের মতো ৮০ লক্ষ অধিবাসী সম্পন্ন মুসলিম মেজোরিটি রাজ্য থাকলে কট্টর হিন্দুত্ববাদ কায়েম করা সম্ভব হয় না। তাই ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ ভারতকে গেরুয়া বসনের রাষ্ট্র তথা হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাগ্রে হাত দিয়েছে ৩৭০ ও ৩৫(ক) ধারাতে। ছেঁটে ফেলেছে এই দুইটি অনুচ্ছেদ। ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানী একাই কাশ্মীরে ১০ হাজার একর জমি অর্থাৎ ৩০ হাজার বিঘা জমি কিনতে চেয়েছেন। বিজেপি আহ্বান জানিয়েছে ভারতের অন্যান্য অধিবাসী যেন ঢালাওভাবে কাশ্মীরে যায় এবং কাশ্মীরী মেয়েদেরকে বিয়ে করে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে কাশ্মীরে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সংখ্যালঘিষ্ঠতায় পরিণত করার জন্য।
ভারতের এই উদ্দেশ্য কতখানি সফল হবে সেটি এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে মুসলমান মেয়েদেরকে বিয়ে করতে হলে হিন্দুকে মুসলমান হয়ে যেতে হয়। মুসলমানদের এই বিধানকে তারা কতখানি মূল্য দেবে আমরা জানি না। তবে এই বিষয়ে সমগ্র কাশ্মীর যদি সামাজিকভাবে আন্দোলিত হয় তাহলে বিস্মিত হবো না।  কাশ্মীর নিয়ে এই উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ কি সেটা আমরা জানি না। কিন্তু কাশ্মীরের গণঅসন্তোষ থেকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য ভারত আজাদ কাশ্মীরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার পাঁয়তারা করছে। আগামী কয়েক মাসে কি ঘটে সেটি দেখার জন্য উপমহাদেশ এবং বিশ্ব আগ্রহ এবং আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ