মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

জাকির নায়েকের যা করণীয় নয়

ভারতের নাগরিক ডা. জাকির নায়েক নিঃসন্দেহে একজন ইসলামপ্রচারক। তিনি ইতোমধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে দীনের দাওয়াত নতুন করে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ধন্য হয়েছেন। তবে এজন্য তাঁকে বৈরিতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য দেশ থেকে তিনি হিজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর পিসটিভি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের এবং নিজের সব সহায় সম্পদও বাজেয়াপ্ত করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি মালয়েশিয়ায় মুহাজির হিসেবে অবস্থান করছেন।
গত ২০ আগস্ট, স্টার অনলাইন জানায়, ডা. জাকির নায়েককে ১০ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মালয়েশীয় পুলিশ।  সম্প্রতি দেশটির সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করবার অভিযোগে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হলো। এর আগে গত ৯ আগস্ট শুক্রবার ৫ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকে। উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় ধর্ম ও জাতিগত ইস্যুকে স্পর্শকাতর বিবেচনা করা হয়। দেশটির ৬০ শতাংশ মানুষ মুসলিম আর বাকিরা চিন ও ভারতের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এদের বেশিরভাগই সনাতন ধর্মাবলম্বী। সম্প্রতি জাকির নায়েক মন্তব্য করেন, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের চাইতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সংখ্যালঘু হিন্দুরা শতগুণ বেশি অধিকার ভোগ করছেন। তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী হিন্দুরা প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের নন। তাঁরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সমর্থক। অথচ একথা বলবার কোনও প্রয়োজনই ছিল না তাঁর। এমন বক্তব্যের জেরে জাকির নায়েককে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেবার প্রসঙ্গটি আলোচনায় উঠে আসে। তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি দেশটির বুকিত আমান পুলিশ সদর দফতরে হাজির হয়ে জবানবন্দি দিতে হয় ৫৪ বছর বয়সী জাকির নায়েককে।  মালয়েশীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি’র পরিচালক দাতুক হুজির মুহাম্মদ সে দেশের সংবাদমাধ্যম স্টার অনলাইনকে বলেছেন, ১৯ আগস্ট বিকাল সোয়া তিনটার দিকে আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে জবানবন্দি দিতে আসেন তিনি। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর রাত দেড়টার দিকে সদর দফতর ত্যাগ করেন। দাতুক হুজির বলেন, শান্তি বিনষ্টের কারণে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৫০৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৩ আগস্ট কোতাবারুতে এক আলোচনায় জাকির নায়েক হিন্দুদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। এরই জেরে তাঁকে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেবার প্রসঙ্গ সামনে আসে। বলা বাহুল্য, তিনি আবারও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু বানান। গত ৮ আগস্ট কেলানতান প্রদেশে এক আলোচনায় তিনি বলেন, “প্রথমে সংখ্যালঘুদের চলে যেতে হবে। কারণ তাঁরা মালয়েশিয়ার অতিথি।” তিনি আরও বলেন, “আপনারা জানেন, কেউ কেউ আমাকে অতিথি বলেন। তাই আমিও বলি, আমার আগে চাইনিজরা এখানকার অতিথি। নতুন অতিথিকে আপনারা যদি চলে যেতে বলেন, তাহলে পুরনো অতিথিদেরও ফিরে যেতে বলুন।” এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে জাকির নায়েক এখন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার।
ভারতের আদালতে অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোসহ জিহাদি কাজে উদ্বুদ্ধকরণের অভিযোগ রয়েছে জাকিরের বিরুদ্ধে। দিল্লির পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠাবার আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হলে গতবছর মাহাথির এ ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এ বছর জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহেও মাহাথির বলেছিলেন, ন্যায়বিচার ক্ষুন্ন হবার আশঙ্কা থাকলে জাকির নায়েককে ভারতে ফেরত পাঠানো হবে না। তবে জুলাইয়ে টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বলেছেন, “আমাদের দেশ মালয়েশিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ আছেন। আমরা এমন কাউকে চাইতে পারি না, যাদের বর্ণগত সম্পর্ক ও অন্য ধর্ম সম্পর্কে কট্টর চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে জাকির নায়েককে আবার অন্য কোথাও পাঠানো মুশকিল। কারণ, অনেক দেশই তাঁকে রাখতে চায় না।”
জাকির নায়েক প-িত ব্যক্তি। বিবেকবান। জ্ঞানী। মুহাজির হিসেবে কোনও দেশে অবস্থানের সবনিয়ম-কানুন নিশ্চয়ই তিনি অবহিত। মালয়েশিয়া একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিসমৃদ্ধ দেশ। দেশটিতে মালয় মুসলিম, হিন্দু এবং চায়নিজরা মিলেমিশে আছেন। কেউ কারুর ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করেন না। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনও অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি হয় কিংবা ডা. জাকির নায়েকের কোনও কথাবার্তায় দেশটির কর্তৃপক্ষ বিব্রতবোধ করেন তেমন কিছু করা একদমই অনুচিত। তাঁর কিছু মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ বিব্রত হয়েছেন। কিছুটা ক্ষোভও ব্যক্ত করেছেন। জাকির নায়েকের জন্য সবদেশ প্রতিকূল হয়ে পড়ুক তা আমাদের কাম্য নয়। এজন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে কথাবার্তায় তাঁকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে বৈকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ