মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সক্রেটিস ছিলেন নির্দোষ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আদালতের বিচারে কোনও ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড হলেও তিনি প্রকৃত দোষী বা অপরাধী তা প্রমাণিত হয় না। অর্থাৎ মানুষের আদালতে বিচার ভুল হয়। সাক্ষী, উকিল সবাই ভুল করতে পারেন। এমনকি বিচার যিনি বা যারা করেন তিনি বা তাঁরাও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ভুল করতে পারেন। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, চাপ প্রয়োগ বা বিচারকার্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের রাগ-অনুরাগবশতও নিরপরাধ ব্যক্তি অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। আবার প্রকৃত অপরাধী আইনের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে নিরপরাধ হিসেবে বেঁচে যেতে পারেন। এমন ঘটনা আজকাল যেমন ঘটছে, তেমন অতীতেও ঘটেছে। বরং অতীতের চেয়ে বর্তমানে বিচারের নামে প্রহসন ঘটছে প্রচুর। রাজনৈতিক প্রভাবে নির্দোষ নিরপরাধকে যেমন ফাঁসানো হচ্ছে, তেমনি দাগি অপরাধী এমনকি নিষ্ঠুর হন্তারককেও খালাসের ঘটনা ঘটেছে। এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেমন ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটতে পারে, তেমনি ঘটতে পারে সংশ্লিষ্ট বিচারকের অজ্ঞাতেও।
‘গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস নির্দোষ।’ মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ২৪১৫ বছর পর এ রায় দেয় এথেন্সের আদালত।
উল্লেখ্য, সক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ সালে গ্রিসের এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তরুণদের ভুলপথে পরিচালিত করা, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবার মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। বছরের পর বছর জেল খাটবার পর অনেকেই বেকসুর খালাস পান। কিন্তু দার্শনিক সক্রেটিস তা পাননি।
ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরও অপরাধী প্রকৃত দোষী কি না, তা নিয়ে তর্ক চলতেই থাকে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার প্রায় ২৪১৫ বছর পর কেউ যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন; তাহলে তা চমকে যাবার মতো ঘটনা বটে। হ্যাঁ, মৃত্যুদণ্ডের সুদীর্ঘ ২৪১৫ বছর পর গ্রিসের একটি আদালত জানালো সক্রেটিস নির্দোষ ছিলেন। নিরপরাধ ছিলেন। তিনি তরুণদের বিভ্রান্ত করেননি। ধর্মবিশ্বাসের অপব্যাখ্যা তিনি করেননি। চৌর্যবৃত্তির প্রশ্রয়দাতাও সক্রেটিস ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ ছিল মিথ্যে এবং সাজানো।
সক্রেটিস এমন এক দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছিলেন, যা দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত ও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের শাসকরা সক্রেটিসের তত্ত্বগুলো মানতে চাননি।
হ্যাঁ, এথেন্সের তৎকালীন আরাধ্য দেবতাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সক্রেটিস। তাঁর বিরুদ্ধে অত্যাচারী শাসকদের সমর্থনেরও অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও বলা হয় যে, সক্রেটিস নির্দোষ হলেও মুখ বুজে বিচারকদের রায় মেনে নিয়েছিলেন।
মৃত্যুর আগে পালাবার সুযোগ পেয়েছিলেন সক্রেটিস। কিন্তু এথেন্স ছেড়ে কোথাও যাননি তিনি। এমনকি শাসকদের ভয়েও ভীত ছিলেন না সক্রেটিস।
তাছাড়া তরুণদের বিপথগামী করা, নতুন দেবদেবীদের সম্পর্কে প্রচারণা চালানোসহ সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর পক্ষে আদালতে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ বিচারপর্বে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। এতোসবের পরও হেমলক পান করে মৃত্যুদণ্ডের অন্যায় আদেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন সক্রেটিস। তিনি সত্যিই দোষী ছিলেন কি না, সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য এথেন্সের ওনাসিস ফাউন্ডেশনের একটি আদালতে ফের নতুন করে বিচারব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। সেই বিচারেই সক্রেটিসকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে রায় দেয় আদালত।
সক্রেটিসের সমর্থনে তাঁর আইনজীবী বলেন, কোনও ব্যক্তির অভিমত অপরাধ হতে পারে না। সক্রেটিস সত্যের সন্ধান করতেন। আর তা করতে গিয়েই তিনি তাঁর নিজস্ব মত তুলে ধরতেন। আইনজীবী বলেন, আমার মক্কেলের একটা ত্রুটি অবশ্য ছিল, আর তা হলো, তিনি উস্কানিমূলক ভাষণ দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতেন। সবসময় বাঁকা বাঁকা কথা বলতেন। যেমন: তিনি বলতেন, দেখাও তোমাদের গণতন্ত্র কতটুকু খাঁটি ও বিশ্বাসযোগ্য’ ইত্যাদি। তিনি আরও বলেন যে, সাধারণ মামলাকে জটিল করবার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেয়াটা কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
সক্রেটিসের পক্ষে এ মামলায়  এই বিখ্যাত ফরাসি আইনজীবী সওয়াল করেন। তবে এর বিপরীতে গ্রিসসহ বেশ কয়েকটি দেশের আইনজীবীরা সক্রেটিসের বিরোধিতা করেন। এ মামলার বিচারের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিচারকদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। দীর্ঘ বাদানুবাদের পর সক্রেটিসের আইনজীবীর যুক্তিতেই সিলমোহর মারেন বিচারকরা। এর আগে নিউইয়র্কের একটি আদালতেও সক্রেটিস নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। -বাংলাদেশ প্রতিদিন (অনলাইন সংস্করণ), ৫ নবেম্বর, ২০১৭।
পৃথিবীর কোনও কোনও দেশে অনেককে শুধু রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে। আসামির সাক্ষীদের বক্তব্য শোনা হচ্ছে না। প্রায়শ একতরফা শুনানি করে রায় ঘোষণা করা হচ্ছে। এতে যে নিরিহ এবং নির্দোষ লোক বিচারের নামে ফাঁসির দড়িতে ঝুলছেন না, এর নিশ্চয়তা কোথায়?
যুগে যুগে মুক্তবুদ্ধি ও চেতনার মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করে আসছেন। বুলেটের আঘাতে বুক ঝাঁঝরা করছেন। ট্যাংকের নিচে শুইয়ে পড়তেও দ্বিধা করছেন না। এরপরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। বিচারের নামে প্রহসন করে অনেক নিরপরাধকে ঝুলিয়ে দেবার প্রবণতা তীব্রতর হচ্ছে।
বিচারহীনতা কিংবা বিচারের নামে প্রহসন করে মানুষের জীবনবিনাশ মর্মান্তিক। মানুষ হত্যার মহোৎসব চলছে দেশে দেশে। ক্ষমতাসীনরা প্রতিপক্ষকে মিথ্যে অভিযোগে আসামির কাঠগড়ায় নিচ্ছেন এবং বিচার বিভাগকে ক্ষমতার দাপটে প্রভাবিত করে কুমতলব হাসিল করছেন। এর ধারাবাহিকতা রুখতে না পারলে মানবতা বিপন্ন হবে দ্রুত।
বিচার বিভাগকে বিভিন্ন দেশের সংবিধানে স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে উল্লেখ করা হলেও কার্যত তা মানুষের চোখে ধুলো নিক্ষেপ ব্যতীত কিছু নয়। বিচার বিভাগ ক্ষমতাসীনদের অতিক্রম করে কোনও রায় দিতে পারে না। এমনকি ক্ষমতাবানদের ইচ্ছে মাফিক রায় না দিলে বিচারকদের চাকরি খোয়াতে হয়। খোঁজ নিলে এমন উদাহরণ পৃথিবীতে অনেক পাওয়া যাবে।
গত কয়েক বছরে এশিয়ার দেশগুলোতে অনেকেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এগুলো কতটা স্বাভাবিক এবং কতটা রাজনৈতিক চাপে বা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে ঘটেছে তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। এমন ঘটনা আমাদের দেশে ঘটেনি বা ঘটছে না, তাও কিন্তু হলফ করে বলা যায় না।
মৃত্যুদ- কার্যকর হবার ২৪১৫ বছর পর সক্রেটিস যদি নির্দোষ বা নিরপরাধ প্রমাণিত হতে পারেন তাহলে আজকাল যাদের একতরফা বিচারে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে তাঁদেরও সবাই না হোক কেউ কেউ তেমনি নিরপরাধ প্রমাণিত হলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।
মানুষের তৈরি আইন দিয়ে বিচারকার্য শতভাগ নিরপেক্ষ এবং নির্ভুল হবে এমনটা সবসময় আশা করা যায় না। তবে কখনই সুষ্ঠু বিচার হয় না বা হতে পারে না তা কিন্তু বলছি না। বিচারক দুঃসাহসী হলে এবং ক্ষমতাসীনের অশুভ প্রভাব না থাকলে ন্যায় ও সুষ্ঠু বিচার কখনওসখনও হতে পারে। হয়ও। তবে এজন্য বিচারপ্রার্থীর ভাগ্যের জোর লাগে।
আজকাল রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষের অনেক নেতাকে অতীত ঘটনার জন্য দায়ী করে উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতীত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন দুর্ভাগ্যের শিকার লোকেরা যখন নিরপরাধ প্রমাণিত হবেন ঠিক সক্রেটিসের মতো, তখন হয়তো ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে পক্ষপাতমূলক রায় ঘোষণাকারী বিচারকরা কেউই বেঁচে থাকবেন না।
হ্যাঁ, সবদেশের বিচার বিভাগই সেনসেটিভ বা স্পর্শকাতর। এ বিভাগ সম্পর্কে কোনও কথা বলা মুশকিল। বিশেষত কোনও রায় সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা যায় না। উচিতও নয়। এ ব্যাপারে আদালত বা আইনের হাত অনেক লম্বা বলে দারুণ একটা প্রবাদ চালু আছে। আদালতের দেয়া রায় প্রভাবিত হতে পারে এমন মন্তব্য দূরে থাক খবরও ছাপা বা প্রকাশ করা নিষেধ। করলে আদালত অবমাননার দায়ে মামলা হতে পারে। তাই আদালত সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়ে বা খবর ছাপতে একশোবার ভাবতে হয়। কিন্তু এরপরও আদালতের রায় নিয়ে কথা ওঠে। তবে এতে যেন আদালত বিব্রতবোধ না করে।
২৪১৫ বছর পর সক্রেটিসের নির্দোষ প্রমাণিত হবার রায়ের কথাই ধরুন। পৃথিবীবিখ্যাত এই দার্শনিকের হেমলক পান করিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় কী প্রমাণ করে? প্রমাণ করে এটাই যে, বিচারকরা ভুল করেন। আদালতের রায় ভুল হয়। বিচারকরা মানুষ। ভুল করেন এমন মানুষ দিয়ে গঠিত আদালতের রায়ও তাই ১০০% নির্ভুল হতে পারে না। কিন্তু প্রায় আড়াই হাজার বছর পর সক্রেটিসের জীবনের ক্ষতিপূরণ কে দেবেন? ঐসময়ের এথেন্সের শাসকরা যেমন নেই, তেমনি নেই তখনকার বিচারকরাও। তবে দেশ আছে। আদালত আছে। শুধু সময়ের ব্যবধান বেড়েছে।
অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ডের আইনও বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। কিন্তু তখনকার নিরপরাধ এবং বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসকে তো রক্ষা করা যায়নি। ট্র্যাজেডি এটাই। এখনও যারা আদালতের রায়ে ঝুলে যাচ্ছেন, তাঁদের সবাই অপরাধী তা বলা যায় না। সক্রেটিস তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ